ট্রাম্প ভীতি থেকে দ্বিধাবিভক্তি?

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

ট্রাম্প ভীতি থেকে দ্বিধাবিভক্তি?

পরিবর্তন ডেস্ক ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৬

ট্রাম্প ভীতি থেকে দ্বিধাবিভক্তি?

পরাজিত প্রার্থী হিলারি ক্লিন্টন তার সমর্থকদের নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানোর পরও মানুষ কেন রাস্তায় বিক্ষোভে নেমেছেন? শুধু বিক্ষোভই নয় ক্যালিফোর্নিয়াবাসী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার দাবি জানিয়েছে। সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোলাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২৫টি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি এটাই প্রথম বলে বিশ্লেষকদের মত। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? এক বিশ্লেষণে জানাচ্ছে বিবিসি।

টেনেসি অঙ্গরাজ্যের অস্টিন পি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. তাজ হাশমি বলেছেন, আমেরিকানরা যে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে এটারই একটা বহি:প্রকাশ এই বিক্ষোভ।

তিনি বলেন, ‘এই বিক্ষোভে প্রতিফলিত হচ্ছে সমাজ দুভাবে বিভক্ত। একটি হলো 'এলিট' বা শহুরে সমাজ, অপরটি হলো 'নন-এলিট'সমাজ'।

নির্বাচনের ফলাফল না মেনে এভাবে বিক্ষোভ করাটা ঠিক হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

‘আসলে এই বিক্ষোভ যারা করছেন তারা একধরনের ভীতি থেকে করছেন। তরুণদের মধ্যে এই ভয়টা রয়েছে। আফ্রিকান-আমেরিকান, মুসলিম, ল্যাটিনো-তারা ভয় পাচ্ছেন আসলে আমাদের এখন কী হবে?"- বলেছেন ড. তাজ হাশমি।

তবে এ বিক্ষোভ বেশিদিন থাকবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে অকল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়ায় বিক্ষোভকারীরা দোকানে ভাঙচুর করেছে। এসব স্থানে রায়ট পুলিশ ডাকা হয়েছে এবং তারা টিয়ার গ্যাস ছুঁড়েছে।

পোর্টল্যান্ড, ওরেগনের মতো কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীরা আমেরিকার পতাকা পুড়িয়েছে।

এ সময় তারা একটি আন্তঃরাজ্য মহাসড়কও অবরোধ করে রাখে।

লস অ্যাঞ্জেলসে ট্রাম্প বিরোধী সমাবেশের কারণে একটি প্রধান সড়কও বন্ধ হয়ে যায়।

শিকাগোয় ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে সমাবেশ করেছে বিক্ষোভকারীরা। তারা শ্লোগান দেন, "নো ট্রাম্প, নো কেকেকে, নো ফ্যাসিস্ট ইউএসএ"।

ফিলাডেলফিয়া, বোস্টন, সিয়াটল আর সানফ্যান্সিসকোতে বিক্ষোভ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের পর দেশটির প্রায় দশটি শহরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বৃহস্পতিবার রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারের বাইরে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীর মধ্যে পুলিশ ১৫ জনকে গ্রেফতারও করেছে।

লস এঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীরা 'ট্রাম্পকে দেশছাড়া করো', 'বর্ণবিদ্বেষ, লিঙ্গবৈষম্য আর সমকামী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হও' এ ধরনের ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ করেছে। প্রধান সড়ক বন্ধ করে ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকাও পোড়ানো হয়েছে।

আমেরিকার বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর রাস্তায়, অনেক স্থানে আমেরিকার পতাকায় আগুন দিয়ে এবং 'ট্রাম্প আমার প্রেসিডেন্ট নন' এই শ্লোগান এবং ব্যানার দেখিয়ে যেভাবে নির্বাচনের ফলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে মানুষ তা নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করছেন সংবাদদাতারা।

আসলে বিদ্বেষ কোথায়? কিংবা দ্বিধাবিভক্তির উৎস কোথায়?

ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করে কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি ইন্ডিয়ানার গভর্নর মাইক পেন্সের দৃষ্টিভঙ্গিও একটা প্রভাব ফেলছে, কারণ পেন্স হবেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এবার লিঙ্গের বিষয়টি যত বড় ভূমিকা পালন করেছে, এর আগে দেশটির কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এমনটি হয়নি। দেশটিতে কোনো 'নারী প্রেসিডেন্ট' আসবে কি আসবে না, এমন চিন্তাভাবনা নিয়ে ভোট দিয়েছেন অনেক আমেরিকান।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের 'নারী বিষয়ক সমস্যা'কে সামনে নিয়ে আসেন এবং তিনি যে নারীদের সম্মান দিতে জানেন না, অবমাননা করেন - এ ধরণের কথিত বিষয়গুলো হিলারির শেষ দিকের প্রচারণার প্রধান অংশ হয়ে উঠে।

তবে এ বিষয়ক প্রচারণা যে খুব একটা কাজে লাগেনি, তা নানা পরিসংখ্যানে উঠে আসে। বুথফেরত জরিপে দেখা যায় ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন ৪২ শতাংশ নারী।

ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা যায় যে ৫৩ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ নারী ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন, যদিও ট্রাম্প-পেন্সকে ভোট দিয়েছেন মাত্র ৪ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ নারী। আর হিস্পানিক নারী ভোটাররা ট্রাম্পকে নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকলেও দেখা যাচ্ছে যে ২৬ শতাংশ হিস্পানিক নারী ট্রাম্পকেই ভোট দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদগুলোকে নজরদারির আওতায় আনা উচিত এবং এটি যদি রাজনৈতিকভাবে ভুলও হয়, তাও তিনি সেটা আমলে নেবেন না। তিনি মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলেন এবং মুসলমানদের নজরদারি করার কথাও বলেছিলেন। ট্রাম্পের এমন বক্তব্য মুসলিম আমেরিকানদের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। এটাও দ্বিধাবিভক্তির একটা কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী বিতর্কিত মন্তব্যের একটি হলো 'মেক্সিকান ওয়াল' তৈরির বিষয়টি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে, নিচু মানের দেশ হয়ে গেছে এবং এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো থেকে আগত অভিবাসীরা।

‘আমি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ক্ষমতার প্রথম দিনই আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত বের করে দেওয়ার জন্য কাজ করব। মেক্সিকান ইমিগ্র্যান্টরা আমেরিকায় ড্রাগস চোরাচালান করে, তারা বিভিন্ন অপরাধ করে, ধর্ষণ করে। ভালো মানুষ মেক্সিকো থেকে আসে না। এটা বন্ধ করতেই হবে। সেজন্য আমি দক্ষিণের সীমান্তে একটা গ্রেট ওয়াল বানাব।’

এক কোটি দশ লাখের মতো অবৈধ অভিবাসী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যাদের কিছু সংখ্যক হিস্পানিক বা স্প্যানিশ ভাষাভাষী। তারা হয়ত এখন কিছুটা ভীত। কারণ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন ক্ষমতায় আসলে তিনি জোরপূর্বক অভিবাসীদের বিতাড়িত করার ব্যবস্থা করবেন।

মেক্সিকান পর্যটক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীরা হয়ত এর আওতায় পড়বে। যা টাম্প বিরোধী বিক্ষোভ আরো উসকে দিয়েছে।

ডব্লিউএন