ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের সেই গুহা

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের সেই গুহা

পরিবর্তন ডেস্ক ২:৩৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৯

ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের সেই গুহা

জর্ডানে অবস্থিত আসহাবে কাহাফের গুহার বহির্দৃশ্য – ছবি: ইসলামিক ল্যান্ডমার্কস ডটকম

খ্রিস্টীয় ২৫০ সালের দিকে বর্তমান জর্দান অঞ্চল দাকিয়ানুস নামের এক রোমান মূর্তিপূজক শাসকের শাসনাধীন ছিল। অঞ্চলটির সকল জনগণকে সে রোমান দেবতাদের পূজা করতে বাধ্য করেছিল। কেউ তার বিরোধিতা করলে, তাকে সে হত্যা করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার মর্মন্তুদ শাস্তি প্রদান করতো।

বিশেষ করে হযরত ঈসা (আ.) এর শিক্ষার প্রতি অনুরক্ত মানুষদের ক্ষেত্রে তার মনোভাব ছিল চরম হিংসাত্মক। হযরত ঈসা (আ.) এর অনুসারী কাউকে পেলেই সে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতো।

আসহাবে কাহাফের গুহার এপিটাফ – ছবি: ইসলামিক ল্যান্ডমার্কস ডটকম

এর মধ্যেই সেখানে বসবাসকারী অভিজাত রোমান পরিবারের কিছু যুবক হযরত ঈসা (আ.) এর উপর ঈমান আনে। দাকিয়ানুস বিষয়টি জেনে যায়। কিন্তু তারা অভিজাত রোমান হওয়ায় তাদেরকে সরাসরি হত্যা করতে সে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তখন সে তাদেরকে ডেকে তাদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে আদেশ দেয়। তারা তাদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে না চাইলে সে তাদেরকে হত্যা করার ঘোষণা দিয়ে বলে, হয় তাদেরকে তাদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে না হয় তাদেরকে মৃত্যুকে বেছে নিতে হবে।

তাদেরকে সে এবিষয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। তখন নিজেদের ঈমান ও জীবনকে বাঁচাতে এই যুবকরা পালিয়ে এক পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে। একটি কুকুরও তাদের সঙ্গে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে। গুহায় আশ্রয় নেওয়ার পর তারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয় এবং তিন শতাধিক বছর আল্লাহ তাদেরকে ঘুমের মধ্যেই রাখেন।

আরও কাছ থেকে আসহাবে কাহাফের গুহার বহির্দৃশ্য – ছবি: ইসলামিক ল্যান্ডমার্কস ডটকম কুরআনে আল্লাহ তাদের সেসময়কার অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন,

وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ ۚ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ ۖ وَكَلْبُهُم بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ ۚ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِئْتَ مِنْهُمْ رُعْبًا

“তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা ঘুমন্ত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তে।” (সূরা কাহাফ, আয়াত: ১৮) 

পরবর্তীতে তারা ঘুম থেকে উঠে খাবার আনার জন্য গোপনে বাইরে একজনকে পাঠায়। বাইরে আসার পর সে আবিষ্কার করে, তার চারপাশের সকলকিছু পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সে জানতে পারে, আগের মূর্তিপূজক শাসক বহুপূর্বেই মৃত্যু বরণ করেছে এবং বর্তমানে থিওডোসিস নামে খ্রিস্টান একজন শাসক অঞ্চলটি শাসন করছে। লোকেরা তাদের কথা জানতে পেরে তাদের কাছ থেকে দুআ নেওয়ার জন্য দলে দলে আসতে থাকে। পরে তারা মৃত্যুবরণ করলে তাদেরকে এই গুহার মধ্যেই দাফন করা হয়। জর্দানের রাজধানী আম্মানের নিকটে আবু আলান্দা নামক স্থানে এই গুহাটি আজও অবস্থিত। বর্তমানে গুহাটি পরিদর্শনে আসে বহু মানুষ।

আসহাবে কাহাফের গুহার ছাদের দৃশ্য – ছবি: ইসলামিক ল্যান্ডমার্কস ডটকম

বাইবেল ও কুরআন উভয় ধর্মগ্রন্থেই এদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বাইবেলে তাদেরকে ‘এফসুসের ঘুমন্ত ব্যক্তিরা’ (Sleepers of Ephesus) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অপরদিকে কুরআনে তাদেরকে নিয়ে সম্পূর্ণ একটি সূরা অর্থাৎ সূরা কাহাফ অবতীর্ণ করা হয়েছে। 

গুহাটির প্রবেশ পথের বামে একটি প্রাচীন জলপাই গাছ রয়েছে। পূর্বে গুহাটির উপরে একটি গীর্জা ছিল। বর্তমানে এখানে একটি মসজিদ অবস্থিত।

গ্লাসের ভেতর সংরক্ষিত আসহাবে কাহাফের ব্যবহৃত কিছু তৈজসপত্র ও কুকুরটির দেহাবশেষ – ছবি: ইসলামিক ল্যান্ডমার্কস ডটকম

গুহাটির ভিতরে ঘুমন্ত ব্যক্তিদের পাথরে বাধাই করা কবর রয়েছে। এছাড়া তাদের সঙ্গে আশ্রয় নেওয়া কুকুরটির অবশিষ্ট হাড়গুলো গুহাটির এক কোণে সংরক্ষিত আছে। 

গুহাটিতে মোট কয়জন ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছিলেন, এ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায় না।

আসহাবে কাহাফের গুহার আভ্যন্তরীণ দৃশ্য – ছবি: ইন্টারনেট

কুরআনে এসম্পর্কে বলা হয়েছে,

سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ ۖ وَيَقُولُونَ سَبْعَةٌ وَثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ ۚ قُل رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِم مَّا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا قَلِيلٌ ۗ فَلَا تُمَارِ فِيهِمْ إِلَّا مِرَاءً ظَاهِرًا وَلَا تَسْتَفْتِ فِيهِم مِّنْهُمْ أَحَدًا

“তারা বলবে, তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে, তারা পাঁচ জন। তাদের ছষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আরও বলবে, তারা ছিল সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুন, আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভাল জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া আপনি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবেন না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ ও করবেন না।” (সূরা কাহাফ, আয়াত: ২২)

তুরস্কের এফিসাসে অবস্থিত এ গুহাটিকেও আসহাবে কাহাফের গুহা হিসেবে দাবী করা হয় – ছবি: ইন্টারনেট

জর্দানের এই গুহাটি ছাড়াও বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী তুরস্কের এফিসাসে অবস্থিত একটি গুহাকে আসহাবে কাহাফের গুহা হিসেবে দাবি করা হয়। তথাপি জর্দানের এই গুহাটিই আসহাবে কাহাফের গুহা বলে অধিক পরিচিতি লাভ করেছে।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
সূরা কাহাফে বর্ণিত চার ঘটনা, চার শিক্ষা
দাজ্জাল ও সূরা আল-কাহাফে লুকায়িত রহস্য
তায়েফ নগরীর ঐতিহাসিক দুর্গসমূহ
ধ্বংসপ্রাপ্ত অবিশ্বাসীদের জীবন্ত নিদর্শন ‘মাদায়েনে সালেহ’
যে খলিফার স্ত্রীর দানের নিদর্শন দেখে আপ্লুত হন হাজিরা
বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানের ধর্মীয় উত্তরাধিকার

 

তাহজিব / মুসলিম ঐতিহ্য : আরও পড়ুন

আরও