চলুন যাই ‘মন্দিরের ভূমি’ ওড়িশ্যায়   

ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

চলুন যাই ‘মন্দিরের ভূমি’ ওড়িশ্যায়   

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:০১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০১৯

চলুন যাই ‘মন্দিরের ভূমি’ ওড়িশ্যায়   

ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব উপকূলে ওড়িশ্যা রাজ্য অবস্হিত। এর রাজধানী হল ভূবনেশ্বর। রাজ্যটি আধুনিক পরিকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধাসহ দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর, রাজ্যের গ্রামীণ অংশগুলোর অসাধারণ উন্নতি হয়েছে। এখানে অনেক সুন্দর খোদাইয়ের কারুকার্যময় মন্দির থাকায় রাজ্যটি ‘মন্দিরের ভূমি’ নামেও পরিচিত, যেগুলি এই রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সাম্রাজ্যের স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণ দেয়। এই ভূমি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্যও বিখ্যাত। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল শাস্ত্রীয় ওডিসি নৃত্য শৈলী।

ওড়িশা শুধুমাত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাচীনকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লোকজন ওড়িশায় বসবাস করত। মহাভারতের সময়কালে পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা সর্বপ্রথম উপজাতিগুলো সবর ও সাওরা নামে পরিচিত ছিল।  আসুন আজ আমরা ওড়িশ্যার পুরি বিচ-চিলিকা হ্রদ-জগন্নাথ টেম্পল-লিঙ্গরাজ টেম্পল-ধৌলা গিরি... স্থানগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

চিলিকা হ্রদ:

চিলিকা এশিয়ার বৃহত্তম প্রাকৃতিক হ্রদ। পুরী, খুরদা ও গঞ্জাম - ওড়িশ্যার এই তিন জেলাকে ছুঁয়ে ১,১০০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে চিলিকা হ্রদের বিস্তার। উত্তরে দয়া নদী ও তার বেশ কিছু শাখা-প্রশাখা জল সরবরাহ করে হ্রদে আর চিলিকা লেকের দক্ষিণে ৩২ কিমি দীর্ঘ খাঁড়িপথ যোগাযোগ রাখে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। জোয়ারে সমুদ্রের পানি ঢোকে হ্রদে আর ভাঁটায় হ্রদের পানি নিকাশিত হয় সমুদ্রে।

নদী ও সমুদ্রের জলের এই অহরহ মিশ্রণে বহু বিশেষ প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী ও পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে চিলিকা লেক।

ভারতে সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী পাখির সমাগম হয় চিলিকায়। সুদূর রাশিয়ার কাস্পিয়ান, বৈকাল হ্রদ ও সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং মঙ্গোলিয়া থেকে উড়ে আসে পাখির দল এবং লাদাখ থেকে শীতের সময় পাখিরা চিলিকা লেকে আসে।

লেকের ধারে মোট তিনটি জায়গায় পর্যটক আবাসন। এদের মধ্যে অন্যতম হল সাতপাড়া। সাতপাড়ার মূল আকর্ষণ ডলফিন দর্শন। শীতের দিনে জেটিঘাট পর্যন্ত পৌঁছে যায় ডলফিন। আর আসে দেশ বিদেশের নানান পরিযায়ী পাখি। হ্রদের মাঝখানে কালিযাই, নলবন, কলিযুগেশ্বর, গড় কৃষ্ণপ্রসাদ ছাড়াও রয়েছে একাধীক দ্বীপ। সাতপাড়া জেটিঘাট থেকে বোট ভাড়া করে ডলফিনের সাথে সাথে দেখে নেওয়া যায় এই সব দ্বীপগুলোও।

যারা পাখি দেখতে ভালোবাসেন তাদের জন্য নলবন দ্বীপ তথা নলবন বার্ড স্যাংচুয়ারিটি অতি মনোরম। সাতপাড়া থেকে ৬ কিমি দূরে চিলকা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গম। ঝাউ আর পোলাং গাছে ছাওয়া ছোট্ট দ্বীপের একপ্রান্তে চিলকা আর অন্য প্রান্তে বঙ্গোপসাগর।

ঘুরে আসতে পারেন চিলিকার রাজহংস দ্বীপ থেকে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬০ কিমি রাজহংস দ্বীপ।চিলিকা লেক ও বঙ্গোপসাগরের মাঝে এক ‘sand bar’ যার পূর্ব দিকে sea-mouth বা সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী খাঁড়ি।

ধৌলা গিরি:

ভুবনেশ্বর-পুরী রোডে ভুবনেশ্বর থেকে ৫ কিমি গিয়ে, ডানে ৩ কিমি দূরে দয়া নদীর ধারে অনুচ্চ ধৌলী পাহাড়। ভুবনেশ্বরই ছিল অতীত কলিঙ্গ রাজ্যের রাজধানী। খৃস্টপূর্ব ২৬১ সালে ধৌলী পাহাড়ের পাদদেশে দয়া নদীর পাড়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে মৌর্য সম্রাট অশোকের ঐতিহাসিক কলিঙ্গ-যুদ্ধ সংগঠিত হয়। কলিঙ্গ বিজয়ে সম্রাট আশোকের নির্দেশে এক লক্ষ কলিঙ্গ সৈন্য হত্যা এবং দেড় লক্ষ সৈন্যকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়। সমসংখ্যক সাধারণ মানুষও মারা যায়। প্রায় এক মহাশ্মশানে পরিণত হয় কলিঙ্গ।

দারুণ অনুশোচনায় দগ্ধ হন সম্রাট অশোক। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে চন্ডাশোক রূপান্তরিত হন ধর্মাশোকে। যুদ্ধ নয়, প্রেম ও ভালবাসা হয়ে ওঠে তার ধর্ম-বিজয়ের পন্থা। ধর্মপ্রচারে তিনি প্রথমেই বেছে নেন ওড়িশ্যাকে। ধৌলী পাহাড়ের যে স্থানে দাঁড়িয়ে সম্রাট আশোক সৈন্যদেবর রক্তাক্ত মৃতদেহ ও তাদের তাজা রক্তে রাঙানো দয়া নদীর পানি দেখে বিচলিত হয়েছিলেন, ঠিক সেই স্থানে স্মারক হিসাবে পাহাড়ের পাথর কেটে বানানো হয়েছে হাতির মুখ ও সামনের দুটি পা। হাতি এখানে বুদ্ধের ও শান্তির প্রতীক।

এর অনতিদূরে এক প্রস্তর খন্ডে খোদিত আছে সম্রাট অশোকের প্রথম শিলালিপি অনুশাসন। কালো পাথরের গায়ে ব্রাহ্মী হরফে খোদাই করা রয়েছে ১১টি অনুশাসন। আর দুটি অনুশাসন অন্য জায়গায়।

যেভাবে যাবেন:

কলকাতা থেকে বাসে/ট্রেনে পুরি। পুরি থেকে ট্যাক্সিতে চিলিকা হ্রদ। পুরি থেকে চিলিকা হ্রদের দূরত্ব ১০৪ কিমি। পুরি থেকে ধৌলা গিরির দূরত্ব ৫৯ কিমি।

তথ্য ও ছবি: দ্বীপ বিশ্বাস

ইসি/