উদয়পুরের জাগ্রত মাতা বাড়ি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮ | ১ ভাদ্র ১৪২৫

উদয়পুরের জাগ্রত মাতা বাড়ি

পলাশ সাহা, উদয়পুর (ত্রিপুরা) ১:১১ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৮

print
উদয়পুরের জাগ্রত মাতা বাড়ি

ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুর ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির যা স্থানীয়দের মাঝে মাতা বাড়ি নামে বেশ পরিচিত। আগরতলা শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে উদয়পুর শহরে টিলার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম একটি ‘ত্রিপুরেশ্বরী’।

আগরতলা শহর থেকে আমরা রওনা দিলাম মাইক্রোবাস আকারের ছোট গাড়িতে করে, যা এখানে মারুতি নামে পরিচিত। মন্দিরে পৌঁছাতে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের মতো লেগেছিল। মন্দিরের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই অদ্ভুত প্রশান্তিতে মন ভরে যায়।

কিছুদূর গেলেই চোখে পড়ে সুবিশাল মনোরম দিঘি যার নাম কল্যাণ সাগর তাতে খেলা করছে মাছ ও বিশালাকৃতির কচ্ছপ। কচ্ছপগুলো বিশাল শরীর নিয়ে ডুবছে আর ভাসছে মাঝে মাঝে পাড়ে এসে মানুষের আদর খাচ্ছে। এগুলো দেখতে ছেলে-মেয়ে-নারী-শিশুদের ভিড়। যত্ন করে খাবার দিচ্ছে কেউ, কেউবা ভক্তি ভরে একটুখানি ছুঁয়ে দিচ্ছে কচ্ছপের পিঠ।

কল্যাণ সাগর দীঘির একটু দূরেই মা ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দির। যার নামে রাজ্যের নাম ত্রিপুরা রাজ্যের নামকরণ বলে দাবি করা হয়ে থাকে। পঞ্চদশ শতকে রাজা ধনমাণিক্য আগরতলা থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে এই মন্দির স্থাপন করেন। মন্দিরের প্রাঙ্গণ কূর্ম (কচ্ছপ) এর অবিকল হওয়ায় এটি ‘কূর্ম পিঠ’ নামেও পরিচিত।

মন্দিরের ভেতরে কষ্টিপাথরের দু’টি মূর্তি। বড়টির নাম ত্রিপুরেশ্বরী। মহারাজা ধনমাণিক্য স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে এই বিগ্রহ এনে এখানে স্থাপন করে বলে কথিত আছে। কষ্টিপাথরের তৈরি এখানকার দেবীমূর্তি খুবই জাগ্রত, ছোট বিগ্রহটি ছোট মা নামে পরিচিত।

প্রতিবছর দিওয়ালীতে (দীপাবলি) এখানে বড় উৎসবের আয়োজন থাকে। এখানকার প্রসিদ্ধ এক প্রকার মিষ্টি সন্দেশ প্যাড়া যা মায়ের পুজোতে লাগে, মন্দিরের আশপাশে দোকানগুলোতে এই প্যাড়া ছিলো চোখে পড়ার মতো।

মন্দির ঘুরে দেখা যায়, পুজোর জন্য পূণ্যার্থীদের লম্বা লাইন। সবাই সারিবদ্ধভাবে মায়ের পুজো দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। পাশেই শিব মন্দির। ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের মতো এখানেও পূণ্যার্থীরা মোমবাতি, ধূপকাঠি প্রজ্জ্বলন করে থাকেন।

নতুন সাজে কয়েকজন বর-কনে জুটি দেখা গেলো জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল এখানে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারা হয়। তবে তার আগে বুকিং দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

শক্তি পুরাণ অনুসারে, এই ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম এক পীঠস্থান। বলা হয়ে থাকে, একবার এক মহাযজ্ঞ আয়োজন করেন দক্ষ রাজা। সেই যজ্ঞে শিব ছাড়া ত্রিভূবনের সবাইকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। শিবের মূর্তি বানিয়ে রাখা হয় প্রাসাদ ফটকে প্রহরী হিসেবে।

খবর পেয়ে ছুটে আসেন দক্ষ রাজারই কন্যা শিবপত্নী সতী। শিবের দারোয়ান মূর্তি দেখে লজ্জায় দেহত্যাগ করেন তিনি। উন্মত্ত শিব তখন সতীর মরদেহ কাঁধে নিয়ে শুরু করেন প্রলয়নৃত্য। কাঁপতে থাকে পৃথিবী। পৃথিবীটাই ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায় বুঝি। নিরুপায় হয়ে বিষ্ণু তখন তার হাতের চক্র দিয়ে সতীর শবদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করতে থাকেন। সতীর শরীরের মোট ৫১টি খণ্ড পতিত হয় (ভারতের বর্ষের সময়ে)) ৫১টি স্থানে। সেই স্থানগুলো পরিচিতি পায় শক্তিপিঠ হিসেবে। এমনই দুই শক্তিপিঠ চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড় আর মহেশখালীর আদিনাথ পাহাড়।

এই ত্রিপুরেশ্বরী তেমনই এক শক্তি পীঠ। রাজমালা গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, সতীর ডান পা পতিত হয়েছিলো এখানে।

যেভাবে যাবেন:

আগরতলা শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে উদয়পুর শহরে ‘ত্রিপুরেশ্বরী’ অবস্থিত। আগরতলা শহর থেকে রওনা দিলে মন্দিরে পৌঁছাতে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের মতো লাগবে।

লোকাল বাহনে করে যাওয়া যায়। তবে রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে গেলে ফিরতি পথে অনেক ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন। আর পরিচিত কেউ না থাকলে অথবা পথ ভালো চেনেন এমন কেউ না থাকলে, অবশ্যই একজন দক্ষ গাইড সাথে নিয়ে নেবেন। তাহলে অনেক সুবিধা পাবেন।

পিএস/ইসি/

 
.


আলোচিত সংবাদ