স্বাধীনতা এমনই

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

স্বাধীনতা এমনই

মনদীপ ঘরাই ১:১৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০১৯

স্বাধীনতা এমনই

ছোট একটা খাচায় দুটো পাখি এনেছে জিসান। পুষবে। ওদেরকে নাকি লাভ বার্ড বলে। বাংলা করলে দাঁড়ায় ভালোবাসার পাখি। হিমি শোনার সাথে সাথেই বললো,

“ভাইয়া আমাকে দে না!”

“এক চড় দেব। যা এখান থেকে। পড়তে বস গিয়ে।”

কি যেন বিড়বিড় করতে করতে বের হয়ে যায় হিমি।

জিসান ছোট বোনটাকে আদর যেমন করে, শাসনেও রাখে খুব। বাবা মারা যাওয়ার পর হিমির অলিখিত অভিভাবক তো সে ই।

পাখি দুটোর জন্য প্যাকেট ভরা খাবারও কিনেছে জিসান। ছোট্ট একটা বাটি দিয়েছে খাঁচার সাথে। ওটাতে করে দানা দানা খাবারগুলো দেয় যত্নে।

ভেবেছিল পাখিগুলো ভদ্র মানুষের মতো টুকটুক করে খাবার খাবে। চোখ উল্টে গেল ব্যাটারি সাইজের দুই পাখির কান্ডে। ঠোঁকরের পর ঠোঁকরে চারিদিকে ছড়িয়ে ফেলছে খাবার। হিমি এসে বলে,

“রাগ করো কেন ভাইয়া, ওরা এভাবেই খায়। আমি দেখেছি টিভিতে”

জিসান গর্জে ওঠে, “পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন টিভি টিভি করিস না হিম। মার খাবি কিন্তু”

হিমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে মেজাজ গরম করে ঠিকই, তবে ভাইয়াকে ওর দারুন ভয়। কিছু বলতে পারে না।

জিসান ওদিকে চেষ্টা করছে খাবার না ছড়ানোর ট্রেনিং দিতে। সেই সাথে যোগ হয়েছে বিষ্ঠা পরিস্কারের যন্ত্রণা।পাখি কি আর কথা শোনে? শেষমেষ রেগেমেগে জিসান বলে ওঠে,

“এর চেয়ে কুকুর পোষা ভালো ছিল”

বাসা থেকে বের হয়ে রিক্সা পাওয়া যায় না। মোড় পর্যন্ত হাঁটতে হয়। দুপুরের কড়া রোদে হেঁটে মেজাজটাও চড়ে গেল খানিকটা।

রিক্সা একটা পেল। ভাবসাবে কিছুটা বেয়াদব। ভাড়া নিয়ে দর কষাকষি শেষে উঠলো জিসান। ব্যাংকে যাওয়ার গন্তব্যটা শুরুতেই বলে উঠেছে সে। কিন্তু রিক্সাওয়ালা আসলে কিছুটা না।মহা বেয়াদব। নিজের ইচ্ছেমতো পথে নিয়ে যাচ্ছে। এক কড়া ধমক দিলো ব্যাটাকে।

রিক্সাওয়ালাও রিক্সা থামিয়ে বলে,

“আপনারে লইয়া যামু না। আমারে মাফ করেন।”

কোন কথা না বলে ধাম করে একটা চড় কষিয়ে দিল জিসান। বললো,

“ তুই যাবি, তোর বাপে যাবে।”

রিক্সাওয়ালা কথা বাড়ানোর সাহস পায় না।অনিচ্ছা নিয়েই চালিয়ে যায়।

অফিসে জিসানের জনপ্রিয়তা শূণ্যের কোটায়। সবার সাথে আচরণটা তেমন একটা ভালো করে না। এই তো সেদিন দুই পিয়ন দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কি যেন আলাপ করছিল, জিসান সেই আলাপের সবটুকু জোর করে শুনেই ছাড়লো। চলে আসার সময় বললো,” আমি জানি তোমরা আমাকে পছন্দ করো না; ভালো বসের এটাই বড় গুণ”

জিসান বিয়ে করেছে দেড় বছর। বাবা হবে আর মাস দুয়েক পরেই। নিজের পরিবারেও একই রূপে জিসান। ক্ষমতা, কর্তৃত্ব আর ছড়ি ঘোরানোর অভ্যাসটা এখানেও একই রকম। নিজের সন্তানের নাম ঠিক করার ক্ষেত্রেও বউয়ের কোন কথা শোনে নি। অনাগত ছেলের নাম রাখতে চেয়েছে শৃঙ্খল।

পাড়ার সবাই যে জিসানকে খুব একটা পছন্দ করে, তা না। তবে, এ পাড়ায় জিসানই একমাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাই স্বাধীনতা দিবসে প্রত্যেক বারই বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাক পড়ে তার। এবারও পড়েছে ডাক। এবারের আলোচনার বিষয় “ স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের ভূমিকা”

