কাশ্মীর ভ্রমণ, খরচাপাতি ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত 

ঢাকা, ১ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

কাশ্মীর ভ্রমণ, খরচাপাতি ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত 

পরিবর্তন ডেস্ক ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১০, ২০১৯

কাশ্মীর ভ্রমণ, খরচাপাতি ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত 

ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে কাশ্মীর একতি স্বপ্নের স্থান। কাশ্মীর হিমালয়ান পর্বতমালার সবচেয়ে বড় উপত্যকা, কাশ্মীরকে বলা হয় ভূস্বর্গ। মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীর কাশ্মীরকে প্রথম তুলনা করেছিলেন স্বর্গের সঙ্গে। মোঘল সম্রাটরা দিল্লীর গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে নিস্তার পেতে অবকাশ যাপনের জন্য ছুটে আসতেন কাশ্মীরে। চশমাশাহী, পরিমহল, শালিমার, নিশাত, ভেরি নাগ ইত্যাদি তারই স্বাক্ষ্য বহন করছে। বর্তমানে সমস্ত পৃথিবী থেকেই ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা ভূস্বর্গ কাশ্মীর দেখার জন্য প্রতিনিয়ত ছুটে আসেন এখানে।

আমাদের দেশ থেকেও অনেকে এখন সময় সুযোগ পেলেই কাশ্মীর চলে যাচ্ছেন। তবে কাশ্মীর ভ্রমণের সঠিক নিয়ম ও খরচের ব্যাপারে না জানার কারণে অনেকে যেতে চান না। আবার গেলেও অনেক রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। যারা প্রথমবার কাশ্মীর যেতে চাচ্ছেন তাদের জন্য আমাদের আজকের আয়োজন। তো চলুন আমরা জানার বুঝার চেষ্টা করি বাংলাদেশ থেকে এই ভুস্বর্গে আমরা কিভাবে সহজে এবং কম খরচে ঘুরে আসতে পারি।

কাশ্নীর যাবার উপযুক্ত সময়: কাশ্মীর ঘোরার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তবে যে সময়ই যান সবসময়ই কম হোক বেশি হোক কাশ্মীরের রুপ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। তবে কাশ্মীরের পুরো রুপ দেখতে চাইলে আপনাকে অন্তত তিনবার যেতে হবে।

‪এপ্রিল থেকে মে বসন্তকাল: এই সময় ফুলে ভরা ভ্যালী। টিউলিপ ফুলও দেখতে পারবেন। আর শীতের পরপরই তাই বরফ ও অনেক দৃশ্য। ‪

সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর শরৎকাল: এই সময়ে বরফ কিছুটা কম থাকবে। তবে উপরের দিকে যাওয়া যাবে। যেমন, গুলমার্গ গন্ডোলার ২য় ফেজে, সোনামার্গের থাজিওয়াস হিমবাহে। এই সময় ফল পাওয়া যাবে। গাছে গাছে আপেল ঝুলে থাকবে। আর তার সাথে চিনার গাছের রঙিন রুপ।

‎ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শীতকাল: এই সময়ে দেখবেন সাদা শুভ্র পাহাড়। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ আর Snow fall তো আছেই। তবে শীতকালে অসুবিধাও অনেক। শীতের অনেক প্রস্তুতি নিতে হবে, রাস্তা-ঘাট বন্ধ থাকে ফলে অনেক জায়গায় যেতেই পারবেন না। এমন কি আপনার আটকে পড়ার চান্স অনেক বেশি।

তাই সবদিক বিবেচনা করলে এবং আপনি যদি একবার যেতে চান, তাহলে এপ্রিল-মে উপযুক্ত সময়। ‪

বাংলাদেশ থেকে কাশ্মীর যেভাবে যাবেন:

ট্রেনে যেতে চাইলে আপনাকে ঢাকা থেকে কলকাতা। কলকাতা থেকে জম্মু যেতে হবে এবং সেখান থেকে গাড়ী করে শ্রীনগর।

কলকাতা থেকে জম্মু যাওয়ার দুটি ট্রেন আছে। হিমগিরি ও জম্মু তাওয়াই, হিমগিরি সপ্তাহে ৩ দিন (মঙ্গল, শুক্র ও শনিবার) রাত ১১:৫০ টায় হাওড়া থেকে জম্মুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সময় লাগে ৩৫ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। আর জম্মু তাওয়াই প্রতিদিন চললেও সময় একটু বেশি লাগে।

অনেকে আবার ট্রেনে দিল্লী গিয়ে আগ্রার তাজমহল এগুলো ঘুরে কাশ্মীর যায় সেক্ষেত্রে আপনি দিল্লী চলে যান সেখানে ঘুরে তারপর জম্মুর ট্রেন পাবেন। কলকাতা থেকে দিল্লি যাবার ট্রেন সবসময়ই পাবেন। তবে রাজধানী এক্সপ্রেস আর দুরন্ত এক্সপ্রেসে আপনি ১৮ ঘণ্টাতে পৌছে যেতে পারবেন অন্যান্যগুলোতে বেশি সময় লাগবে।

কলকাতা থেকে জম্মু পর্যন্ত নন এসি স্লিপার ২২০০-২৫০০/- বাংলাদেশি টাকায় আর এসি ৩৩০০-৩৫০০/-টাকা পড়বে। এরপর জম্মু থেকে শ্রীনগর গাড়ীতে ৬ জনের দল হলে পার হেড ৬০০-৮০০/- টাকায় হয়ে যাবে। জম্মু থেকে শ্রীনগর যেতে সময় লাগবে ৮-১০ ঘণ্টা।

ট্রেনের টিকেট দেশের যেকোনো ট্রাভেল এজেন্সি থেকে অগ্রিম কেটে রাখতে পারেন অথবা গিয়েও কাটতে পারেন যেমন আপনার খুশি।

আকাশ পথে কাশ্মীর যাবেন যেভাবে: আকাশ পথে কাশ্মীর যেতে হলে ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক বিমানে প্রথম যেতে হবে দিল্লি ইন্ধিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেখান থেকে শ্রীনগর। অথবা ঢাকা থেকে কলকাতা যাবেন ট্রেনে বা বাসে পরে সেখান থেকে ডোমেস্টিক বিমানে জম্মু অথবা শ্রীনগর বিমানবন্দরে যাওয়া যাবে। কলকাতা থেকে সরাসরি শ্রীনগরে কোনো ফ্লাইট নেই তাই, দিল্লি হয়ে যেতে হয়।

বিমানের টিকেট শ্রীনগর পর্যন্ত ৮০০০/- ১৫,০০০/- টাকা বিভিন্ন মৌসুমের উপর নির্ভর করবে। ‪তবে বিমান খরচ কমানোর সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হলো বাংলাদেশের কোনো ট্রাভেল এজেন্সি দিয়ে যত আগে সম্ভব ১/২ মাস আগে বিমানের টিকেট কেটে রাখা এতে সস্তায় বিমানের টিকেট পাওয়া যায়।

‎কোন স্থল বন্দর দিয়ে ঢুকবেন:

দর্শনা বা বেনাপোল দিয়ে ঢোকায় ভালো হবে।

১. বেনাপোল (বেনাপোল-পেট্রাপোল): ঢাকা থেকে যেকোনো বাসে পৌছে যান সরাসরি বেনাপোল। সীমান্তে দুই দেশের ইমিগ্রেশন পেরিয়ে আরেকটি অটোরিকশায় ২০ রুপি নেবে বনগাঁও রেলস্টেশন পর্যন্ত। বনগাঁও থেকে কলকাতার ট্রেন পাওয়া যায় প্রায় প্রতি ঘণ্টায়ই। টিকেট হবে ২০-৩০ রুপি।

এছাড়া গ্রিনলাইন শ্যামলীসহ বেশকিছু বাস সার্ভিস সরাসরি কলকাতা পর্যন্ত যায়।

ট্রেনেও ঢাকা থেকে যেতে পারেন সরাসরি কলকাতা ভাড়া পড়বে ৬৫০ টাকার মতো। কমলাপুর বা চিটাগাং স্টেশনে টিকেট পাবেন। (কলকাতা হয়ে যাওয়াটা বেস্ট কারণ কলকাতাটাও দেখা হয়ে গেলো)

