ইতিহাস থেকে ১০ ভুতুড়ে শহর

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

ইতিহাস থেকে ১০ ভুতুড়ে শহর

পরিবর্তন ডেস্ক ১:৩৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৯

ইতিহাস থেকে ১০ ভুতুড়ে শহর

সময় কোনো একটা শহরে চিরদিন অপেক্ষা করে না। আজ যে শহর বা নগর হয়তো লোকে লোকারণ্য কাল তা পরিণত হতে পারে ভুতুড়ে জায়গায়। এক সময়কার শানশওকতে ভরপুর বাড়িগুলো একসময় এসে তার জৌলুস হারায়। মাঝে মাঝে প্রাসাদের চেহারায় ফুটে ওঠে দারিদ্রতার ছাপ। অথবা ভয়ঙ্কর রূপ। যেমন বাংলাদেশের সোনারগাঁয়ের পানাম নগরী। বাড়িগুলো দেখলেই বোঝা যায় এক সময় কতটা জৌলুস ছিল সেখানে—আজ তা এক পরিত্যক্ত শহরের চিহ্ন মাত্র। পৃথিবীতে এমন অনেক বিখ্যাত শহর আছে ১০০-২০০ বছর আগেও লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস করতো আজ সেগুলো জনশুন্য। এরকম শুনশান হয়ে পড়া ১০টি শহরের কথা জানাবো আপনাদের।

১. প্রিপিয়াত, চেরোনোবিল, ইউক্রেন:

১৯৮৬ সালে চেরোনোবিল পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে প্রিপিয়াতে ৫ লাখ লোক বাস করতো। ফলে সেখানে গড়ে ওঠে বিশাল এক শহর। তবে ৮৬ সালের ২৪ এপ্রিলের পারমানবিক দূর্ঘটনা প্রিপিয়াতের সব হিসেব পাল্টে দেয়। এ ঘটনায় প্রায় ৫০ জন লোক মারা যায়। পঙ্গুত্ব বরণ করে ও শারিরিক-মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক হাজার মানুষ।

পারমানবিক বিস্ফোরণের ফলে চেরোনোবিলের বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মারাত্নকভাবে বেড়ে যায়। ফলে সেখানে মানুষের বসবাস দূরে থাক, বেচে থাকা সম্ভব ছিল না। এখনো সেখানে মানুষের বেচে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ফলে প্রিপিয়াত শহরটি এখনো পরিত্যক্ত।

২. মিশিগান কেন্দ্রীয় স্টেশন, ডেট্রয়েট

ডেট্রয়েটের শিল্পের বিকাশের সাথে মিশে গেছে মিশিগান স্টেশন শহরের ভাগ্য। ১৮৯০ সালে ডেট্রয়েট পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত শহরে পরিনত হয়। বড় বড় গাড়ী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখানে কারখানা গড়ে তোলে। ফলে কয়েক লাখ মানুষ এখানে বসতি গড়ে। একসময় গাড়ী কারখানা গুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে চলে যেতে থাকে। চাকরিজীবীরাও শহর ছাড়তে থাকে। একসময় জনশুণ্য হয়ে পড়ে মিশিগান স্টেশন শহর। ১৯৮৮ সালে শেষ ট্রেনটিও এখান থেকে বিদায় নেয়। এরপর পরিত্যক্তই হয়ে আছে শহরটি।

৩.বিলিটজ সামরিক হাসপাতাল, জার্মানি

১৮৯৮ সালে জার্মানিতে নির্মিত হয় বিলিটজ সামরিক হাসপাতাল। ৬০টি ভবন নিয়ে গড়া এই হাসপাতালটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল। ১৯২০সালে আহত হিটলার এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তাই একে হিটলারের হাসপাতাল বলা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটিকে আরো বিস্তৃত করা হয়।

হিটলার এখানে সাড়ে ৪ কিলোমিটার লম্বা ডাক্তারদের হোস্টেল নির্মাণ করেন। বিশ্বযুদ্ধের পর এতবড় হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৯০ সালে রাশিয়ানরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলে এটি ভুড়ুতে হাসপাতালে পরিণত হয়।

৪. ভারোসা রিসোর্ট সিটি, সাইপ্রাস

একসময় পূর্ব ভূমধ্যসাগরের তীরে সাইপ্রাসের ভারোসা শহরটি ছিল সাইপ্রাসের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। ১৯৭৪ সালে তুরস্ক সাইপ্রাসের একাংশের মালিকানা দাবি করে দ্বীপের একটি এলাকা দখল করে নেয়। এরপর সেখানে সব ধরনের বিদেশিদের যাতায়াত নিষিদ্ধ করে। ফরে সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায় ফলে শহরটি ও সমুদ্রসৈকত এখন জনমানবহীন জায়গায় পরিণত হয়েছে।