কেমন যেন অন্যবারের মতো সাবলীলভাবে কিছু বলতে পারলো না জিসান। সত্যিই কি সে কিছু করেছে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য? উত্তর খুঁজে না পেয়ে এলোমেলো কিছু কথা বলে দ্রুত নেমে আসে মঞ্চ থেকে।

“আমাকে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কিছু করতেই হবে।”

ফেরার পথে  আনমনে বলে ওঠে জিসান।

বাসায় ফিরে খুঁজে পায় না কি করতে হবে! তার মতো ক্ষুদ্র মানুষ স্বাধীনতার মতো বিশাল সমুদ্র রক্ষায় কি ই বা করবে? জবাব খুঁজে পায় না। খুঁজবেই বা কার কাছে। রাত গভীর। কেন জানি পাখি দুটো খুব ডাকছে। এমন তো ডাকে না কখনও!

আজ সকালটা অন্যরকম। এই গল্পের জন্য খুবই জরুরী সকাল। লাভ বার্ডের জোড়া ভেঙ্গেছে আজ। একটা পাখি  নিথর হয়ে পড়ে আছে খাঁচার মধ্যে। জিসানের এলোমেলো লাগে। এতদিন ভালোবাসার পাখিকে খাঁচায় বন্দী করে রেখেছিল। কাল রাতে কি স্বাধীন হতে চাইছিল ওরা? জিসান বেঁচে থাকা পাখিটাকে মুক্ত করে দিল। যেতে চাইছে না ও। পরাধীনতার অভ্যাস পেয়ে বসলো নাকি ওকে? খানিক পরে উড়ে যায়। এই তো স্বাধীনতা রক্ষার শুরু। তবে, ভালোবাসার একটা পাখির মৃত্যু দিয়ে। স্বাধীনতা;  অর্জন করা যায় ঠিকই, কখনও কখনও কেড়ে নেয় প্রাণ। জিসানের মনে পরে যায়, ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছিলাম আমরা। স্বাধীনতা এমনই।

পাখিটা উড়িয়েই চোখ পড়ে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা হিমির দিকে। কাঁদছে অঝরে। পাখি হারানোর শোক ঘিরে ধরেছে ওকে।

হিমির মাথার ওপর হাত রাখে জিসান। কেঁপে ওঠে হিমি। এটা ভাইয়া তো নাকি অন্য কেউ!

“শোন হিম, আজ থেকে তোকে আর জোর করে পড়তে বলবো না। নিজে যখন বুঝবি পড়তে হবে, তখনই পড়িস”

স্বাধীনতা রক্ষা করছে জিসান। মন ভরে বিলিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা বোনের  চোখে ভাইয়ের ওপর প্রাণখোলা আস্থা। স্বাধীনতা এমনই।

মোড় পর্যন্ত হেঁটে এসে রিক্সায় ওঠে জিসান। সেই রিক্সাওয়ালাটা। আজ আগেভাগেই সে জিসানকে জিজ্ঞেস করে, “ স্যার,কোন রাস্তা দিয়া যামু কইয়া দেন। আইজ আর মাইরেন না”

লজ্জ্বায় ফর্সা জিসানের মুখটা লাল হয়ে ওঠে। মাথাটা নিচু করে বলে, “ মারবো কেন? তোমার যে দিক দিয়ে ইচ্ছে যাও”

সেদিনের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে চলছে রিক্সা। যেন উড়ছে আকাশে। এই তো স্বাধীনতা। অবাধ ওড়ার আকাশ গড়ার যুদ্ধ। স্বাধীনতা এমনই।

অফিসে পৌঁছে কারও দিকে আর নজর দেয় না জিসান। আজ নিজেকেও সব সংকীর্ণতার পরাধীনতা থেকে মুক্ত করবে সে। সবটুকু। স্বাধীনতা এমনই।

বাসায় ফিরে মনটা অনেক অনেক হালকা লাগে জিসানের। বউকে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করে, আমাদের ছেলের নামটা তোমার পছন্দ তো? বউ ভয়ে ভয়ে বলে, “সত্যি বলবো?”

জিসান অবাক হয়। এতটাই দূরে ঠেলেছিল সে সবাইকে? চোখটা মুছে বলে, “ বলো, একেবারে সত্যি বলো তো”

- একদম পছন্দ হয় নি। স্বাধীন দেশে আমার ছেলের নাম কেন শৃঙ্খল হবে? ওর পায়ে কি তুমি জন্ম থেকে শেকল পড়াতে চাও? আমি চাই আমাদের ছেলে হবে স্বাধীনতার প্রতীক।

জিসান আস্তে করে বলে, “তবে ওর নামটা তুমিই রাখো না!”

জিসানের বউ আকাশের দিকে চেয়ে বলে,

“আমার ছেলের নাম রাখবো মুজিব”

স্বাধীনতা এমনই।

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার