গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল ও জার্মানি যাত্রা

ঢাকা, ১২ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল ও জার্মানি যাত্রা

এম এ মুকিত ৩:৩০ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০১৯

গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল ও জার্মানি যাত্রা

ফেসবুক স্ক্রল করতে করতেই জানুয়ারিতে বিজ্ঞাপনটি নজরে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, এ বছর গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল অব অ্যাকশন কনফারেন্স ইউরোপের দেশ জার্মানির বন শহরে, ২ থেকে ৪ মে পর্যন্ত রাইন নদীর তীরে।

ইউএন এসডিজি অ্যাকশন ক্যাম্পেইন, জার্মানি, উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয় ও ফেডারেল পররাষ্ট্র দফতরের সহায়তায় হবে কনফারেন্স। বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব সংগঠন বা ব্যক্তি, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি নিয়ে কাজ করছেন, তারা অংশ নিতে পারবেন।

জানিয়ে রাখা ভালো হিউম্যান সেফটি ফাউন্ডেশন (এইচএসএফ) নামে আমাদের একটি সংগঠন আছে। সংগঠনটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে নিবন্ধিত। ২০০৯ সাল থেকে এইচএসএফ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। বিশেষ করে তাদের শিক্ষার জন্য।

ঢাকা শহরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট মোড়, ওসমানী উদ্যান, গুলিস্তান রেল কলোনিতে আমাদের স্কুল ‘বৃক্ষমায়া শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ নামে পরিচিত।

এখানে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি দেয়া হয় নৈতিক শিক্ষা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম। আর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম একটি লক্ষ্য এসডিজি ৪। এটি হলো গুণগত শিক্ষা। আমরা এই এসডিজি ৪ নিয়েই কাজ করছি।

প্রথমে বিজ্ঞাপনটি এড়িয়ে গেলেও কয়েকদিন পর আবারও নজরে আসে। আবেদন করা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। যেহেতু এসডিজি নিয়ে কাজ করছি, আবেদন করে দেখা যেতে পারে কি হয়? অবশেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আমাদের কার্যক্রম উল্লেখ করে কনফারেন্সর জন্য নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করলাম। আবেদনের দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল অব অ্যাকশন কর্তৃপক্ষের ফিরতি ই-মেইল, আপনাকে নির্বাচন করা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এইচএসএফ’র প্রতিনিধি হিসেবে ভিসার জন্য আবেদন করি এপ্রিলে। ভিসা অফিসারের কাছে সাক্ষাৎকার দেবার পর কিছুটা আত্মবিশ্বাসী হলাম। ২৮ এপ্রিল নির্ধারিত দিনে গিয়ে অপেক্ষার পর পাসপোর্ট হাতে পেলাম। খুলে দেখি কনফারেন্সে অংশ নেবার জন্য ভিসা দিয়েছে জার্মানি। ৩০ এপ্রিল জার্মানির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যাই। ১ মে স্থানীয় সময় দুপুরে জার্মানির কোলন বিমানবন্দরে পৌঁছাই। হোটেলে পৌঁছে বিশ্রাম শেষে নেমে পড়লাম জার্মানির রাস্তায়।

প্রতিটি রাস্তা আর অলিগলি পরিপাটি আর সাজানো গোছানো। নেই কোনো ধূলাবালি আর যানজট। রাস্তা পারাপারে সব সময় প্রাধান্য পাচ্ছে পথচারীরা। আর গাড়িগুলো মেনে চলছে ট্রাফিক আইন এবং সাইন। একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, রাস্তা ব্যবহারে এই রকম সুবিধা আমাদের দেশে কবে পাব?

অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবার পরপরই, কর্তৃপক্ষ ই-মেইলে জানিয়ে দিয়েছিল এই কনফারেন্স অংশ নেবার জন্য কী কী করতে হবে? সেই নির্দেশনা অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে চলে যাই ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সেন্টারে। সেখানে রেজিস্ট্রেশন করার পর এসডিজির লক্ষ্য সম্বলিত বিভিন্ন কাগজপত্র এবং ব্যাচ দেয়া হয়।

অবশেষে ২ মে কনফারেন্সে অংশ নিলাম, ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সেন্টারে। কঠোর নিরাপত্তা চেকিংয়ের পর প্রবেশ করলাম। খুঁজছিলাম কনফারেন্স বাংলাদেশ থেকে অন্য কেউ এসেছেন কিনা? কিন্তু, প্রথমদিন পেলাম না কাউকে।