৫. হাশিমা দ্বীপ, জাপান

জাপানের নাগাসাকি উপকুলে অবস্থিত একটি প্রাণবন্ত দ্বীপ ছিলো হাশিমা। দ্বীপের আকৃতি অনেকটা যুদ্ধজাহাজের মতো দেখতে। ১৮৮৭ সালে দ্বীপে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। ১৮৯০ সালে মিতশুবিশি কোম্পানি দ্বীপটি জাপানের কাছ থেকে কিনে নেয়। এরপর হাজার শ্রমিককে এখানে আনা হয় কাজের জন্য। জাপনের সর্বপ্রথম ৯ তলাবিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন তৈরি হয় এখানেই।

১৯৫৯ সালে মাত্র ৬.৩ হেক্টর জায়গায় লোকসংখ্যা ছিলো ৫২৫৯ জন। যা প্রতি বর্গ মিটারে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ছিলো। দ্বীপটি কয়লা উত্তোলনের জন্য হাজার হাজার শ্রমিকরা সারাদিন ব্যস্ত সময় কাটাতো ১৯৭৪ সালে ব্যস্ত খনিটি বন্ধ করা হলো তখনি হাশিমা দ্বীপ ছেড়ে চলে গেল মানুষরা। পরিত্যক্ত হয়ে গেল পুরো দ্বীপটি।

৬. ফতেহপুর সিকরি, ভারত

মুগল আমলে ভারতের রাজধানী ছিল আগ্রা। একসময় আগ্রা ঘণবসতিপূর্ন এলাকায় পরিণত হলে সম্রাট আকবর তার রাজধানী পরিবর্তন করার জন্য তৈরি করেন পরিকল্পিত নগরী ফতেহপুর সিক্রি। ১৬৭৫ সালে আকবর তার রাজধানী ফতেহপুরে স্থানান্তর করেন। এটি ছিল তখনকার বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর শহর। কিন্তু ধীরে ধীরে লোকজন এখানে পানির অভাব বুঝতে পারে। মাত্র ১০ বছরের মাথায় আকবর তার রাজধানী ফতেহপুর থেকে আবার আগ্রায় নিয়ে যান। বর্তমানে ফতেহপুর সিক্রি ষোড়শ শতাব্দীর একটি পুরোপুরি সংরক্ষিত শহর।

৭. সান-ঝি, তাইওয়ান

তাইওয়ানের সরকার সেদেশের ধনী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা এলাকা গঠনের উদ্যোগ নেয়। এজন্য সান ঝি এলাকাকে বেছে নেয়া হয়। সেখানে পরিকল্পিতভাবে রাস্তা ঘাট, স্কুল কলেজ হাসপাতাল ও দৃষ্টিনন্দন শত শত বাড়ি তৈরি করা হয়। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই বিনিয়োগের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। ভবন নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায়। ফলে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এজন্য অনেকের ধারণা জায়গাটি অভিশপ্ত।

৮. ডিসেপশন আইল্যান্ড, এন্টার্টিকা

এন্টার্টিকা ঘুরতে যাওয়া লোকজন একসময় প্রায় সবাই এখানে যাত্রাবিরতি করত ডিসেপশন আইল্যান্ডে। বৈজ্ঞানিক বাহ্যিক স্থাপনাগুলির জন্য এটি বেশ জনপ্রিয় স্থান ছিলো। ১৯৬০ এর দশকে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে এর ভিত্তি ধ্বংস করে দেয়ার ফলে আইল্যান্ডটির এখন শুধু দ্বীপের অবশিষ্ট অংশটুকু দেখতে পাবেন।

৯. ক্রাকো, বেসিলিক্যাটা, ইতালি

গ্রীকরা ৫৪০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ক্রাকো শহরের বসতি স্থাপন করে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়, কারাগার ও বাজার তৈরি করে তারা। কিন্তু ১৯৫৯ এবং ১৯৭২ সালের বেশ কয়েকটি বড় বড় ভুমিকম্পের কারণে শহরটি ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফলে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তখন থেকেই এই শহর জনমানব শূন্য হতে থাকে। "দ্য প্যাসন অফ দ্য ক্রাইস্ট" চলচ্চিত্রের চিত্রায়ন করা হয়েছিল এখানে।

১০, কোলম্যানস্কোপ, নামিবিয়া

নামিবিয়ার নামিব মরুভূমির বিখ্যাত শহরের নাম কোলম্যানস্কোপ। ১৯২০ সালে মরুভূমির এই শহরে হীরার খনি আবিস্কৃত হয়। বিনামূল্যে হীরা উত্তোলনের জন্য আফ্রিকা ও ইউরোপ থেকে হাজার হাজার লোক আসতে থাকে এই শহরে। ক্রমেই বড় শহরে পরিণত হয় কোলম্যানস্কোপ। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত লোক গমগম করতো এখানে। তবে এরপর পাশের একটি এলাকায় হীরার সন্ধান পাওয়া গেলে সবাই একে একে শহর ছেড়ে চলে গেলে শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

তথ্যসুত্র: www.rd.com

ইসি/