২. দর্শনা- গেদে দিয়ে যদি যেতে চান তাহলে প্রথমে দর্শনা হল্ট স্টেশনে যেতে হবে। এখান থেকে চেকপোস্ট ৫ কিঃমিঃ এর মতো। আপনি অটোরিকশা বা ভ্যানে চলে যান। ভারতের দিকের চেকপোস্ট গেদে রেল স্টেশনেই। এখান থেকে ১ ঘণ্টা ৩০ মিঃ পরপর ট্রেন আছে। ভাড়া শেয়ালদহ পর্যন্ত ৩০ রুপি ও দমদম জং ২৫ রুপি। আপনি যদি বিমানে শ্রীনগর যান তাহলে দমদম নামবেন আর ট্রেনে গেলে শিয়ালদহ।

সীমান্ত পেরিয়ে আপনার ডলারগুলো রুপিতে কনভার্ট করে নিবেন তবে কনভার্ট করার আগে অনলাইনে রেটটা জেনে নিবেন। এছাড়া কলকাতাতেও ভালো রেটে কনভার্ট করে নিতে পারবেন।

থাকার ব্যাবস্থা:

থাকার জন্য প্রচুর হোটেল পাবেন কাশ্মীরে। নানা মানের। নানা ধরনের হোটেল পাবেন কাশ্মীর যেখানে ৫০০-৩০০০ রুপি পড়বে। এর চেয়েও দামী দামী হোটেল পাবেন। আপনার বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী নিয়ে নিন হোটেল।

কাশ্মীকে কোথায় কোথায় ঘুরবেন:

কাশ্মীর পুরোটাই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য স্বর্গ। তারপরও ভিন্ন ভিন্ন লোকেশনে বেশ কিছু টুরিস্ট স্পটের তালিকা রইল আপনার সুবিদার জন্য।

১. শ্রীনগরে- মোঘল গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন, ডাল লেক ও নাগিন লেকে শিকারা রাইড, হযরত বাল মসজিদ।

২. গুলমার্গে- গন্ডোলা (ক্যাবল কার), গলফ কোর্স, বাবা ঋষির মাজার, আফারওয়াত পিক, সেন্ট মেরী চার্চ।

৩. পেহেলগাম: লিদার নদী, বেতাব ভ্যালী, আরু ভ্যালী, চন্দন বাড়ি এবং ঘোড়ায় ট্রেকিং করে পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট, মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান, ধাবিয়ান, কাশ্মীর ভ্যালী ভিউপয়েন্ট, কানিমার্গ, Waterfall, তুলিয়ান ভ্যালী ইত্যাদি। পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায়। তবে বৃষ্টি হলে রাস্তা অনেক পিচ্ছিল থাকে। আর তাছাড়া ঘোড়ায় চড়লে একটু এডভেঞ্চারও হয়।

৪. সোনামার্গ: প্রধানত থাজিওয়াস হিমবাহ। এছাড়া সিন্ধ নদী, Waterfall, বাজরাঙ্গী ভাইজান ও রাম তেরে গঙ্গা মেরে ছবির স্যুটিং স্পট। ‪

এবার দেখা যাক এই প্রধান স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য কিভাবে প্লান করা যেতে পারে

দিন-১ শ্রীনগর

দিন-২ পেহেলগাম (পেহেলগামে রাতে থাকবেন)

দিন-৩ পেহেলগাম (পেহেলগাম দেখা শেষ করে শ্রীনগরে আবারও ফিরে আসবেন)

দিন-৪ গুলমার্গ (গুলমার্গ দেখে শ্রীনগরে ফিরে আসবেন)

দিন-৫ সোনামার্গ (রাতে হাউজ বোট ডাললেক, শ্রীনগর থাকবেন থাকবেন)

এভাবে প্লান করলে আপনি ৫ দিনে মোটামুটি কভার করে ফেলতে পারবেন। তবে আমরা আপনাকে শুধুমাত্র একটা গাইডলাইন দিয়ে দিলাম আপনি আপনার মতো কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন।

