স্পেনে গির্জায় রূপান্তরিত মুসলিম শাসনামলের ৫ মসজিদ

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

স্পেনে গির্জায় রূপান্তরিত মুসলিম শাসনামলের ৫ মসজিদ

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:১৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯

স্পেনে গির্জায় রূপান্তরিত মুসলিম শাসনামলের ৫ মসজিদ

৭১১ ঈসায়ী সনে নির্যাতিত জনতার আহবানে স্পেন বিজয় করেন মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ। এরপর থেকে দীর্ঘ সাতশত বছর স্পেন মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। আন্দালুসিয়া নামে পরিচিত তখনকার এই ভূখন্ডটি ছিল তৎকালীন অন্ধকার ইউরোপে সভ্যতার বাতিঘর। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সভ্যতার সব অঙ্গনে তৎকালীন আন্দালুসিয়া ছিল ইউরোপের সমৃদ্ধতম দেশ। মূলত ইসলামী সংস্কৃতির স্পেন থেকেই আজকের ইউরোপ সভ্যতার পাঠ গ্রহণ করেছে।

কিন্তু কালের পরিক্রমায় নানা ষড়যন্ত্র ও বিশেষভাবে শাসক গোষ্ঠীর আদর্শচ্যুতির ফলে ১৪৯২ সালে সম্মিলিত খ্রিস্টান শক্তির কাছে মুসলিম গ্রানাডার পতন ঘটে। এর মাধ্যমেই স্পেনে মুসলিম শাসনের সুদীর্ঘ সাতশত বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সমাপ্তি হয়। গ্রানাডা দখলের পর খ্রিস্টান শাসকেরা স্পেনীয় মুসলমানদের উপর তাদের প্রচন্ড ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। স্পেনীয় মুসলমানরা খ্রিস্টান শাসকদের অত্যাচারের লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়।

মুসলমানদের জন্য তারা তিনটি পথ খুলে দেয়, স্পেনে বসবাস করতে হলে হয় খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করতে হবে বা ধর্ম পরিবর্তনে রাজী না হলে তাদের দেশত্যাগ করতে হবে। যারা দুইটির একটিও করতে সম্মত হবে না, তাদের জন্য তৃতীয় পথ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এভাবে এক সময়কার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি মুসলমানশূন্য হয়ে পড়ে। 

শুধু মুসলিম জনসাধারণের উপরই নয়, বরং মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ বিভিন্ন বস্তু ও বিষয়ও তাদের আক্রোশের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। স্পেনে অবস্থিত প্রায় সকল মসজিদই এসময় স্পেনের খ্রিস্টান শাসকরা ধ্বংস করে অথবা গীর্জায় পরিবর্তন করে।

এ নিবন্ধে স্পেনের গীর্জায় পরিণত করা পাঁচটি মসজিদ সম্পর্কে সংক্ষেপে বিবরণ দেওয়া হল।

১. কর্ডোভা জামে মসজিদ

স্পেনে উমাইয়া শাসনের প্রতিষ্ঠাতা আমীর প্রথম আবদুর রহমান তার রাজধানী কর্ডোভায় এই মসজিদটি ৭৮৪ ঈসায়ীতে নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদটির আয়তন ও শোভাবর্ধনসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করা হয়। ১২৩৬ ঈসায়ীতে খ্রিস্টীয় রাজশক্তির হাতে কর্ডোভার পতন হলে খ্রিস্টান শাসকেরা মসজিদটিকে গির্জায় পরিবর্তন করে।

২. আলমুনাসতের মসজিদ

স্পেনের বর্তমান আন্দালুসিয়া অঞ্চলের হুভান প্রদেশের গ্রাম্য শহর আলমনাসতের লা রিয়েলে এই মসজিদটি অবস্থিত। স্পেনের মুসলিম সভ্যতার গ্রামীণ স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে এখন এই একটি স্থাপনাই বর্তমানে টিকে আছে। দশম শতাব্দীতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। খ্রিস্টীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই মসজিদটিকে ক্যাথলিক গীর্জায় পরিণত করে ফেলা হয়।

৩. জেরাজ ডি লা ফ্রন্টেরার আলকাজার দূর্গ মসজিদ

স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের কাদিজ জেলার জেরাজ ডি লা ফ্রন্টেরা শহরের আলকাজার দূর্গে মসজিদটি অবস্থিত। একাদশ শতকে স্পেনের আলমোহাইদ শাসক কর্তৃক এই দূর্গ ও মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ১২৬১ সালে দূর্গটি দখল করার পর খ্রিস্টানরা মসজিদটিকে গীর্জায় পরিণত করে এবং মসজিদের মিনারকে বেল টাওয়ারে রূপান্তরিত করে।

৪. গিরাল্ডা

সেভিলে অবস্থিত এই স্থাপনাটি একটি অতীত মসজিদের স্মৃতিচিহ্ন। এটি মূলত পুরাতন একটি মসজিদের মিনার ছিল। মিনারটি লম্বায় ৩৪১.৫ ফুট (১০৪.১ মিটার) লম্বা। ১২৪৮ সালে মসজিদটিকে গীর্জায় পরিণত করা হয় এবং মিনারটিকে গীর্জার বেল টাওয়ারে রূপান্তরিত করা হয়। ১৩৬৫ সালে সম্পূর্ণ মসজিদটি ভেঙে নতুন করে এখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করা হয়। গিরাল্ডা নামে পরিচিত এই মিনারটিকে বেল টাওয়ার হিসেবে রেখে দেওয়া হয়। বর্তমানেও এটি বেল টাওয়ার হিসেবে অক্ষত রয়েছে।

৫. ক্রিস্টো ডি লা লুজ মসজিদ

৯৯৯ ঈসায়ীতে টলেডোতে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তখন এটি বাব আল-মারদুম মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টীয় শক্তি মুসলমানদের কাছ থেকে টলেডো কেড়ে নেওয়ার পর ১১৮৬ সালে মসজিদটিকে গীর্জায় পরিণত করা হয়।

স্পেন থেকে মুসলিম শক্তির পতনের পর শুধু উপরের মসজিদগুলোই নয়, আরও বহু মসজিদ ও মুসলিম স্থাপত্য গির্জা ও অন্যান্য স্থাপনায় রূপান্তর করা হয়েছে। তবে সে সকল স্থাপনার অধিকাংশই রুপান্তরের পর টিকে থাকেনি, বরং সেগুলো মুসলমানদের প্রতি স্পেনীয় খ্রিস্টান রাজশক্তির আক্রোশের শিকার হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

Muslimmemo.com অবলম্বনে লিখিত

এমএফ/

আরও পড়ুন...
ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের সেই গুহা
বিশ্ব ঐতিহ্যের বিস্ময় ইরানের তাব্রিজ বাজার 
মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য দশ স্থাপনায় ছাদের আকর্ষণীয় নকশা
তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত জাপানের বৃহত্তম মসজিদ
ইথিওপিয়ার অনাড়ম্বর মসজিদে নবীযুগের প্রতিচ্ছবি
তুরস্কের অভিনব জান্নাতী মসজিদ
বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রাণীদের বন্ধু ফিলিস্তিনি ‘আবু হুরাইরা’ (ভিডিও)

 

তাহজিব / মুসলিম ঐতিহ্য : আরও পড়ুন

আরও