@@ উবার ##

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

@@ উবার ##

নটু আহমেদ ২:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৯

@@ উবার ##

অফিসের জন্য বের হচ্ছি।

এমন সময় মেয়ে বলল, ‘বাবা, জরুরী রিসার্চের কাজে আমার পুরনো ঢাকায় যেতে হবে, গাড়ীটা দিতে পারবে?’

পুরনো ঢাকায় যেতে ওকে এই সাপোর্ট দিতেই হবে। একা একা পাঠানোও নিরাপদ নয়। শুনলাম ওরা তিনজনের একটা টিম যাবে। অতএব ওর জন্য গাড়ী রেখে ‘উবার’ এর ট্যাক্সি ডাকলাম। অফিস শুরুর ব্যস্ত সময়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে একটা গাড়ীর খবর পেলাম।

ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নাম্বারে কল দিলে চালক ধরল। বললাম, আসতে কতক্ষণ লাগবে?

- আমি কালশীর কাছাকাছি আছি। হোপফুলি সাত মিনিটে পৌঁছে যাব। আপনি তো তেজগাঁ যাবেন তাই না? তেজগাঁর কোথায়?

- আহসান উল্লাহ এঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটির কাছে।

- ওকে স্যার, আমি আসছি।

চালকের মার্জিত ও উচ্চারণ শুনে একটু চমকে গেলাম। সাত আট মিনিট পরে সে এলো। গাড়িটা একটু পুরনো, স্টেশন ওয়াগন। উঠে বসে জিজ্ঞাসা করলাম

- গাড়ী তো দেখছি পুরনো। এসি চলে তো?

- জ্বী, চলে।

যাত্রা শুরু হল। এসিও চলল। তীব্র ভ্যাপসা গরমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছিলাম। এখন একটু আরাম। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে আর এক দফা চমকাতে হল। অত্যন্ত ধোপদুরস্ত পোশাকে মার্জিত চেহারার একজন মানুষ। সাধারণতঃ পেশাদার চালকদের যে অবয়ব আমরা দেখি, তার সাথে মিলছে না। আমি বরাবরই কোনো গাড়িতে উঠলে চালকের সাথে গল্প জুড়ে দেই। একেবারে হাড়ি মুখে চুপ করে বসে থাকলে কেমন যেন দমবন্ধ করা পরিবেশ মনে হয়। আর আজ তো কথা বলতেই হবে!

- গাড়িটা আপনার নিজের?

- জ্বী আমার।

- দিনে কেমন ইনকাম হয়?

- ইন ফ্যাক্ট আমি সকাল আর সন্ধ্যা এই দুই সময়ে একটু চালাই। তেমন ইনকাম হয়না।

- (আমি আবার চমকালাম) শুধু সকাল সন্ধ্যা? অন্য কোনো কাজ করেন?

এবার চমক থেকে চমৎকৃত হবার পালা আমার!

- ( একটু হেসে) আমি একটা ফার্মে জব করি স্যার। আমার কাজের সময়টা একটু রিল্যাক্সড তো! তাই সকাল বিকেলে যে সময়টুকু পাই, সেই সময় উবারে খাটি। আমার তেলের খরচটা উঠে যায়। বাড়তি কিছু টাকাও থাকে।

- কোন ফার্মে আছেন?

- আমি …… কোম্পানির মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে ম্যানেজারের কাজ করি। আপনি তো রানারে তাই না স্যার?

আমার তো ইতোমধ্যেই আক্কেল গুড়ুম অবস্থা! একটা ভাললাগা ও শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতে শুরু করেছে একই সঙ্গে। কে বলে আমরা পশ্চাদ্মুখী জাতি? আমার সামনে তখন জলজ্যান্ত একটি উদাহরণ বসে গাড়ী চালাচ্ছে। এদেশের কত শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা বিদেশে গিয়ে ‘অড জব’ অর্থাৎ সেলস পারসন, নিরাপত্তা রক্ষী, লেবার, গাড়ী চালক, বাবুর্চি এমনকি ক্লিনার এর মতো পেশায় কাজ করে। অথচ নিজের দেশে কাজ করতে গিয়ে লোকলজ্জ্বা বা তুচ্ছ্ব তাচ্ছিল্য করে। সাধারণ কাজ করতে হীনমন্যতায় ভোগে। বছরের পর পর বছর বেকার ঘুরে বেড়ায়।

অথচ এই লোকটি আমার ভাললাগা বাড়িয়ে দিল। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হয়েও সে উবারের গাড়ী চালাতে কোনো লজ্জ্বা বোধ করছেনা। এটাই তো মানসিকতার পরিবর্তন! কই আমিও তো তার পরিচয় জানার পর তাকে অসম্মান করছি না! বরং তার প্রতি একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিয়েছে আমার মনে। হয়তো এভাবেই একদিন পরিবর্তন আসবে।

তারপর সারা রাস্তা অনেক গল্প করতে করতে সুন্দরভাবে সে আমাকে অফিসের সামনে নামিয়ে দিল। মিটার দেখে বলল, ‘সাড়ে পাঁচশ টাকা’। দিয়ে দিলাম। বখশিস দেবার একটা প্রবল ইচ্ছা অনুভব করলেও সঙ্কোচ করে দিলাম না। মনে হচ্ছিল, এই মানুষটিকে সামান্য দশ বিশ টাকা বখশিস দিলে তাকে হয়তো ছোট করা হবে। তাকে আমার একটা ভিজিটিং কার্ড দিলাম। বললাম, একদিন এসে চা খেয়ে যাবেন, খুব খুশী হবো। সে গাড়ী ঘুরিয়ে চলে গেল।

আমি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখলাম।

মন প্রাণ ভরে গেল আশায়। না, এখনো এ দেশে প্রাণ আছে, আশা আছে। এই তরুণেরাই এই দেশকে বদলে দেবে। আমাদের বস্তাপচা দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। পরিবর্তন আসছে।

এই দেশে এখনো গাছে নতুন পাতা জন্মায়। এখনো সুনীল আকাশে পাখী ওড়ে।

শুভ হোক।

লেখক:

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

বাবা মা তোমাদের অনেক ভালোবাসি: আরও পড়ুন

আরও