হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের প্রকৃত ইতিহাস

ঢাকা, ৯ মে, ২০১৯ | 2 0 1

হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের প্রকৃত ইতিহাস

পরিবর্তন ডেস্ক ৭:২১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৮

হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের প্রকৃত ইতিহাস

রাসুলকন্যা ফাতেমা (রা.) ও ইসলামের চতুর্থ খলীফা আলী (রা.) পুত্র নবী-দৌহিত্র হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন বিজ্ঞ সাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন একধারে ইবাদাতগুজার, দানবীর এবং অত্যন্ত সাহসী বীর। হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে একাধিক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। অন্তর দিয়ে তাদেরকে ভালবাসা ঈমানের অন্যতম আলামত এবং নবী পরিবারের কোনো সদস্যকে ঘৃণা করা ও গালি দেওয়া নেফাকের সুস্পষ্ট লক্ষণ। প্রতিটি মুসলিমের উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র সায়্যেদ হুসাইন ইবন আলী (রা.)-এর কারবালার প্রান্তরে শহীদ হওয়ার ঘটনায় ব্যথিত হওয়া ও সমবেদনা প্রকাশ করা। যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত কেবল তারাই হুসাইন (রা.) বা নবী পরিবারের পবিত্র সদস্যদেরকে ঘৃণা করতে পারে। -আল্লামা ইবনে কাসির

কোনো সন্দেহ নেই যে, কারবালার প্রান্তরে হুসাইন নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বেশ কিছু গ্রন্থ তাকে ফুরাত নদীর পানি পান করা থেকে বিরত রাখার ঘটনা বর্ণনা করে থাকে। আর বলা হয় যে, তিনি পানির পিপাসায় মারা যান। এ ছাড়াও আরও অনেক কথা বলে মানুষকে আবেগে উদ্বেল করে যুগে যুগে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং মূল সত্যটি উপলব্ধি করা হতে তাদেরকে বিরত রাখা হচ্ছে। এ সব কাল্পনিক গল্পের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। ঘটনার যতটুকু সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে আমাদের জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। এ নিবন্ধে ইনশাআল্লাহ, সঠিক ইতিহাসটুকু পাঠকের কাছে তুলে ধরা হবে।

৬০ হিজরী। ইরাকের অধিবাসীদের কাছে সংবাদ পৌঁছল যে, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়ার হাতে বাইআত দেন নি। তারা তাঁকে পত্র মারফত জানিয়ে দিল যে ইরাকবাসী তাঁর হাতে খেলাফতের বাইআত দিতে আগ্রহী। ইয়াযীদকে তারা সমর্থন করে না বলেও সাফ জানিয়ে দিল। তারা আরও বলল যে, ইরাকবাসী ইয়াযীদের পিতা মুআবিয়া (রা.)-এর প্রতিও মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। চিঠির পর চিঠি আসতে লাগল। এভাবে পাঁচ শতাধিক চিঠি হুসাইন (রা.)-এর কাছে এসে জমা হল।

প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার জন্য হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম ইবন আকীলকে পাঠালেন। মুসলিম কুফায় গিয়ে পৌঁছলেন। গিয়ে দেখলেন, আসলেই লোকেরা হুসাইনকে চাচ্ছে। লোকেরা মুসলিমের হাতেই হুসাইন (রা.)-এর পক্ষে বাইআত নেওয়া শুরু করল। হানী ইবন উরওয়ার ঘরে বাইআত সম্পন্ন হল।

সিরিয়াতে ইয়াযীদের নিকট এই খবর পৌঁছা মাত্র বসরার গভর্নর উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য পাঠালেন। ইয়াযীদ উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদকে আদেশ দিলেন যে, সে যেন কুফাবাসীকে তার বিরুদ্ধে হুসাইনের সাথে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ করতে নিষেধ করে। লক্ষণীয় যে ইয়াযীদ এখানে হুসাইন (রা.) কে হত্যা করার আদেশ দেয় নি।

উবাইদুল্লাহ কুফায় গিয়ে পৌঁছল। সে বিষয়টি তদন্ত করতে লাগল এবং মানুষকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। পরিশেষে সে নিশ্চিত হল যে, হানী ইবন উরওয়ার ঘরে হুসাইনের পক্ষে বাইআত নেওয়া হচ্ছে।

