স্পেনে যে ঐতিহাসিক মসজিদে চলে যিশুর প্রার্থনা

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

স্পেনে যে ঐতিহাসিক মসজিদে চলে যিশুর প্রার্থনা

হাম্মাদ রাগিব ৮:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

স্পেনে যে ঐতিহাসিক মসজিদে চলে যিশুর প্রার্থনা

স্পেনে মুসলিম শাসনামলের অনন্য কীর্তি ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদ

স্পেনে মুসলিম শাসনামলের অনন্য কীর্তি ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদ। আয়তনে মসজিদুল হারামের পরেই যে মসজিদটির অবস্থান। স্থাপত্য, নির্মাণশৈলি এবং কারুকার্যের মুনশিয়ানায় হাজার বছরের পুরনো এই মসজিদটি আজকের আধুনিক বিশ্বকেও তাক লাগিয়ে রেখেছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শত শত বছর ধরে স্পেনের মুসলিম শাসনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল যে মসজিদ, যে মসজিদে জুমা ও রোজকার ওয়াক্তিয়া নামাযের পাশাপাশি নিয়মিত ছিল ইলমি মজলিস, স্পেন থেকে মুসলিম শাসনের পতনের পর কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে এখন নামাযের বদলে হয় যিশুখ্রিষ্টের প্রার্থনা। মসজিদের আদল, কারুকাজ, সৌন্দর্য—সবকিছুই অক্ষুণ্ন আছে, নেই কেবল মুসলিমদের কোনো কার্যক্রম। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে খ্রিষ্টানদের গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মসজিদটি। কঠোরভাবে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে নামায, সেজদা, রুকুসহ যেকোনো ইসলামি কার্যক্রম।

উপর থেকে কর্ডোভার জামে মসজিদ

অথচ একসময় এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই মুসলিম চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদদের কত আয়োজন আর মুখরতা ছিল। তাফসিরে কুরতুবি’র সঙ্গে আজকের মুসলিম বিশ্ব সুপরিচিত, সুবিখ্যাতে এই তাফসিরগ্রন্থের লেখক আল্লামা কুরতুবি এখানেই তাফসিরের পাঠ দিতেন তাঁর ছাত্রদেরকে। শায়খুল আকবার ইমাম ইবনে আরাবির তাসাউফের দরস, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আন্দালুসি’র পাঠদান, ইবনে হাজাম জাহেরির ফিকহি আলোচনা, বাকি ইবনে মাখলাদের হাদিসের দরস—এ মসজিদেই হতো।

স্পেনের আজকের কর্ডোভা বা কর্ডোভা নগরীতে ঐতিহাসিক সেই মসজিদ কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নেই ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের মুখরিত সেই দরসগুলো। শত শত বছর ধরে মুসলিমদের নামায আদায়ের অধিকারটুকুও দেওয়া হচ্ছে না এখানে।

কর্ডোভা মসজিদের অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য মুসলিমদের বুকে কেবল হাহাকারই জাগায়।

স্পেনে মুসলিমদের শাসনপ্রতিষ্ঠার পর আন্দালুস নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে এই অঞ্চল। মুসলিমদের সেই আন্দালুসের রাজধানী ছিল কর্ডোভা, আরবি জবানে যেটার উচ্চারণ কুরতুবা। মুর মুসলিমদের হাতে স্পেনে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন ঘটার ৭৩ বছর পর সুলতান আবদুর রহমান (প্রথম)-এর হাত ধরে সেখানে উমাইয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেবছর, ৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি কর্ডোভার ঐতিহাসিক মসজিদটির ভিত্তি স্থাপন করেন।

মসজিদের একপাশের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি

নিজ তদারকিতে তিনি মসজিদের নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। দৈনন্দিন একঘণ্টা সময় খলিফা নিজে মসজিদ নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর তিন বছরের শাসনামলে মসজিদকে তিনি মোটামুটি দাঁড় করিয়ে যান। ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ইনতেকালের পর তাঁর পুত্র হিশাম খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনিও মসজিদটির সৌন্দর্য বর্ধনে প্রভূত অবদান রাখেন।

খলিফা হিশাম ৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটির প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হবার পর কর্ডোভা মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় দৈর্ঘ্যে ৬০০ এবং প্রস্থে ৩৫০ ফুট। হিশামের পরবর্তী প্রতিজন শাসক মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধনে ধারাবাহিক কাজ করে যান।

বর্তমানে গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত মুসলিম শাসনামলের কর্ডোভার জামে মসজিদে খ্রিস্টান নানেরা

