স্পেনের বিস্মৃত মরিস্কো মুসলিমদের উচ্ছেদের ইতিহাস

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

স্পেনের বিস্মৃত মরিস্কো মুসলিমদের উচ্ছেদের ইতিহাস

ফয়জুল্লাহ সাইফ ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৮

স্পেনের বিস্মৃত মরিস্কো মুসলিমদের উচ্ছেদের ইতিহাস

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদময় বেদনার্ত ঘটনাগুলোর অন্যতম একটি ছিল আল-আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনের পতন। শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলিম শাসনাধীন আইবেরীয় ভূখণ্ডের জনগণের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। স্পেনে মুসলিম সভ্যতার সর্বোচ্চ উন্নতির যুগে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষাধিক মুসলমান এই ভূখণ্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বসবাস করতেন। বিশ্বাস ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে এই ভূখণ্ডের মুসলমানরা গড়ে তুলেছিলেন একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নত সমাজ ও ইসলামী সভ্যতা।

খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে আল-আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোভা ছিল আধুনিক নাগরিক সুবিধাসম্বলিত একটি শহর। ছিল শান বাঁধানো পথঘাট, উন্নত হাসপাতাল ও রাতে শহরের রাস্তাজুড়ে পথচারীদের চলার জন্য ছিল আলোর ব্যবস্থা। এ সময়, খ্রিস্টান ইউরোপের সর্ববৃহৎ লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০০, সেখানে কর্ডোভার নকলনবিশরা তখন প্রতিবছরই গড়ে ৬০০০ করে নতুন বই প্রস্তুত ও প্রকাশ করতেন। মুসলিম স্পেনের সমাজ ছিল ইউরোপীয় ও আফ্রিকান সংস্কৃতির সংমিশ্রণ, যেখানে মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা পারস্পারিক সম্প্রতির সাথেই বসবাস করতো।

কিন্তু এই সম্প্রীতিময় সমাজ শেষ পর্যন্ত আর টিকতে পারেনি বেশি দিন। একাদশ হতে পঞ্চদশ শতকের মধ্যে মুসলিম শাসকদের আদর্শচ্যুৎ হয়ে বিলাস সর্বস্ব দুর্বল শাসন পরিচালনার সুযোগে তথাকথিত পুনঃবিজয়ের নামে উত্তর স্পেনের ক্যাথলিক রাজ্যগুলোর ক্রমাগত আগ্রাসনে মুসলমানরা স্পেনে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে আইবেরীয় উপদ্বীপের শেষ মুসলিম রাজ্য গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে স্পেনের মুসলমানরা মুখোমুখি হয় এক সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির।

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে গ্রানাডা পতনের পর, স্পেনে বসবাসকারী মুসলমানরা একে সংক্ষিপ্তকালীন এক দুর্যোগ হিসেবে চিন্তা করেছিল। তারা চিন্তা করেছিল, শিগগিরই আফ্রিকা ও অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র হতে সাহায্য আসবে এবং স্পেনে আবার নতুন করে মুসলিম শাসনের সূচনা হবে। কিন্তু নতুন স্পেনীয় শাসক, রাজা ফার্দিনান্দ ও রাণী ইসাবেলার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের মার্চে স্পেনের রাজন্যবর্গ স্পেন হতে সকল ইহুদিদের বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। হাজার হাজার ইহুদিদের স্পেন থেকে বের করে দেওয়া হয়। এদের অনেকেই ওসমানীয়া সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে।

মুসলমানদের প্রতি স্পেনীয়দের নীতিও খুব একটা ভিন্ন ছিল না। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে, সমগ্র স্পেনে সর্বমোট মুসলমান ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। ক্যাথলিক গীর্জার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এই মুসলমানদের খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করার।

প্রাথমিকভাবে মুসলমানদের লোভ দেখিয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন উপহার, অর্থ সাহায্য ও ভূমি প্রদানের মাধ্যমে স্পেনীয় মুসলমানদের খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণে প্রলুব্ধ করা হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। যারাও এই প্রক্রিয়ায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তা ছিল কেবলই কৌশলগত। পরবর্তীতে তারা সকলেই পুনরায় ইসলামের প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়।