অতঃপর মুসলিম ইবন আকীল চার হাজার সমর্থক নিয়ে অগ্রসর হয়ে দ্বিপ্রহরের সময় উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন। এ সময় উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিল। তাতে সে ইয়াযীদের সেনাবাহিনীর ভয় দেখাল। সে এমন ভীতি প্রদর্শন করল যে, লোকেরা ইয়াযীদের ধরপাকড় এবং শাস্তির ভয়ে আস্তে আস্তে পলায়ন করতে শুরু করল। (ইয়াযীদের ভয়ে কুফাবাসীদের পলায়ন ও বিশ্বাস ঘাতকতার লোমহর্ষক ঘটনা জানতে চাইলে পাঠকদের প্রতি ইমাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ কর্তৃক রচিত ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’ বইটি পড়ার অনুরোধ রইল।) যাই হোক,
কুফাবাসীদের চার হাজার লোক পালাতে পালাতে এক পর্যায়ে মুসলিম ইবন আকীলের সাথে মাত্র তিন জন লোক অবশিষ্ট রইল। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মুসলিম ইবন আকীল দেখলেন, হুসাইন প্রেমিক আল্লাহর একজন বান্দাও তার সাথে অবশিষ্ট নেই। এবার তাকে গ্রেপ্তার করা হল। উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তাকে হত্যার আদেশ দিল। মুসলিম ইবন আকীল উবাইদুল্লাহর নিকট আবেদন করলেন, তাকে যেন হুসাইনের নিকট একটি চিঠি পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এতে উবাইদুল্লাহ রাজী হল। চিঠির সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ছিল এ রকম:
“হুসাইন! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফেরত যাও। কুফাবাসীদের ধোঁকায় পড়ো না। কেননা তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে। আমার সাথেও তারা সত্য বলে নি। আমার দেওয়া এই তথ্য মিথ্যা নয়।”

অতঃপর জিলহজ মাসের ৯ তারিখ আরাফা দিবসে উবাইদুল্লাহ মুসলিম ইবনে আকীলকে হত্যার আদেশ দেয়। এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, মুসলিম ইবন আকীল ইতোপূর্বে কুফাবাসীর ওয়াদার উপর ভিত্তি করে হুসাইন (রা.)কে আগমনের জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠির উপর ভিত্তি করে যিলহজ মাসের ৮ তারিখে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। অনেক সাহাবী তাঁকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ ইবন আমর এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফীয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইবনে উমর হুসাইনকে লক্ষ্য করে বলেন: হুসাইন! আমি তোমাকে একটি হাদীছ শুনাবো। জিবরীল আলাইহিস সালাম আগমন করে নবী (সা.)কে দুনিয়া এবং আখিরাত- এ দুটি থেকে যে কোনো একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তিনি দুনিয়া বাদ দিয়ে আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন। আর তুমি তাঁর অংশ। আল্লাহর শপথ! তোমাদের কেউ কখনই দুনিয়ার সম্পদ লাভে সক্ষম হবে না। তোমাদের ভালোর জন্যই আল্লাহ তোমাদেরকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন। হুসাইন (রা.) তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং যাত্রা মুলতবী করতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর ইবনে উমর (রা.) হুসাইন (রা.) এর সাথে আলিঙ্গন করে বিদায় দিলেন এবং ক্রন্দন করলেন।

সুফীয়ান ছাওরী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হুসাইন (রা.) কে বলেছেন, মানুষের দোষারোপের ভয় না থাকলে আমি তোমার ঘাড়ে ধরে বিরত রাখতাম।
বের হওয়ার সময় আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু হুসাইনকে বলেছেন, হোসাইন! কোথায় যাও? এমন লোকদের কাছে, যারা তোমার পিতাকে হত্যা করেছে এবং তোমার ভাইকে আঘাত করেছে?

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, হুসাইন তাঁর জন্য নির্ধারিত ফয়সালার দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর বের হওয়ার সময় আমি যদি উপস্থিত থাকতাম, তাহলে কখনই তাকে যেতে দিতাম না। তবে বল প্রয়োগ করে আমাকে পরাজিত করলে সে কথা ভিন্ন। (ইয়াহ্-ইয়া ইবনে মাঈন সহীস সূত্রে বর্ণনা করেছেন)

