বিশ্বকাপ সাফল্যের জন্য অপেক্ষার ইতিহাস

ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫

বিশ্বকাপ ফুটবল রেকর্ডস

বিশ্বকাপ সাফল্যের জন্য অপেক্ষার ইতিহাস

ইম্মানুয়েল শোভন মন্ডল ৯:৪৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০১৮

বিশ্বকাপ সাফল্যের জন্য অপেক্ষার ইতিহাস

পৃথিবীতে জাতিসংঘের সদস্য যতগুলো দেশ, তার চেয়ে বেশি সদস্য রয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফায়। ফুটবলের আবেদন ও জনপ্রিয়তা বোঝাতে এই একটি তথ্যই যথেষ্ট। আর এই আবেগে জোয়ার তুলতে চার বছর পর আবার আসছে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ‘ফিফা বিশ্বকাপ’। ৮৮ বছরের ইতিহাসে এটা বিশ্বকাপের ২১তম আয়োজন, এবছরের ১৪ জুন যা শুরু হচ্ছে রাশিয়ায়। মঙ্গলবার, ৬ মার্চ শুরু হয়ে গেছে এই ফুটবল জ্বরে ভোগার ১০০ দিন গণনা। পাঠক চলুন এই উন্মাদনায় জেনে নেই বিশ্বকাপে কোন দলগুলোর দুইটি শিরোপা জয়, দুইবার শীর্ষ দুই বা তিনে থাকা কিংবা দুইবার মূলপর্বে খেলার মাঝে কতবছর অপেক্ষা করতে হয়েছে-

অপেক্ষা সবসময়ই অনেক কষ্টের। এর তীব্রতা বোঝা যায় যখন কেউ সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করে আছে, কিন্তু ফল আসতে একটু বেশিই সময় নিচ্ছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের এমন কিছু চাতক পাখিদের তালিকায় প্রথমেই নাম আসে ইতালির। দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু দ্বিতীয়বারের পর তৃতীয় শিরোপা জিততে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৪৪ বছর। এরপরের নামটি আর্জেন্টিনার। প্রথম বিশ্বকাপ দ্বিতীয় স্থানে থেকে শেষ করার পর শীর্ষ দুইয়ের দেখা পেতে দলটির অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪৮ বছর। আর অপেক্ষার এই তালিকায় সবচেয়ে বুড়ো দুই দল- মিশর ও নরওয়ে। একবার বিশ্বকাপ মূলপর্বে খেলার পর দ্বিতীয়বার এই সুযোগ পেতে তাদের ৫৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে!

ইতালি :

১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ ছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে। শুধু যাত্রাপথে হ্যাপা পোহাতে হবে, এজন্য সেবার অংশ নেয়নি ইতালি। কিন্তু পরের বিশ্বকাপ ছিল নিজেদের ঘরের মাটিতে। স্বাগতিক আজ্জুরিরা চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম আসরেই বিশ্ব সেরার শিরোপা জেতে। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে টানা দ্বিতীয়বারের মত এই ট্রফি জেতে ইতালি। প্রথমবারের মত কোন দেশের টানা দুই শিরোপা, তাও একই কোচ ভিত্তোরিও পোজ্জোর অধীনে।

এরপরই শুরু হয় আজ্জুরিদের ৪৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। ১৯৫০ সালে পরবর্তী বিশ্বকাপের আগে বড় এক ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে যেতে হয় ইতালিকে। সুপারগা বিমান দুর্ঘটনায় দেশটির তোরিনো ফুটবল ক্লাবের সব খেলোয়াড় মারা যান, যাদের অনেকেই ছিলেন জাতীয় দলের সদস্য। এরপর ১৯৫৪ আর ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ মূলপর্বে তো প্রথম রাউন্ডের বাধাই পার হতে পারেনি দলটি। আর ১৯৫৮'র বিশ্বকাপে পার হতে পারেনি বাছাইপর্ব। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ফেবারিট ছিল ইতালি। কিন্তু প্রথমবারের মত এই বিশ্বমঞ্চে খেলতে এসে তাদের ১-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকেই বিদায় করে দেয় উত্তর কোরিয়া। ৩২ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে ইতালি। কিন্তু ফুটবল দেবী সম্ভবত আরেকটু ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন দলটির। পেলের ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে দ্বিতীয় স্থান নিয়েই খুশি থাকতে হয় আজ্জুরিদের। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে আবার প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে সে তুলনায় উন্নতি দেখা যায়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ২-১ গোলে হারে তারা।

