আল-আকসার শেষ প্রহরীর গল্প

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯ | ১২ চৈত্র ১৪২৫

আল-আকসার শেষ প্রহরীর গল্প

ফাতিহ ওসমানলী ৭:১৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৮

আল-আকসার শেষ প্রহরীর গল্প

গল্পটি এমন এক ওসমানী সৈনিকের, যিনি ৫৭ বছর তার দায়িত্ব অব্যাহতভাবে পালন করেছেন। ১৯১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর, জেরুজালেম থেকে ওসমানী বাহিনীর অপসারণের পরও তিনি আল-আকসা মসজিদে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত হননি।

বিখ্যাত তুর্কি ঐতিহাসিক মরহুম ইলহান বারদাকজি ১৯৭২ সালে এই তুর্কি ওসমানী সৈনিকের সাথে আলাপ হওয়ার কথা বর্ণনা করেন। তার ভাষায় তা নিম্নরুপ—
আল-আকসা মসজিদ, ১৯৭২ সালের ২১ মার্চ, শুক্রবার। আমার বন্ধু মরুহম সাংবাদিক সাইদ তেরজিওলু এবং আমি আমাদের গাইডের সাথে বিভিন্ন পবিত্র স্থানসমূহ পরিদর্শন করছিলাম। পবিত্র মসজিদের দ্বিতীয় আঙ্গিনার সিঁড়ির মাথায় আমি তাকে দেখতে পেলাম। তিনি প্রায় দুই মিটার লম্বা। তার জীর্ণ পোশাক দিয়ে তিনি তার জীর্ণ শরীরকে ঢেকে রেখেছিলেন। কিন্তু, মাথা উঁচু করে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি তার চেহারায় লক্ষ্য করলাম এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এটি যেন এক অনুর্বর ভূমি, যাকে কেউ চষে দিয়েছে। তার চেহারায় ছিল অসংখ্য কাটা দাগ।


আমি আমার গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, কে এই লোক? সে তার ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললো, জানি না। হয়তো কোনো পাগল। সে সব সময়ই এখানে দাঁড়িয়ে থাকে, কারও কাছে কোনো কিছুই চায় না। কেন জানি না, আমি হঠাৎ করে তার দিকে অগ্রসর হলাম এবং তুর্কিতে তাকে বললাম, সেলামু আলেইকুম, বাবা (আসসালামু আলাইকুম, বাবা)। তার চোখ খুশিতে বিস্ফোরিত হলো এবং তিনিও তুর্কিতে আমাকে উত্তর দিলেন, আলেইকুম সালাম, ওউল (ওয়াআলাইকুম আসসালাম, পুত্র)।

আমি বিস্মিত হলাম। তার হাত ধরে তাতে চুমু খেলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে আপনি, বাবা? তিনি জবাব দিলেন, আমি করপোরাল হাসান, ২০ ক্রপস, ৩৬ ব্যাটেলিয়ন, ৮ স্কোয়াড্রন মেশিন গান টিম, যাদের আল-আকসায় নিযুক্ত করা হয়েছিল যেদিন আমরা কুদসকে (জেরুজালেমকে) হারাই...

৪০১ বছর, ৩ মাস এবং ৬ দিন জেরুজালেম ওসমানী শাসনের অধীনে ছিল। ১৯১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর, রোববার ওসমানী সেনাবাহিনী জেরুজালেম ছেড়ে চলে যায়। ওসমানী সাম্রাজ্য তখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত এবং মসজিদুল আকসাকে রক্ষার জন্য শুধু এক স্কোয়াড্রন সৈন্যকে এখানে নিয়োগ করা হয়, যাতে করে ব্রিটিশ সৈন্যরা শহর দখলের পূর্বে এখানে কেউ লুটপাট করতে না পারে।

হে প্রভু... আমি আবার তাকালাম; তার মাথা যেন তার চওড়া কাঁধের উপর মিনারাতের মতো, চুমু খাওয়ার যোগ্য পতাকা। আমি আবার তার হাত ধরলাম এবং তিনি বলতে থাকেন— আমার পুত্র, আমি কি তোমার কাছে একটা উপকার চাইতে পারি? আমার এক আমানত আমি বছরের পর বছর বয়ে চলছি, তুমি কি আমার পক্ষ থেকে এই আমানত পৌঁছে দিতে পার?

আমি উত্তর দিলাম, অবশ্যই, কি সেটি? তিনি বললেন, যখন তুমি দেশে ফিরে যাবে, যদি তুমি তোকাত সানযাকে যাও, তবে আমার কমান্ডার ক্যাপ্টেন মুসাকে খুঁজে বের কর। আমার পক্ষ থেকে তার হাতে চুমু দিয়ে বলবে... ইদির প্রদেশ থেকে আগত ১১ নং মেশিনগান টিমের করপোরাল হাসান আপনার নিযুক্ত দায়িত্বে এখনো নিয়োজিত রয়েছে।

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম! বছরখানেক পরে, টেলিভিশনে দেখে তুর্কি সেনাবাহিনীর প্রধান ইলহান বারদাকজিকে ফোন করেন, যাতে করে তিনি তাদের এই মহান সৈনিকের খোঁজ দান করতে পারেন।

বারদাকজি পরবর্তীতে লেখেন, করপোরাল হাসান আমাদেরই একজন ছিলেন। তার ভাগ্য ছিল বিস্মৃত হয়ে যাওয়া। এটিই যথার্থভাবে হয়েছে। আমরা তার অস্তিত্বও ভুলে গিয়েছি, তার সন্ধান নেওয়াতো দূরের কথা। তিনি ছিলেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আকাশের চূড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক সুবিশাল সাইপ্রেস গাছ তিনি এবং আমরা যদিও আমাদের মাথা উঁচু করি, তবে তার সামনে ছোট ঘাসের সমতুল্য হিসেবে প্রতীয়মান হব। আমরা শুধু জানি কি করে ভুলতে হয়। অন্যান্য জিনিসের মতোই আমরা করপোরাল হাসানকে ভুলে গিয়েছি, যিনি আমৃত্যু নিযুক্ত ছিলেন তার দায়িত্বে।

এমএফ/আইএম