নবম শতাব্দীতে এসে সুলতান আবদুর রহমান (তৃতীয়)-এর শাসনামলে মসজিদটির নির্মাণকাজ পূর্ণতা লাভ করে।

মসজিদটির আয়তন দাঁড়ায় তখন একলক্ষ ১০ হাজার চারশত স্কয়ার ফিট। চারপাশে দরোজা থাকে মোট ৫০টি। বিশাল আয়তনের এ স্থাপত্যের ছাদের জন্য স্তম্ভই আছে ১২৯৩টি।

মসজিদের পিলার ও দৃষ্টিনন্দন অভ্যন্তরীণ দৃশ্য

নির্মাণের পর মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম স্থাপত্যশৈলির মর্যাদা লাভ করে। নবম ও দশম শতাব্দীর পৃথিবীতে মুসলমানদের আশ্চর্য এ স্থাপত্য ছিল সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

তারপর খ্রিষ্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রানী ইসাবেলা মুসলমানদের আভ্যন্তরীণ কলহের সুযোগ নিয়ে ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে যখন স্পেন দখল করল, তারপর থেকেই রাজার নির্দেশে কর্ডোভা মসজিদকে গির্জায় রূপান্তরিত করা হয়। নিষিদ্ধ করা হয় নামাযসহ মুসলমানদের যাবতীয় কার্যক্রম। চারকোণা আকৃতির সুউচ্চ যে মিনারটি স্থাপন করেছিলেন সুলতান তৃতীয় আবদুর রহমান, যে মিনার থেকে পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় ধরে রোজানা পাঁচবার ভেসে আসত আল্লাহু আকবারের বুলন্দ আওয়াজ, সে মিনারটিতে লাগানো হয় গির্জার ঘণ্টা। আজানের বদলে মিনার থেকে ভেসে আসে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি।

মসজিদের দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং ছাদ ও গম্বুজের অনন্য কারুকাজ

কর্ডোভা মসজিদ বর্তমানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে আছে। কিন্তু মসজিদটিতে এখন ঢুকলেই চোখে পড়বে যীশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি। দেয়ালের গায়ে যেখানে যেখানে আল্লাহর নাম ও আরবি ক্যালিগ্রাফি ছিল, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন তৈল চিত্রের ক্রিশ্চিয়ান ফলক। বিশাল মসজিদের স্থানে স্থানে স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য মূর্তি।

দীর্ঘ সাত শো বছরে এখানে একবার মাত্র একজন ব্যক্তি—আল্লামা ইকবাল দুরাকাত নামায আদায়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। এমনিতে এখানে নামায আদায়, এমনকি রুকু কিংবা সেজদা করাও মুসলমানদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে স্পেন সফরকালে তিনি কর্ডোভা মসজিদ পরিদর্শন করতে গিয়ে এর অভ্যন্তরে দুরাকাত নামাযে আদায়ের অনুমতি চান। স্পেন প্রশাসন বিশেষ অনুমতিতে তাঁকে নামায আদায়ের সুযোগ দেয়।

সাত শত বছর পরে আল্লামা ইকবাল যখন আল্লাহর এই ঘরে নামায আদায় করেন, পরিদর্শন করেন হারানো আন্দালুসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি, তখন তাঁর মনের অবস্থা কী হয়েছিল, তিনি ব্যক্ত করেছেন কর্ডোভা মসজিদকে নিয়ে রচিত তাঁর সাতটি কবিতায়।

কর্ডোভা মসজিদে আল্লামা ইকবালের নামায আদায়ের সেই বিরল দৃশ্য।

সাতশো বছরে আল্লামা ইকবাল ছাড়া আর কোনো মুসলিমের ভাগ্য হয়নি কর্ডোভা মসজিদে দুরাকাত নামায আদায় করার। পর্যটক মুসলিমরা যাতে রুকু করারও কোনো সুযোগ না পান, এ জন্য সার্বক্ষণিক সিকিউরিটি ফোর্স মোতায়েন থাকে পুরো মসজিদে। তাই একজন সত্যিকারের মুসলিমের জন্য কর্ডোভা মসজিদ পরিদর্শনে গেলে চোখের জল আটকে রাখা মুশকিল হয়ে ওঠে।সূত্র :
১. স্পেনে ইসলাম ও মুসলমানদের অবদান
, মোঃ আবু তাহের; ইসলামিক ফাউন্ডেশন
২. কর্ডোভা মসজিদ
, Shamsul Haque Pyash
৩. দ্য মস্ক ক্যাথিড্রাল অব কর্ডোভা
, তাহসিনা খাতুন
৪. উইকিপিডিয়া

এমএফ/

 

তাহজিব / মুসলিম ঐতিহ্য : আরও পড়ুন

আরও