স্পেনীয় রাজন্যবর্গের কাছে যখন পরিষ্কার হয়ে গেল, স্পেনের মুসলমানরা সম্পদের চেয়ে তাদের বিশ্বাসের সাথে অধিক সম্পৃক্ত, তখন তারা ভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় ক্যাথলিক গীর্জা কার্ডিনাল ফ্রান্সিসকো জিমিনিজ দ্যা সিসেরনসকে দক্ষিণ স্পেনে পাঠায় ধর্মান্তর প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে। কোনো মুসলমান যতক্ষণ পর্যন্ত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতো না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে হয়রানি করাই ছিল এই কার্ডিনালের কাজ। আরবিতে লেখা অসংখ্য বই তার নির্দেশে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

কোনো মুসলিম খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জেলে পাঠানো হত। জেলখানায় তার ওপর চালানো হত চরম নির্যাতন এবং তার সমুদয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হত। সিসেরনসের নীতি ছিল, ‘যদি কোনো ধর্মদ্রোহী(!) স্বেচ্ছায় ধর্মের পথে চলতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে জোর করে ধর্মের দিকে টেনে নিয়ে এসো।’

সিসেরনসের স্বৈরাচারী ও হয়রানিমূলক আচরণ স্পেনীয় শাসকদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। স্পেনীয় মুসলমানরা এই অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। তারা গ্রানাডায় পুনরায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালায়। শিগগিরই স্পেনের রাজন্যবর্গ এই বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হয়। তারা বিদ্রোহীদের সামনে দুটি সুযোগ প্রদান করে, হয় ধর্মান্তর না হয় মৃত্যু। দমন-পীড়নের ফলে গ্রানাডার অনেকেই বাহ্যিকভাবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে, কিন্তু মনে মনে তারা মুসলমানই রয়ে যায়। আবার অনেকে শেষপর্যন্ত বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

গ্রানাডার বাহিরে গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পরে। বিদ্রোহীরা দক্ষিণ স্পেনের আলপুজারাসের পাহাড়ী অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। বিদ্রোহীরা কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই শুধু তাদের বিশ্বাসকে সম্বল করেই খ্রিস্টীয় শাসনের প্রতিরোধ ও উৎখাতের লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছিল।

বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম বসতিতে খ্রিস্টান সৈন্যদের হানা দেওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। খ্রিস্টান সৈন্যদের মত মুসলিম বিদ্রোহীরা অস্ত্র ও প্রশিক্ষণে সমৃদ্ধ ছিল না। ফলে এ সকল হামলা প্রতিরোধে তারা প্রায়ই কুলিয়ে উঠতে পারতেন না। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া ও গণহত্যার ঘটনা হয়ে গিয়েছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

১৫০২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের বিদ্রোহ অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসে। স্পেনের রাজন্যবর্গ এ সময় আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪৯১ এর ‘গ্রানাডা চুক্তি’ অনুযায়ী মুসলমানদের প্রতি অনুসৃত সহনশীল আচরণের অবসানের কথা ঘোষণা করে। এর ফলে মুসলমানদের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকল; হয় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ, না হয় স্পেন ত্যাগ অথবা মৃত্যু। অনেক মুসলমানই উত্তর আফ্রিকায় হিজরত করেন। আবার অনেকেই মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। আর অনেকেই অন্তরে তাদের বিশ্বাসকে গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।

১৫০২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে বসবাসকারী মুসলমানদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। স্পেনীয় রাজন্যবর্গের হাতে নির্যাতিত এমনকি খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনা এড়াতে তাদেরকে সব সময় তাদের বিশ্বাস ও কাজকর্মের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হত। স্পেনীয় শাসকদের হয়রানির হাত হতে বাঁচতে তারা অনেকেই বাহ্যিকভাবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতো। এই ধর্মান্তরিত ‍মুসলমানদের স্পেনীয়রা ‘মরিস্কো’ বলে সম্বোধন করতো। স্পেনীয় প্রশাসন তাদেরকে সব সময় কড়া নজরদারির মধ্যে রাখতো।

স্পেন খ্রিস্টীয় প্রশাসন মরিস্কো মুসলিমদের ওপর বিভিন্ন নিপীড়নমূলক আইন জারি করেছিল যাতে তারা গোপনেও ইসলামী বিশ্বাসের লালন করতে না পারে। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার সকালে তাদের ঘরের দরজা খোলা রাখতে হত যাতে সৈনিকরা দেখতে পারে, তারা গোসল করছে কি না। এ ছাড়া কোনো মুসলমানকে ওজু করতে বা কুরআন তেলওয়াত করা অবস্থায় দেখতে পেলে তাকে সাথে সাথে হত্যা করা হত। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও স্পেনের মরিস্কো মুসলমানরা গোপনে তাদের ধর্ম পালন করতে থাকে।

