যে খলিফার স্ত্রীর দানের নিদর্শন দেখে আপ্লুত হন হাজিরা

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৫ পৌষ ১৪২৫

যে খলিফার স্ত্রীর দানের নিদর্শন দেখে আপ্লুত হন হাজিরা

ইমরান রাইহান ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮

যে খলিফার স্ত্রীর দানের নিদর্শন দেখে আপ্লুত হন হাজিরা

খলিফার প্রাসাদে আজই প্রথম। লোকটির ভয় করছে। তিনি হেঁটে এসেছেন দজলার পাড় দিয়ে। নদীতে ভাসছিল প্রমোদতরী ও ব্যবসায়ীদের নৌকা। ব্যবসায়ীদের নৌকাগুলো যাবে বসরা। অনেক আগে সে একবার বসরা গিয়েছিল। খেজুর বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নহরের দৃশ্য এখনো মনে গেঁথে আছে।

প্রাসাদে ঢুকতে কোনো সমস্যা হলো না। স্বয়ং রানী তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। চাকররা তাকে একটি সাদা মহলে নিয়ে এলেন। ‘বসুন এখানে, একটু পর রানী পাশের কামরায় আসবেন’ এই বলে চাকর চলে গেলেন।

লোকটি বসে আছেন। বাতাসে একটা অচেনা ফুলের সুবাস ভাসছে। মহলের ভেতর থেকে কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ কানে আসছে। একটু পর ওপাশের পর্দাটা মৃদু নড়ে ওঠে। লোকটি মৃদুস্বরে সালাম দেন।

‘কেমন আছেন, ওপাশ থেকে মিষ্টি কণ্ঠের জিজ্ঞাসা। ‘ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন? লোকটি সমীহের সুরে বলেন। পর্দার ওপাশে আবু জাফর মানসুরের আদরের নাতনি, আব্বাসী সাম্রাজ্যের রানী।

‘ভালো। আপনার খবর বলুন।’

‘কাজ এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে ওয়াদি নোমান থেকে আরাফাত ময়দান পর্যন্ত নহর (সুপেয় পানির জন্য কৃত্রিম খাল) খনন করা হয়েছে। এখন আরেকটি শাখা হুনাইন থেকে মক্কা পর্যন্ত খনন করা হবে। সমস্যা হলো এই এলাকায় কয়েকটি পাহাড় আছে। পাহাড় কেটেই নহরের কাজ করতে হবে। এতে প্রচুর খরচ হবে’ লোকটি বলে চলেন।

‘আপনি কাজ করতে থাকুন। খরচ যা হয় আমি পাঠিয়ে দিব। যদি শ্রমিকদের হাঁতুড়ির প্রতিটি আঘাতের জন্য এক দিনার খরচ হয় তবুও পরোয়া করবেন না। কাজ চালিয়ে যাবেন’, রানীর কণ্ঠে দৃঢ়তা।

‘আপনি ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছেন না। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ দিনার খরচ হয়ে গেছে’ মরিয়া লোকটি বলে ফেললেন।

‘শুনুন, আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না। আপনি কাজ চালিয়ে যান। আজ থেকে সব হিসাব বন্ধ। আমি এই হিসাব ত্যাগ করলাম, হিসাবের দিনের জন্য। হিসাবের দিন আমি আল্লাহকে এই হিসাব দিব’, রানী বললেন।

এই কথার পর আর কথা চলে না। লোকটি বিদায় নিলেন। এই ছিল নহরে যুবাইদা খননের সময়কার গল্প।

হারুনুর রশিদ, আরব্য রজনীর রহস্যময় বাদশাহ, উজির জাফর বারমাকিকে নিয়ে যিনি রাতে ঘুরে বেড়ান বাগদাদ, তার স্ত্রী যুবাইদার আদেশে ও অর্থায়নে হাজিদের জন্য এই নহর খনন করা হয়। এই নহর খননের ফলে হাজিদের পানির কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়। নহর খননে মোট ব্যয় হয় ১৭ লাখ দিনার।

যুবাইদার আসল নাম আমাতুল আজিজ। বেড়ে উঠেছিলেন দাদা আবু জাফর মানসুরের প্রাসাদে। দাদা আদর করে তাকে ডাকতেন যুবাইদা নামে। পরে এই নামেই তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন।

১৬৫ হিজরিতে হারুনুর রশীদের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। কসরুল খুলদ প্রাসাদে তাদের এই বিবাহ অনুষ্ঠান হয়। তার গর্ভে খলিফা আমিনের জন্ম। বলা হয়, তিনিই একমাত্র আব্বাসী নারী যার গর্ভে কোনো খলিফা জন্ম নিয়েছেন।

যুবাইদা ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও ইবাদতগুজার নারী। তার প্রাসাদে তিনি ১০০ হাফেজাকে রেখেছিলেন। এদের কাজ ছিল শুধু কুরআন তিলাওয়াত করা। একজনের পর একজন তিলাওয়াত করতে থাকতেন। ২৪ ঘণ্টাই তার প্রাসাদে তিলাওয়াতের শব্দ শোনা যেত। তিনি প্রচুর দান করতেন।

খতিব বাগদাদী লিখেছেন, একবার হজের সফরে, মাত্র ৬০ দিনে যুবাইদা গরীব দুস্থ ও হাজিদের মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ দিনার দান করেন।

যুবাইদা মক্কায় ৫টি হাউজ ও অনেক অযুখানা নির্মাণ করেন। খলিফা তার এই স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসতেন।

যুবাইদা ইন্তেকাল করেন ২১৬ হিজরিতে। তিনি আশা করেছিলেন, হিসাবের দিনে তিনি আল্লাহর কাছে হিসাব দিবেন। আমরা আশা করি, তার নিয়তের কারণে হিসাব সহজ হবে, ইনশাআল্লাহ।

তথ্যসূত্র: ওফায়াতুল আইয়ান (২য় খণ্ড)- আল্লামা ইবনে খাল্লিকান; আল ইকদুস সামিন ফি তারিখিল বালাদিল আমিন (১ম খণ্ড)- মুহাম্মদ বিন আহমদ আল হাসানি; তারিখে বাগদাদ (১৬শ’ খণ্ড)- খতিব বাগদাদী।

আইআর/আইএম