কনফারেন্স উদ্বোধন করেন জাতিসংঘের এসডিজি প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মেরিনা পন্টি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নাদিরা হিরাই। চা বিরতি দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। বিরতিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয়পর্ব। এ সময় তাদের কাছে বাংলাদেশের এগিয়ে চলার গল্প, সরকারি-বেসরকারি এবং এইচএসএফ’র এসডিজির কার্যক্রম তুলে ধরার চেষ্টা করি।

বিরতির পর সেন্টারের বিভিন্ন হলে নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচির ওপর শুরু হয় আলোচনা। অংশগ্রহণকারীরা এসডিজি স্টুডিওতে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে থাকেন। সেখানে এসডিজি নিজে আমার এবং আমাদের সংগঠনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরি। বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করি, এসডিজি অর্জনে অবশ্যই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে না পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন অনেকটাই কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বের অন্যতম একটি সমস্যা। এজন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো। কিন্তু, এর শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ।

সেখানে রোহিঙ্গা সমস্যাও তুলে ধরেছি। আহ্বান জানিয়েছি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে অবশ্যই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যেন তাদের নাগরিকত্ব ফেরত দেয়া হয়  এবং সম্মানজনকভাবে নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরত নেয় মিয়ানমার।

এই কনফারেন্স আমার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এইচএসএফ’র পক্ষে এসডিজি অ্যাকশন ক্যাম্পেইনের প্রধান কো-অর্ডিনেটর মারিনা পন্টির সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিটের সৌজন্য বৈঠক। বৈঠকে আমি আমার সংগঠন এবং আমার দেশের এসডিজি কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেছি।

আমাদের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে মেরিনা পন্টি বলেন, ‘এসডিজি অর্জনে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। ওইদিনই সন্ধ্যার পরে শুরু হয় গ্লোবাল ফেস্ট ২০১৯ এর চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে অনুষ্ঠান।  যেখানে এসডিজি নিয়ে অসামান্য অবদানের জন্য ৮টি ক্যাটাগরিতে বিশ্বের ৮টি দেশের ইয়ুথ সংগঠনকে পুরস্কৃত করা হয়।

যথারীতি ৩ মে ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সেন্টারে পার্লামেন্ট হলে শুরু হলো বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, ব্রাজিল, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, সিরিয়া, লিবিয়া, নাজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সকলের লক্ষ্য একটাই- এসডিজি বাস্তবায়ন।

জাপানের প্রতিনিধি ‘শিং ও ইতিশিং’এর সাথে পরিচিত হয়েছি। তারা এসেছে এসডিজি বোর্ড গেম নিয়ে। তারা চায় এই খেলা সারা বিশ্বে প্রচার পাক। তাদের লক্ষ্য জাপানি এডুকেশন সিস্টেমের মাধ্যমে এসডিজি’র লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা।

দ্বিতীয় দিনে বের করা হয় এসডিজি র‌্যালি। এই র‌্যালির সামনে থেকে বাংলাদেশ এবং এইচএসএফ’র প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছি। তুলে ধরেছি গর্বের লাল-সবুজের পতাকা। গ্লোবাল ফেস্টে ১৫০ দেশের এক হাজারের বেশি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। তাদের সকলের লক্ষ্য একটাই- I Am SDGs, We Are SDGS.

৪ মে তৃতীয় ও শেষ দিনের অনুষ্ঠানে ১৫০ দেশের প্রতিনিধিরা দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন নিজ নিজ দেশে এসডিজি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করব। মারিনা পন্টির সমাপনী বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শেষ হয় তিন দিনব্যাপী গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল অব অ্যাকশন।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সকল সদস্যের উচিত, ২০৩০ সালের মধ্যে  এসডিজি’র ১৭টি লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। যেকোনো দেশ একা ভালো থাকলে বিশ্বে শান্তি  প্রতিষ্ঠিত হবে না, যখন সব দেশ একসাথে ভালো থাকবে তখনই বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সময় হলে স্লোগানে মুখরিত হয়- I Am SDGs, We Are SDGS.

তাই কাউকে পেছনে রেখে নয়, সবাইকে সাথে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে। কাজ করতে হবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে।

এম এ মুকিত

চেয়্যারম্যান, হিউম্যান সেফটি ফাউন্ডেশন

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

বাবা মা তোমাদের অনেক ভালোবাসি: আরও পড়ুন

আরও