ফ্রান্সের মুঘল পাণ্ডুলিপিতে সচিত্র ইসরা ও মিরাজ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

ফ্রান্সের মুঘল পাণ্ডুলিপিতে সচিত্র ইসরা ও মিরাজ

আল জাজিরা আরবী অবলম্বনে, মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৬:০৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

ফ্রান্সের মুঘল পাণ্ডুলিপিতে সচিত্র ইসরা ও মিরাজ

ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে ‘মিরাজ নামা’ নামে একটি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। এটি একটি ইসলামী পাণ্ডুলিপি যা পনেরো শতকে সুলতান শাহরুখ বিন তৈমুর লং-এর আদেশে তৎকালীন খোরাসানের (বর্তমান আফগানিস্তান) অন্তর্গত হেরাত অঞ্চলে আলোর মুখ দেখেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ৮৪০ হিজরি সনে তুর্কি-উইঘুর ভাষায় এর মূল টেক্সট লিপিবদ্ধ হয়।

ইরানী মিনিয়েচারে (ক্ষুদ্র চিত্র) মহানবী (সা.) এর মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস ও সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশ সফরের ঘটনাকে চিত্রিত করার অনেকগুলো প্রচেষ্টার মধ্য হতে এটি একটি। এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নবীজির ইসরা ও মিরাজ এবং জান্নাত পরিভ্রমণ।

পূর্ব তুর্কিস্তানের কবি মীর হায়দার মূল রচনাটি প্রণয়ন করেন এবং হেরাতের লিপিকার মালেক বখশি উইঘুর লিপিতে একে লিপিবদ্ধ করেন। উইঘুর লিপি হল আরবি বর্ণমালায় তুর্কি ভাষা। পাণ্ডুলিপিতে ৬১টি মিনিয়েচার রয়েছে।

ক্ষমতায় স্থির হওয়ার পর সুলতান শাহরুখ তার সময়ে বিকাশ লাভ করা শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন এবং কিংবদন্তি সিল্করুটসহ এশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে প্রধান বানিজ্যিক রুট স্থাপন করেন। ফলে হেরাত তৈমুর সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক, বানিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এবং শাহরুখ হয়ে ওঠেন তার সংস্কৃতি ও কূটনীতির জন্য প্রসিদ্ধ সুলতান। তিনি এমন অনেক ক্ষতির সংস্কার সাধন করেন যেগুলোর কারণ ছিলেন তার বাবা তৈমুর লং।

ইসলামী শিল্পে ঊর্ধ্বারোহণকে চিত্রিত করে অঙ্কিত অন্য ছবিগুলোর চেয়ে “কিতাবুস সুঊদ” অধিক পরিপূর্ণ। নবীজি (সা.) এর ঊর্ধ্বারোহণের এত বেশি পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী সচিত্র ভ্রমণ হিসেবে পরিচিত ইসলামী পাণ্ডুলিপি আর নেই। সুসজ্জিত ও বাঁধাইকৃত এ পাণ্ডুলিপিতে সংরক্ষিত তৈমুরীয় মিনিয়েচার থেকে বেশি আসমান, ফেরেশতা, জাহান্নাম এর প্রতিকৃতি রয়েছে।

ধারণা করা হয় ইসরার রজনীতে এই গম্বুজটির স্থানেই নবীজি (সা.) পূর্ববর্তী নবী ও ফেরেশতাদের নিয়ে দুই রাকাত নামাযের ইমামতি করেন।

ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি তৈমুরীয় রাজবংশের শাসনামলে (১৩০৭-১৫০৭) মধ্য এশিয়া ও ইরানে বিকশিত ইসলামী চিত্রকলার ঐতিহ্যগত শৈলীর সাক্ষী প্রদান করে। যে রাজবংশ ইসলামী বিশ্ব ও পূর্ব-বিশ্বের মাঝে নিবিড় যোগাযোগের সাক্ষী হয়। যদিও এ মিনিয়েচারগুলো একটি মৌলিক ইসলামী ঘটনাকে চিত্রিত করে, তবু এর আইকনগুলো চীন ও মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধদের প্রভাবের কথা জানিয়ে দেয়।

নবীজির ভ্রমণ ও নামাযের প্রমাণ
চৌদ্দ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। পৃথিবীর ইতিহাসে নবীজির রাতের সফর ও সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ এশীয় ইসলামী শিল্পে চিত্রাকারে অন্তর্ভুক্তিকরণ সম্পন্ন হয়েছে। এবং খানিদ শাসনামল থেকে কাজার যুগ (১৭৯৪-১৯২৫) পর্যন্ত জাঁক-জমকপূর্ণভাবে সচিত্র ও স্বতন্ত্রভাবে “মিরাজ নামা” প্রকাশ করাও সম্পন্ন হয়েছে।

যেমনিভাবে অন্যান্য প্রমাণাদি একথার ইঙ্গিত করে যে, এই শিল্পসম্মত কাজগুলো পারস্যের ধর্ম ও মতাদর্শগুলোর মধ্যকার দ্বন্ধের যুগে শাসক শ্রেণীর মাঝে ইসলামের ধারণা ও সুন্নী মতাদর্শের সমর্থনে ব্যবহৃত হয়।