সব জায়গাতেই রিজার্ভ গাড়ী নিতে হবে আপনাকে চারজন বসার মতো গাড়ীগুলো ১২০০-১৫০০ নিবে এর চেয়ে বড়গুলো ২-৩ হাজার নিবে আপনি যাচাই করে দাম দর করে গাড়ী ঠিক করবেন, কিন্তু এরপরও কথা আছে কাশ্মীরে এক জোনের গাড়ী আরেকজোন পর্যন্ত আপনাকে নিয়ে যাবে কিন্তু টুরিস্ট প্লেসগুলো দেখার জন্য আবার গাড়ী নিতে হবে ওখানকার যেমন পেহেলগাম ও সোনামার্গে রিজার্ভ গাড়ীতে যাওয়ার পর আবারও ওখানকার গাড়ী ভাড়া করতে হবে। যেমন পেহেলগামে থেকে আরু ভ্যালী ও চন্দনবাড়ী যেতে ভাড়া ১৬০০ রুপি। পেহেলগামে ৬ পয়েন্ট (পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট, ধাবিয়ান, বাইসারান, কানিমার্গ, কাশ্মীর ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট, waterfall) ঘোড়ায় প্রতিজনের ১৫০০-২০০০ রুপি। এদিকে সোনামার্গ থেকে থাজিওয়াস হিমবাহ গাড়ী ভাড়া ২৫০০- ৩৫০০/- রুপি।

তবে খরচটা নির্ভর করে আপনার ওপরে আপনি কতটা খরুচে বা বিলাসীতা প্রিয় এর উপর। তারপরও আমি একটা আইডিয়া দিয়ে দিচ্ছি। আপনার বাজেট ২৫- ৩০ হাজার টাকায় ঘুরে আসতে পারবেন। এটা একটা রাফ হিসেব খরচ বাড়তেও পারে আবার আপনি চাইলে কমতেও পারে। নির্ভর করে আপনার উপর ।। আমি শুধু একটা ধারণা দিলাম । তবে এজ পার মাই সাজেশন আসার সময় শ্রীনগর থেকে কলকাতা সরাসরি বিমানে চলে আসতে পারেন কারণ শ্রীনগর থেকে কলকাতা ট্রেনে প্রায় ৪৫ ঘন্টার জার্নি যা আপনার হয়তো বিরক্তির কারণ হতে পারে । এয়ারে ৪-৫ ঘন্টায়ই কলকাতা পৌছে যেতে পারবেন । এক দেড় মাস আগে বিমানের টিকেট কাটলে অনেক কমে কাটতে পারবেন ।

এবার কিছু দরকারি টিপস:

১. কাশ্মীর পর্যটন এলাকা। এখানে সবকিছুর দাম বেশি চাইবে। তাই যাই করুন না কেনো, দরদাম করতে ভুলবেন না। তবে ভদ্রভাবে কথা বলবেন অবশ্যই।

২. এখানকার খাবারে মশলা বেশি থাকায় আমরা বাংলাদেশীদের খেতে সমস্যা হয়। ভাতের দামও অনেক বেশি। তাই রুটি খেলে খরচ কম হবে এবং খাওয়াও যাবে।

৩. সন্ধ্যা ৮টার পর হোটেলের বাইরে অযথা ঘোরাফেরা করবেন না। আর হ্যাঁ, কেনাকাটা করতে চাইলে রাত ৮ টার মধ্যেই সারুন। কারণ রাত ৮ টার পর দোকান বন্ধ হয়ে যায়।

৪. যেখানেই যান পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।

৫. কাশ্মীর মুসলিম প্রধান (৯৯%)। তাই মুসলিম হলে পরিচয় দিলে সুবিধা পাবেন। আর একটি কথা কাশ্মীরীরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে খুব পছন্দ করে এবং সাকিব আল হাসানের খুবই ভক্ত। তাই বাংলাদেশি পরিচয় দিন নির্দিধায়। ‪

৬. ট্রাভেল ট্র্যাক্স ৫০০ টাকা যাবার আগে সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় দিয়ে দিলেই হবে তাহলে সীমান্তে আর এই ঝামেলাটা থাকলোনা।

প্রয়োজনে আপনি যাদের সাহায্য নিতে পারেন:

৭. ইজাজ আহমেদ, কাশ্মীরের একজন গাড়ীর ড্রাইভার মোবাইল নং- +৯১৯৬২২৮২৩৩৯৫

ইসি/

 

ভ্রমণ: আরও পড়ুন

আরও