ইতালির ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হয়ে যেন বর দিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে। নয়তো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাথে 'ডেথ' গ্রুপে পড়ে কিভাবে পরের রাউন্ডে ওঠে দলটি?

এরপর সেই প্রতীক্ষিত ফাইনাল। স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ৪৪ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে নিজেদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতে ইতালি।

আর্জেন্টিনা :

আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত ১৭টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দু'বার বিশ্বকাপ জিতেছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, দলটি প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট দলের একটি। উরুগুয়েতে ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেবার ৬-১ গোলে জিতে উড়তে উড়তেই ফাইনালে গিয়েছিল আর্জেন্টাইনরা। স্বাগতিক উরুগুয়ের বিপক্ষে এই ম্যাচটি ছিল নাটকীয়তায় ভরা। প্রথমে পিছিয়ে গিয়েও ২-১ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে শেষ পর্যন্ত উরুগুয়ে ৪-২ গোলে জিতে নেয় প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল।

১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড পেরোতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এরপরের তিন আসরে তারা অংশ নেয় নি। ১৯৫৮ সালে প্রথম রাউন্ড ও ১৯৬৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে দলটি। আর ১৯৭০ সালে পেরোতে পারেনি বাছাইপর্বের বাধা। ১৯৭৪ সালে আবার ফিরে এসে দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত যায় আর্জেন্টিনা। প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট এই দলটির প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হতে অপেক্ষা করতে হয় পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত। নিজের দেশের মাটিতে ১৯৭৮ সালে এই আয়োজনের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেবারের চ্যাম্পিয়ন তারাই। আর কোন দলেরই শীর্ষ দুইয়ে কিংবা তিনে থেকে দুইটি বিশ্বকাপ শেষ করার মাঝে ৪৮ বছর অপেক্ষা করতে হয়নি।

মিশর, নরওয়ে :

আফ্রিকার সবচেয়ে সফল দল মিশর। মহাদেশটির ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চ 'আফ্রিকা কাপ অব নেশনস' রেকর্ড সাতবার জিতেছে তারা। তবে 'দ্য ফারাও' নামে পরিচিত এই দলটি বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলেছে মাত্র দু'বার। এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে তারা। এটি নিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়াবে তিনে।

আর ইউরোপের দল নরওয়ের খুব একটা নাম ডাক নেই। কখনো সেভাবে ছিলও না। বিশ্বকাপ মূলপর্বে মাত্র তিনবার অংশ নিয়েছে দলটি। নিজ মহাদেশের 'উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ' বা ইউরোতে খেলার সুযোগ পেয়েছে মাত্র একবার। তবে দলটির একটি বিশেষত্ব আছে। তারাই একমাত্র দল যারা ব্রাজিলের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত কোন ম্যাচ হারেনি (৪ ম্যাচে দুই জয়, দুই ড্র)।

দুই মহাদেশের এই দুই দলকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে বিশ্বকাপ। দু'টি দলেরই প্রথম বিশ্বকাপ খেলার পর ৫৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলার জন্য। মিশর ১৯৩৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয়, এবং গ্রপপর্ব থেকেই বিদায়। নরওয়ে প্রথম অংশ নেয় ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে, তাদেরও বিদায় হয় প্রথম রাউন্ড থেকে।

এরপর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপে আসে মিশর। সেবারও একই ফলাফল, গ্রুপপর্ব থেকে আর সামনে এগুনো হয়না দলটির। এর পরের বিশ্বকাপেই অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে আবার বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূলপর্বে আসে নরওয়ে। কিন্তু গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয় তারাও।

এসএম