এ সত্তেও অলঙ্করণে বৌদ্ধিক উপাদান রয়েছে। তন্মধ্য হতে কয়েকটি ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার বৈচিত্র্যময় এশিয়ান উত্তরাধিকার থেকে নেওয়া।

মিরাজ নামা একইভাবে নামাযকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিছু মিনিয়েচারে হাতের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শিত হয়েছে। যা থেকে বোঝা যায় এগুলো অধিকাংশ ফার্সি ভাষাভাষির জন্য সুন্নীদের নামাযের সচিত্র দলীলের মত ব্যবহৃত হয়েছে। এবং সম্ভবত তা শাসকের তত্বাবধানে। যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই সচিত্র পান্ডুলিপি কেবলই শিল্পের প্রেরণা থেকে না, বরং এর পেছনে ধর্মীয় প্রণোদনাও ক্রিয়াশীল ছিল।

শোড়ষ শতাব্দীর শেষভাগে তৈমুরীয় পান্ডুলিপি মিরাজ নামা ইস্তাম্বুল পৌঁছে এবং ১৬৭২ সাল পর্যন্ত তোপকাপি প্রাসাদের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হয়। উল্লেখ্য যে, মিরাজ নামার এই সংস্করণ এবং অপর সংস্করণ যা খানিদ শাসকদের মধ্য হতে ইলখানিদের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত, উভয়টিই পরবর্তীতে আরও অনেক চিত্রকলার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে। ১৫৯৫ সালে উসমানী সুলতান তৃতীয় মুরাদের জন্য প্রস্তুতকৃত নবীজি (সা.) এর জীবন যাত্রার উপর বাঁধাইকৃত একাধিক সচিত্র পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়।   

নবীজি (সা.) এর বিশেষ প্রকার উর্ধ্বারোহন যদিও অনেক দীর্ঘ, তবু তা পাঁচটি মিনিয়েচারে চিত্রিত করা হয়েছে। যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জিবরাঈল (আ.) এর মক্কায় পৌঁছা, মসজিদুল আকসা অভিমুখে নবীজির সফর, নবীদের নিয়ে নামাযের ইমামতি, মুসলমানদের উপর নামায ফরয হওয়া এবং মক্কায় নবীজির প্রত্যাবর্তন।

মিরাজ নামার চিত্রগুলি কী বলে?

প্রাচ্য শিল্পের ভিত্তি অনুসারে একজন শিল্পী তার শিল্পকর্মে আল্লাহর সৃষ্টি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। তার শিল্প-উপাদান ও আকৃতি ঐশ্বরিক আলো ফুটিয়ে তোলার একটি চেষ্টা। 

নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃতির অনুসরণ করা শিল্পীর জন্য আবশ্যক নয়। বরং সে আধ্যাত্মিক ঘটনাগুলো উপস্থাপনের জন্য বাস্তবতার প্রতীক ব্যবহার করবে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিল্পে বিশেষজ্ঞ সুমাইয়া রমজানযাহী ও হাসান বুলখারীর মতে, মিরাজ নামায় ইরানী মিনিয়েচারে অঙ্কিত আগুণ কোন প্রাকৃতিক আগুণ বা জাহান্নামের চিত্র নয়। বরং তা আল্লাহর পবিত্র নূরের প্রতিকৃতি।

ইসলামী প্রাচ্যশিল্পে প্রতীক গভীর অর্থ ধারণ করে। ইসলামী চিন্তার আলঙ্কারিক বোধ এবং অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য উপভোগের সক্ষমতা যার মর্মোদ্ধার করতে সহায়ক হবে। সূফী ধারণায় আলো এবং আগুণ এই প্রতীকী পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে।  

মিরাজ নামার পাণ্ডুলিপি একই সাথে বস্তু জগত, সপ্ত আকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের চিত্র একত্রিত করেছে। যা থেকে অনুমান করা যায় যে, শিল্পী বিভিন্ন প্রকার আলো ও আগুণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। যদিও এই দাবী করা যায় না যে, তিনি এই পার্থক্যের অস্পষ্ট অর্থ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন।

সূত্র : আল জাজিরা আরবী

এমএফ/

আরও পড়ুন...
ইসলাম ও আরব্য ঐতিহ্যের নিদর্শনে সমৃদ্ধ জেদ্দার ‘আব্দুর রউফ খলীল জাদুঘর’
ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের সেই গুহা
বিশ্ব ঐতিহ্যের বিস্ময় ইরানের তাব্রিজ বাজার 
মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য দশ স্থাপনায় ছাদের আকর্ষণীয় নকশা
তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত জাপানের বৃহত্তম মসজিদ
ইথিওপিয়ার অনাড়ম্বর মসজিদে নবীযুগের প্রতিচ্ছবি
তুরস্কের অভিনব জান্নাতী মসজিদ
বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রাণীদের বন্ধু ফিলিস্তিনি ‘আবু হুরাইরা’ (ভিডিও)
স্পেনে গির্জায় রূপান্তরিত মুসলিম শাসনামলের ৫ মসজিদ
প্রাচীন ইসলামী স্থাপত্য নিদর্শন দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