আত্মহননকারী পলো উৎসব

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

আত্মহননকারী পলো উৎসব

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

আত্মহননকারী পলো উৎসব

হাওরে এক সাথে পলো বাওয়া মৎস্য আইনে নিষিদ্ধ। যা হাওড়ের পরিবেশ, প্রতিবেশ মৎস্য ও প্রানী সম্পদ এবং দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবারের জন্য একটি অশনি সংকেত। কিন্ত এ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সমাজের একটি সংঘবদ্ধ চক্র শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে পলো উৎসবের নামে বিলের মাছ শিকারে তৎপর হয়ে উঠছে।

আর এসব পলোবাওয়া উৎসবকে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য বলে ওই স্বার্থন্বেষীমহলটি শহর ও গ্রাম গঞ্জে মাইকযোগে প্রচার-প্রচারণা ও ঢোল পিটিয়ে মাছ ধরার আহ্বান জানিয়ে উৎসাহ যোগাচ্ছে। তাদের এহেন কর্মকাণ্ডে হাইল হাওরের দেশিয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংসের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

গত ২৩ জানুয়ারি হাইল হাওরের হালকাটা বিলে সকাল থেকে দিনব্যাপী পলো উৎসবে নামে একটি মহল। এতে হাওরের মাছ ধরে সাধারণ মানুষের লোভ লালসা বেড়ে যায়। কিন্তু হাইল হাওরে উন্মুক্ত জলাশয় না থাকায় এক সময় সংরক্ষিত এলাকায় বা ইজারাকৃত বিলে মাছ ধরতেও তারা পিছ পা হবে না। এতে করে বিল ইজারাদার ও পলো বাহিনীদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি ওই চক্রটি আবারো হাইল হাওরের বাইক্কাবিলের সংযোগ বেয়াইবিলের খাড়ায় উপজেলার লামুয়া, সিরাজ নগর, রাজাপুর, কাকিয়াবাজার, নোয়াগাঁও এলাকার পলো দিয়ে মাছ ধরতে যায়। সেখানে ক্রেল প্রজেক্টের বড় গাঙিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা (বাইক্কাবিল) স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সংগঠনের লোকদেও বাঁধার মুখে পড়ে।

ওই সংগঠনটির সেক্রেটারী মিন্নত আলী বলেন, ১০০/১৫০ জন মানুষ সংযোগ বিল বেয়াইবিলের খাড়ায় সকালে পলো, কুচা ইত্যাদি দিয়ে মাছ ধরতে নামে। প্রথমে আমরা বাধা দেই। এর পরেও তারা বাধা না মেনে মাছ ধরতে নেমে পড়ে। এ বিলে প্রচুর পানি ও কচুরিপানায় ভরপুর ছিল। আমরা মৎস্য কর্মকর্তা, ইউএনও এবং পুলিশকে জানাই। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে বিলে মাছ ধরতে নিষেধ করেন।

শ্রীমঙ্গল হাইল হাওরে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জীব বৈচিত্র্য এবং মাছের উৎপাদন ও প্রজাতির বৃদ্ধিকল্পে কর্মরত বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, হাইল জলাভূমির একটা নিজস্ব পরিবেশ ও প্রতিবেশ আছে যা একসাথে পলো বাওয়ার মাধ্যমে তছনছ হয়ে যায়। মাছের ব্যাপক মড়ক রোগ দেখা দেয়। একসাথে পলো বাওয়ার মাধ্যমে মাছসহ আরো অসংখ্য উদ্ভিদ ও জলজ প্রানীর আবাসস্থল নষ্ট হয়।

একই সঙ্গে অসংখ্য মানুষজন নিয়ে একসাথে পলো বাওয়ার ফলে ঘোলা পানিতে অসংখ্য ছোট মাছ মরে যায় যা বড় মাছ ও কিছু পাখির খাবার ছিল। এই ছোট মরা মাছের পচন থেকে বড় মাছগুলোর পচন শুরু হয়। মা মাছ গুলো মরে যায়। পানির গুণাগুনও বিনষ্ট হয়। ফলে মাছের বসবাসের ও প্রজননের ক্ষেত্র নষ্ঠ হয়ে উঠে।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা কেউ কি একবার হিসাব করেছি পলো উৎসবের নামে হাওরে কতগুলো জলজ উদ্ভিদ নষ্ট হয়েছে যারা হয়তো আর কোনোদিন মাথা তুলতে পারবে না?

এটা কি কেউ লক্ষ্য করেছেন যে- পলো উৎসবের নামে কতগুলো দরিদ্র জেলে পরিবারের ক্ষতি করেছেন যারা হয়তো এই এলাকায় দিনের পর দিন মাছ ধরে সংসার চালাতো?

যারা এ কাজটি করছেন তাদের সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে যে কাজটিই করেন আগে চিন্তা করে করেন যাতে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও মানুষের জীবন জীবিকার কোনো ক্ষতি না হয়। দয়া করে কোনো হুজুগে যোগ না দিয়ে চিন্তাভাবনা করে কাজ করুন বলেও জানান তিনি।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, গত শনিবারে বেয়াই বিলের খাড়ায় বিভিন্ন এলাকার ১০০ থেকে ১৫০ লোক হাতে পলো ও অন্যান্য মাছ ধরার জিনিসপত্র নিয়ে হামলে পড়ে। স্থানীয়ভাবে এ সংবাদ পেয়ে দ্রুত আমি ও ইউএনও স্যার ও পুলিশ নিয়ে সেখানে যাই এবং মাছ ধরার জন্য নিষেধ করে তাদেরকে বিদায় দেই।

তিনি আরো বলেন, হাইল হাওরে মাইকিং করে পলো বাওয়া মৎস্য আইনের পরীপন্থী। এ আইনে যে কারো ১ থেকে ২ বছরের জেল জরিমানা হতে পারে।

মাইকিং করে হাইল হাওরে পলো বাওয়া প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলাম বলেন, গ্রামবাংলার আবহমান ঐতিহ্যর নামে মাছের প্রজনন বিনষ্ঠ করা হবে এটি মৎস্য আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। শনিবারেও হাইল হাওরে ১০০/১৫০ জন লোককে বেয়াই বিল থেকে তুলে দিয়েছি।

তিনি জানান, মাইকিং ও ঢোল পিটিয়ে পলোবাওয়া উৎসবের নামে যারা এসব কর্মকাণ্ডে উৎসাহ প্রদান করছে তাদের সম্পর্কে প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থা ইতিমধ্যে খোঁজ খবর নিচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব কর্মকাণ্ডে যারাই জড়িত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি জেল জরিমানা প্রদান করা হতে পারে।

এমআইএ/এসএফ