মরিস্কো মুসলমানরা তাদের বিশ্বাস গোপনের সর্বাত্মক চেষ্টা করা সত্ত্বেও খ্রিস্টান রাজন্যবর্গ সব সময় তাদের সন্দেহের চোখে দেখতো। স্পেনীয় মুসলমানদের আত্মগোপনের একশত বছরের পর, ১৬০৯ ঈসায়ীতে স্পেনীয় রাজা ফিলিপ সকল মরিস্কোকে স্পেন হতে বিতাড়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাদেরকে মাত্র তিন দিনের সময় দেওয়া হয় স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার।

স্পেন হতে বহিষ্কারের যাত্রা পথে মরিস্কোরা স্পেনীয় খ্রিস্টানদের দ্বারা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হয়। তাদের সম্পদ লুট করে নেওয়া হয় এবং তাদের শিশুদের ‘যিশুর সন্তান’ বলে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি, খেলার ছলে খ্রিস্টান সৈনিক ও উচ্ছৃংখল জনতা অনেক মরিস্কোকে হত্যাও করে। জাহাজের নাবিকরাও তাদের হয়রানি করতে ছাড়েনি। তাদের জন্মভূমি থেকে বহিষ্কারের জন্য জাহাজ ভাড়াও তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। জাহাজেও তাদের ওপর আরেক দফা লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। স্পেনীয় মরিস্কো মুসলমানদের ওপর এই আচরণ স্পষ্টতই আধুনিকালের সন্ত্রাস ও গণহত্যার নামান্তর।

এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য আনন্দের বিষয় ছিল, বহু বছর পর তারা প্রকাশ্যেই তাদের বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিল। মুসলমানদের বিদায়ের প্রাক্কালে স্পেনের পাহাড় ও সমভূমি পুনরায় আজানের ধ্বনি শুনতে সক্ষম হয়। স্পেন হতে বিদায়ের পথে বহু বছর পর স্পেনীয় এই হতভাগ্য মুসলমানরা প্রকাশ্যেই নামাজ আদায় করেন।

অনেক মরিস্কোই স্পেনে স্থায়ী হতে চেয়েছিল। শত শত বছর যাবত এটি ছিল তাদের আবাসস্থল এবং তাদের জন্মও ছিল এই ভূমিতে। অন্য কোনো দেশে থাকার কথা তারা ভাবতেও পারছিল না। অনেকেই পরবর্তীতে নির্বাসন হতে গোপনে স্পেনে ফেরত এসেছিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।
১৬১৪ ঈসায়ীর মধ্যে স্পেনের সর্বশেষ মরিস্কোকে বিতাড়িত করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে ইসলামের নিশানা মুছে দেওয়া হয়। একশত বছরের ব্যবধানে স্পেনের মুসলিম জনসংখ্যা পাঁচ লাখ হতে একদম শূন্যে নেমে যাওয়ার ঘটনাকে একমাত্র গণহত্যার সাথেই তুলনা করা যায়।

পর্তুগীজ পাদ্রী দেমিয়ান ফনসেকা এই বিতাড়নের ঘটনাকে agreeable Holocaust বা ‘ঐক্যমতের গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন। এর ফলে, এত বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তির হ্রাসের কারণে স্পেনের অর্থনীতি তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্পেনের রাজস্বের হ্রাস ঘটে।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসকরা এই মরিস্কো শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু তা ছিল চাহিদার তুলনায় খুবই অল্প। বর্তমানে, উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে স্পেন হতে নির্বাসিত মরিস্কোদের বংশধরদের খুঁজে পাওয়া যায়। তারা গর্বের সাথেই তাদের মরিস্কো পরিচয় প্রদান করে। আইবেরীয় উপদ্বীপের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ইউরোপের অন্যতম জঘন্য গণহত্যার প্রতীক হয়ে প্রধানত উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে তারা বর্তমানে বসবাস করছে।

এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এখনও পৃথিবীর কথিত সভ্যদের দ্বারা বরং আরও নির্মমভাবে অব্যাহত রয়েছে। মুসলিম মানবতা আজও পৃথিবীতে চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত। মহান আল্লাহ মুসলমানদের মধ্য থেকে এক জাগ্রত গোষ্ঠীকে উঠে আসার তাওফিক দান করুন, যারা মানবতার পুনরুদ্ধার করবে।
সূত্রঃ “Spain’s Forgotten Muslims – The Expulsion of the Moriscos”

এফএস/আরপি