যাত্রা পথে হুসাইন (রা.)-এর কাছে মুসলিম ইবনে আকীলের সেই চিঠি এসে পৌঁছল। চিঠির বিষয় অবগত হয়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াযীদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকলেন। পথিমধ্যে ইয়াযীদের সৈন্যরা আমর ইবন সা’দ, শামির ইবন যুল জাওশান এবং হুসাইন ইবন তামীমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে হুসাইন (রা.)-এর গতিরোধ করল। হুসাইন (রা.) সেখানে অবতরণ করে আল্লাহর দোহাই দিয়ে এবং ইসলামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনটি প্রস্তাবের যে কোনো একটি প্রস্তাব মেনে নেওয়ার আহবান জানালেন।

হুসাইন ইবন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং রাসূলের দৌহিত্রকে ইয়াযীদের দরবারে যেতে দেওয়া হোক। তিনি সেখানে গিয়ে ইয়াযীদের হাতে বাইআত গ্রহণ করবেন। কেননা তিনি জানতেন যে, ইয়াযীদ তাঁকে হত্যা করতে চান না। অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেওয়া হোক। অথবা তাঁকে কোনো ইসলামী অঞ্চলের সীমান্তের দিকে চলে যেতে দেওয়া হোক। সেখানে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত বসবাস করবেন এবং রাজ্যের সীমানা পাহারা দেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন। (ইবনে জারীর হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন)
ইয়াযীদের সৈন্যরা কোনো প্রস্তাবই মানতে রাজী হল না। তারা বলল: উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ যেই ফয়সালা দিবেন আমরা তা ব্যতীত অন্য কোনো প্রস্তাব মানতে রাজী নই। এই কথা শুনে উবাইদুল্লাহর এক সেনাপতি (হুর ইবন ইয়াযীদ) বললেন, “এরা তোমাদের কাছে যেই প্রস্তাব পেশ করছে তা কি তোমরা মানবে না? আল্লাহর কসম! তুর্কী এবং দায়লামের লোকেরাও যদি তোমাদের কাছে এই প্রার্থনাটি করত, তাহলে তা ফেরত দেওয়া তোমাদের জন্য বৈধ হত না।”

এরপরও তারা উবাইদুল্লাহর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেই দৃঢ়তা প্রদর্শন করল। সেই সেনাপতি ঘোড়া নিয়ে সেখান থেকে চলে আসলেন এবং হুসাইন (রা.) ও তাঁর সাথীদের দিকে গমন করলেন। হুসাইন (রা.)-এর সাথীগণ ভাবলেন তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসছেন। তিনি কাছে গিয়ে সালাম দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে উবাইদুল্লাহর সৈনিকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের দুইজনকে হত্যা করলেন, নিজেও শহীদ হয়ে গেলেন। (ইবনে জারীর হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন)

সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে হুসাইন (রা.)-এর সাথী ও ইয়াযীদের সৈনিকদের মধ্যে বিরাট ব্যবধান ছিল। হুসাইন (রা.)-এর সামনেই তাঁর সকল সাথী বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। অবশেষে তিনি ছাড়া আর কেউ জীবিত রইলেন না। তিনি ছিলেন সাহসী বীর। কিন্তু বিপুল সংখ্যাধিক্যের মুকাবিলায় তার পক্ষে ময়দানে টিকে থাকা সম্ভব হল না।

কুফাবাসী প্রতিটি সৈনিকের কামনা ছিল সে ছাড়া অন্য কেউ হুসাইন (রা.) কে হত্যা করে ফেলুক। যাতে তার হাত রাসূলের দৌহিত্রের রক্তে রঙ্গিন না হয়। পরিশেষে নিকৃষ্ট এক ব্যক্তি হুসাইন (রা.) কে হত্যার জন্য উদ্যত হয়। তার নাম ছিল শামির ইবনে যুল জাওশান। সে বর্শা দিয়ে হুসাইন (রা.)-এর শরীরে আঘাত করে ধরাশায়ী করে। এরপর ইয়াযীদ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে তিনি শাহাদাত অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন।

বলা হয় এই নিকৃষ্ট শামিরই হুসাইন (রা.)-এর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। কেউ কেউ বলেন, সিনান ইবন আনাস আন্ নাখঈ নামক এক ব্যক্তি তাঁর মাথা দেহ থেকে আলাদা করে। এর বেশি আল্লাহই ভাল জানেন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
আশুরায় কী পালন করবেন?
মুহাররম মাস : ফযিলত, আমল ও বিদআত
সুন্নাহর আলোকে মুহাররম মাসের আমল
হাদিসে বর্ণিত আশুরার ইতিহাস

 

তাহজিব / মুসলিম ঐতিহ্য : আরও পড়ুন

আরও