দিল্লির জামে মসজিদে এক প্রহর

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫

দিল্লির জামে মসজিদে এক প্রহর

মোস্তফা কামাল গাজী ৬:১০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৮

দিল্লির জামে মসজিদে এক প্রহর

পুরানা দিল্লি থেকে মেট্রো রেলে চড়ে বসলাম নয়াদিল্লি যাবো বলে। জীবনের এই প্রথম মেট্রো রেলে চড়া। ভালোলাগার অন্যরকম একটা শিহরণ দোল খাচ্ছিল মনে। একটু পর মাটির নিচ দিয়ে তুমুল বেগে ট্রেন চলতে লাগলো আমাদের নিয়ে। অন্যসব ট্রেনের মতো এতে কোনো ঝকঝক শব্দ নেই। নিরিবিলি হওয়ায় আমার পাশে বসা কলেজে পড়ুয়া ছাত্রটা অংক কষে যাচ্ছে দিব্যি। ভাড়া বেশি হলেও পুরো ট্রেন লোকে লোকারণ্য। অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা যায় বলে হয়তো এতো ভীড় হয় মেট্রোতে।

আধঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম নয়াদিল্লি। লিফটে চড়ে ওপরে উঠে এলাম। স্টেশনের বাইরে এসে মেহতাব ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় যাওয়া হবে?’

বললেন, ‘দিল্লির জামে মসজিদ কাছেই। সেখানে যাওয়া যায়।’

মেহতাব ভাইয়ের পিছু হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। একটু পর নজর পড়লো জামে মসজিদের বিশাল গম্বুজের ওপর। পথ এখনো অনেক বাকি। দূর থেকেই গম্বুজটির নজরকাড়া সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম বারবার। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর পৌঁছুলাম মসজিদের প্রথম গেটের সামনে। সেখানে পাহারায় আছেন কয়েকজন পুলিশ। গেট পেরিয়ে খাড়া কয়েকটি সিঁড়ি। বেয়ে ওপরে উঠে এলাম। লোকে লোকারণ্য পুরো মসজিদ। নারী-পুরুষের ঢল নেমেছে যেনো। চিৎকার-চেঁচামেচি চারপাশে। সামনে মসজিদের বিশাল গেট। ওপরে বড় অক্ষরে লেখা আছে, ‘বাবে আব্দুল্লাহ’। গেটের ভেতর সিঁড়ি বেয়ে মিনারের সর্বোচ্চ চূড়ায় যাওয়া যায়। একজন তাতে চড়ার দাম হাঁকাচ্ছেন একশ রুপি করে। আমরা পাত্তা দিলাম না। এমনিতেই সারাদিনের ক্লান্তি জমে আছে শরীরে।

গেট পেরোতেই নজর পড়লো মসজিদের বিশাল চত্বরে। সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক শাহি জামে মসজিদটি। একদল কবুতর মানুষের ছিটানো খাবার টুকে টুকে খাচ্ছে চত্বরের ওপর। আরেকদল উড়ছে আকাশে। চত্বরের মেঝেতে বড় একটা হাউজ। ওজু করে নিলাম সেখানে। মসজিদের ভেতর গিয়ে জোহর নামাজ পড়ে নিলাম। নামাজ শেষে ঘুরে দেখলাম মসজিদের আশপাশ। লাল বেলে পাথর দিয়ে নির্মিত মসজিদের জায়গায় জায়গায় পুরোনো কারুকার্যের ছাপ। চারপাশের মিনারগুলো সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদের ভেতরে জায়গা কম। মাত্র দু কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া যায়। লোকজন বেশি হলে চত্বরেই পড়া হয় নামাজ।

ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বসলাম হাউজের পাশে। স্থানীয় এক বৃদ্ধ থেকে জেনে নিলাম এ মসজিদের নির্মাণ-ইতিহাস। মসজিদটি নির্মাণ করেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান (১৬৪৪ থেকে ১৬৫৬ সালে)। ৫ হাজার শ্রমিক নির্মাণ করে মসজিদটি। তখনকার সময়ে প্রায় ১০ লাখ রুপি ব্যয় হয়। উজবেকিস্তানের বুখারা নামক শহরের একজন ইমাম মসজিদটি উদ্বোধন করেন। মসজিদ প্রাঙ্গণে একসঙ্গে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। মসজিদটির পূর্ব নাম ছিল ‘মসজিদে-ই জাহে নুমা’ যার অর্থ’ ‘জগতের প্রতিবিম্ব মসজিদ’।

১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহে ব্রিটিশদের বিজয়ে মসজিদটিকে দখল করে একটি সৈন্য ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। শহরবাসীকে শাস্তি দেয়ার জন্য মসজিদটিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল তারা। এই মসজিদের নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্যবিষয়ক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে মানুষকে। তিনটি বিশাল ফটক চারটি সাদা গম্বুজ এবং দুটি মিনার রয়েছে মসজিদে। মিনার দুটির উচ্চতা প্রায় ৪০ মিটার। মিনারটির পাঁচ ধাপে পাঁচটি করে ব্যালকনি রয়েছে যার প্রথম তিনটি লাল বেলেপাথর, সাদা মার্বেল এবং পাথর দিয়ে তৈরি। লাল বেলেপাথর এবং সাদা মার্বেলের স্ট্রাইপ দেয়া মিনার দুটি সূর্যের আলোতে রঙ বদলায়। ঝলমলে সূর্যালোক এবং ভরা পূর্ণিমার সময় এর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য হৃদয় কেড়ে নেয়। বেলেপাথরের ভিত্তির ওপর নির্মিত মসজিদটি ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচুতে।

পাশে বসা লোকটি থেকে আরেকটি অদ্ভুত তথ্য জানলাম। তা হলো, যুগে যুগে এই মসজিদের অনেক পরিবর্তন হলেও ইমাম নিয়োগের পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। নির্মাণের পর থেকে বংশপরম্পরায় দিল্লির জামে মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন বুখারি পরিবার। এমন নিয়ম বিশ্বের আর কোথাও নেই। নিয়মটা জেনে বেশ আপ্লুত হলাম।

সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ক্রমশ হেলে পড়ছে। সন্ধ্যে নামার আগে যেতে হবে আরো কয়েকটি জায়গায়। তাই দেরি না করে বৃদ্ধ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম মসজিদের বাইরে।

লেখক : ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ উচ্চশিক্ষার্থী বাংলাদেশি আলেম

এএইচটি