'দেশের বোমারু' জার্ড মুলার

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

বিশ্বকাপের ১০০ কিংবদন্তি—৮

'দেশের বোমারু' জার্ড মুলার

খাইরুল আমিন তুহিন ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০১৮

'দেশের বোমারু' জার্ড মুলার

জার্মানি বড় যুদ্ধপ্রিয় জাতি। অন্তত ইতিহাস তাই বলে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার, ক্লিনিক্যাল ফিনিশারের যখন সেই দেশেই জন্ম তখন তার নাম হয়ে যায় 'দেশের বোমারু'। জার্মান ভাষায় আরো সহজ করে 'দের বম্বার'। সেই বম্বার বলতেন, 'আমি গোলের গন্ধ পেতাম। তাই ডিফেন্ডারদের চেয়ে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সময় এগিয়ে থাকতাম।' সেই কারণেই বক্সের মধ্যে জার্ড মুলারের মতো স্ট্রাইকারের দেখা বুঝি আর মেলেনি! এক সময়ের পশ্চিম জার্মানির সেই বম্বার মুলারই বিশ্বকাপের ১০০ কিংবদন্তির তালিকার আজকের নাম। রাশিয়া বিশ্বকাপের ১০০ দিনের কাউন্টডাউনে জার্মান গোল মেশিন। গার্ডিয়ানের সূত্র ধরে লিখেছেন খাইরুল আমিন তুহিন।

জার্ড মুলার। খেলেছেন ১৯৭০ ও ১৯৭৪ বিশ্বকাপ। ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে ১৩ ম্যাচে গোল করেছেন ১৪টি। আর এই ফুটবলারের সাথে বিশ্বকাপ জেতা জাতীয় ম্যানেজার হেলমুট শন একবার মুলারকে 'ছোট গোলের মানুষ' বলেছিলেন। 'দের বম্বার' যেন গোল করার আশির্বাদ নিয়েই ধরণীতে এসেছিলেন। সম্ভাব্য সব অ্যাঙ্গেল থেকে, শরীরের সব অংশ দিয়ে গোল করার শিল্প জানা ছিল তার। এমনকি শরীরের পেছন দিক থেকেও গোল করেছেন! অবিশ্বাস্য! ছোট গোলের মানুষ এই কারণে যে বক্সের মাঝে কোনোভাবে বল পেলেই গোল। মিস নেই।

১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানির বিশ্বকাপ জেতা গোলটি (২-১) করেছিলেন মুলারই। আর সেটি তার অনন্য প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে। বক্সের ভেতর প্রথম টাচে বলটাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। সময়ের হেরফের হয়েছিল। দমে না গিয়ে অদ্ভুত চতুরতায় ডামি করলেন। ডিফেন্ডারের পায়ের মাঝখান থেকে বল বের করে আনলেন দেখতে না দেখতে। তারপর সেই বলকে জালে জড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের মালিক হয়ে গেলেন। সাথে দেশকে বানিয়ে দিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

১৯৭৪ বিশ্বকাপে ৪টি গোল করেছিলেন মুলার। এর আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপে তার কাছ থেকে পশ্চিম জার্মানি পেয়েছিল ১০ গোল। সেবার গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। তবে ১৯৭৪ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতিয়েছেন। সাথে ফ্রান্সের জাঁ ফন্তেইনের ১৩ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড ভেঙেছিলেন। সেই কারণেই শুধু নয়, ওটা বিশ্বকাপ জেতানো গোল বলেই মুলার বলেছিলেন, 'আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি হলো ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মিউনিখে করাটি। যেটি আমাদের ২-১ গোলে এগিয়ে দিয়েছিল।'

ওই গোলটি দীর্ঘকাল বিশ্বকাপের ইতিহাসে করেছে রাজত্ব। ৩২ বছর কেউ মুলারের বিশ্বকাপ সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভাঙতে পারেননি। রোনালদো ভেঙেছিলেন ২০০৬ বিশ্বকাপে। তার ১৫ হলো। এরপর জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা ২০১৪ সালে ১৬তম গোলটি করে নতুন উচ্চতা সৃষ্টি করলেন। রোনালদো ৪ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ৩টিতে খেলেছিলেন। ক্লোসা খেলেছেন ৪টিতে। মুলার ২টিতে।

১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের পরই মাত্র ২৮ বছর বয়সে অবসরে চলে গিয়েছিলেন মুলার। ১৯৬৬ সালে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক। ৬২ ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির হয়ে চোখ কপালে তোলা ৬৮ গোলের রেকর্ড মুলারের। বিভক্ত জার্মানির রেকর্ড। গোল তিনি সবখানে করেছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে গোলের বন্যা বইয়েছেন। তবে বিস্ময় লাগে এই কথা ভেবে যে তার ৬৮ গোলের বড় অংশ এসেছে মাত্র চার বছরে। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত সময়ে মাত্র ৩৪ ম্যাচে ৪৭ গোল করেছিলেন। ক্যারিয়ারে ৭৩৫ গোল। অফিসিয়াল ম্যাচে ইতিহাসে ৭০০ এর বেশি গোল করার কৃতিত্ব যাদের তাদের সেরা পাঁচের তালিকার একজন মুলার।

বিশ্বকাপে ১৪ গোল। রেকর্ড। নিজে বোমারু। কিন্তু মুলার নিজের রেকর্ডের চেয়ে সবসময় বড় করে দেখতেন ১৯৫৮ বিশ্বকাপের হিরো জাঁ ফন্তেইনকে। তার এক আসরে ১৩ গোলের রেকর্ড টেনে মুলার বলতেন, ওটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গোলের রেকর্ড। শেষে প্রশ্ন করতে পারেন, কি এমন বিশেষ অনুশীলন করতেন মুলার যে এতো বেশি গোল করতেন কতো সহজেই? জবাবটা বম্বারই দিয়েছিলেন,'আমি গোলের গন্ধ পেতাম। তাই ডিফেন্ডারদের চেয়ে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সময় এগিয়ে থাকতাম।' অনুশীলন আসলে তিনি তেমন করতেনই না!

ক্যাট