ইতিহাসে রাসুল (সা.) নির্মিত প্রথম মসজিদ

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

ইতিহাসে রাসুল (সা.) নির্মিত প্রথম মসজিদ

-জামিল আহমদ   ৬:৫৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮

ইতিহাসে রাসুল (সা.) নির্মিত প্রথম মসজিদ

ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহর সর্বাধিক পছন্দনীয় স্থান হলো মসজিদ। ছোট-বড় নির্বিশেষে সব মসজিদের ফযিলত সমপর্যায়ের হলেও চারটি মসজিদের ফযিলত অন্য সব মসজিদ থেকে অনেক বেশি। তন্মধ্যে বায়তুল্লাহ শরিফের মর্যাদা ও মাকাম সবার ওপরে। এরপর মসজিদে নববী, তৃতীয় নম্বরে বায়তুল মুকাদ্দাস। চতুর্থ নম্বরে মসজিদে কুবা।

প্রথমোক্ত তিনটি মসজিদের ফযিলত ও মাহাত্ম্য সর্বজনবিদিত হলেও চতুর্থটির ব্যাপারে অনেকেরই জানাশোনার পরিধি অপ্রতুল, সীমিত। তাই এই মসজিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ফযিলতের কথা তুলে ধরা হলো।

মসজিদে কুবার অবস্থান :

মদিনা শরিফের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত। মসজিদে নববী থেকে এর দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার।

নামকরণের কারণ :

রাসূল সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের অভিমুখে সর্ব প্রথম যে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, তার নাম কুবা মসজিদ। এখানে তিনিই সর্ব প্রথম নামায আদায় করেন। ‘কুবা’ মূলত একটি কূপের নাম। পরবর্তী সময়ে কূপটিকে কেন্দ্র করে যে বসতি গড়ে উঠেছে, তাকেও কুবা বলা হতো। এই যুগসূত্রে মসজিদটির নামকরণ হয় ‘মসজিদে কুবা’ বলে।

রাসুল সা. মদিনা শরিফে হিজরতের প্রথম দিন কুবায় অবস্থানকালে এর ভিত্তি স্থাপন করেন। আর এ হিজরতের মধ্য দিয়ে মদিনা শহরকে কেন্দ্র করে ইসলাম ও কোরআনের বাণী বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। স্বয়ং রাসুল সা. এ মসজিদের নির্মাণকাজে সাহাবাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। এ সময়ের মধ্যে মসজিদে কুবার ভিত্তি স্থাপন করেন এবং এতে নামাজ আদায় করেন। নবুওয়ত প্রাপ্তির পর এটাই প্রথম মসজিদ, যার ভিত্তি তাকওয়ার ওপর স্থাপিত হয়। অতঃপর জুমার দিন মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেন।

মসজিদে কুবায় নামাজ আদায়ের ফজিলত :

মসজিদে কুবায় নামাজের ফজিলতের কথা অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন- হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অশ্বারোহণ করে কিংবা হেঁটে মসজিদে কুবায় আগমন করতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। অন্য এক হাদিসে রয়েছে, প্রতি শনিবারে রাসুল সা. কুবায় আগমন করতেন। (বুখারি-মুসলিম)

আরেক হাদিসে বর্ণিত আছে, মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করার সওয়াব একটি ওমরাহর সমপরিমাণ। (তিরমিজি)

রাসুল সা. আরো ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের ঘরে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করে (সুন্নাত মোতাবেক অজু করে) মসজিদে কুবায় আগমন করে নামাজ আদায় করে তাকে একটি ওমরাহর সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। (ইবনে মাজাহ)

তাই তো রাসুল সা. এর যুগ থেকেই প্রতি শনিবার মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করার জন্য গমন করা মদিনাবাসীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানেও তাদের এই আমল অব্যাহত রয়েছে।

তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান রা: প্রথম এর সংস্কার করেন। খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ মসজিদটির প্রথম মিনার তৈরী করেন।

৪৩৫ হিজরীতে আবু ইয়ালি আল-হোসায়নি কুবা মসজিদ সংস্কার করেন। তিনি মসজিদের মিহরাব তৈরী করেন। ৫৫৫ হিজরীতে কামাল আল-দীন আল ইসফাহানি মসজিদে আরো বেশ কিছু সংযোজন করেন। পরবর্তী সময়ে ৬৭১, ৭৩৩, ৮৪০ ও ৮৮১ হিজরীতে উসমানী সাম্রাজ্যকালে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। উসমানী শাসনামলে ১২৪৫ হিজরীতে সর্বশেষ পরিবর্তন সাধন করেন সুলতান আবদুল মজিদ।

আধুনিককালে সৌদি শাসনামলে হজ্ব মন্ত্রণালয় মসজিদটির দায়িত্ব গ্রহণ করে-যা মূল ডিজাইনে অধিকতর সংস্কার ও সংযোজন করে। বর্তমান কুবা মসজিদ ইসলামী ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিকতম সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি অনন্য স্থাপত্য। মসজিদটি সম্প্রসারণ করে ২০ হাজার মুসল্লী ধারণের উপযোগী করা হয়েছে।

১৯৮৪ সালে মরহুম বাদশাহ ফাহদ বিন আবদুল আজিজ কুবা মসজিদের ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ কার্যের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। দুই বছর পর সম্প্রসারণ কার্য সমাপ্ত হলে তিনি মসজিদটি উদ্বোধন করেন। মসজিদটিতে একটি অভ্যন্তরীণ প্রাঙ্গনসহ কয়েকটি প্রবেশ দ্বার রয়েছে। মসজিদের উত্তর দিক মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। বর্তমানে মসজিদে ৪টি মিনার ও ৫৬টি গম্বুজ রয়েছে। ১১২ বর্গমিটার এলাকাব্যাপী ইমাম ও মোয়াজ্জিনের থাকার জায়গা, একটি লাইব্রেরী, প্রহরীদের থাকার জায়গা এবং সাড়ে ৪শ’ বর্গমিটার স্থানে ১২ টি দোকানে একটি বাণিজ্যিক এলাকা।

মসজিদে ৭টি মূল প্রবেশ দ্বার ও ১২ টি সম্পূরক প্রবেশ পথ রয়েছে। প্রতিটি ১০ লাখ ৮০ হাজার থার্মাল ইউনিট বিশিষ্ট তিনটি কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মসজিদকে ঠান্ডা রাখছে। ঐতিহাসিক কুবা মসজিদ শ্বেতবর্ণের একটি অনন্য স্থাপত্যকর্ম, যা বহু দূর থেকে দৃষ্টিগোচর হয়।

এফএস/