ফ্যান

ঢাকা, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ | 2 0 1

ফ্যান

মনদীপ ঘরাই ১:১৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০১৯

ফ্যান

সিলিং ফ্যানটাকে সবসময়ই ভয় পায় মিথিল। সবসময় মনে হয় এই যেন খুলে পড়বে! হলের কোন ফ্যানটা কচ কচ করে শব্দ করে না? সবকটাই করে, কিন্তু ওর নিজের রুমের ফ্যানটাকেই খালি ভয়।

কে যেন এসে আমাকে বলেছিল, ‘নতুন ফ্যান কিনতে পারে না ও?’
আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘তাহলে যে গল্পই লেখা হবে না!’

নতুন ফ্যান তো পরের কথা, এ ফ্যানটাও মিথিল কেনে নি। আগের ব্যাচের পরাগ ভাই হল ছাড়ার সময় দিয়ে গেছে। ফ্যানের পাখাগুলোতে হিজিবিজি কি যেন লেখা। মার্কার দিয়ে। কে লিখেছে কে জানে! মিথিল জানতেও চায় নি কখনো। শুধু ফ্রি তে একটা ফ্যান পেয়েই খুশি ছিল। সেদিন রাতের আগ পর্যন্ত ...

রাত তিনটা। ফ্যানের কচকচ শব্দটা বেড়ে গিয়ে মিথিলের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়। শুধু শব্দই হচ্ছে। বাতাস তো নেই! ঘেমে নেয়ে উঠেছে মিথিল। কোত্থেকে যেন আলো এসে পড়েছে পাখা গুলোয়। থেমে থাকা পাখাগুলোর হিজিবিজি লেখা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঘুরতে থাকা অবস্থায়। লাল স্পষ্ট অক্ষরে লেখা:

‘আয়’
সে রাতের কিছু আর মনে পরে না মিথিলের। সেদিন থেকে ভয়টা জেঁকে বসেছে পুরোপুরি। কারণ, হাজার চেষ্টা করেও আর লেখাটা দেখতে পায় নি মিথিল। তবে কি ভ্রম? ফ্যান কেন তাকে ডাকতে যাবে?

দিনের সাথে ভয় যখন কমে গেছে একেবারে, তখন আবারও। রাত তিনটা। সেই শব্দ, সেই ঘাম, সেই আলো। লেখাটা ভিন্ন। লাল অক্ষরটা তেমনি আছে। এবার লেখা, ‘আসবি না?’

অজ্ঞান হবার আগে এটুকু মনে আছে মিথিলের: ফ্যানের গা থেকে ছিটে এসেছিল ... এক ফোঁটা রক্ত।

এ নির্ঘাত মনের রোগ। ১২০০ টাকা ভিজিট দিয়ে মনের ডাক্তার দেখায়। ১০০০ টাকা খরচ করে ওষুধও খায়। কিন্তু, বদল করে না ফ্যান। কারণ, তার পকেটে টাকা নেই!

বন্ধুদের অনেকে রুম বদল করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু সিঙ্গেল রুম ছাড়ার মতো পাগল কি সে?

ভয়, দ্বিধা আর ওষুধ খেয়ে থাকতে থাকে মিথিল। ইদানিং যত পারে এড়িয়ে চলে ফ্যানটাকে। তাকায় না। অদ্ভুত ব্যাপার, সে না তাকালে ফ্যানের শব্দটা বেড়ে যায়। আবার তাকালেই সব ঠিক।

এখন আর রাতে না। ভর দুপুরেও ভয় হয় মিথিলের। মনে হয়, ফ্যানটা ঘুরছে আর তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে তাকে। গিলে খাবার মতো দৃষ্টি।

ও বাজারে গেলে ফ্যানের শোরুম, ফ্যানের বিজ্ঞাপনে নজর আটকায়। ভয় ধরায়।

সপ্তাহখানেক পর। রাত তিনটা। ভয়টা কমে এসেছে আগের চেয়ে। এখন আর মিথিল অজ্ঞান-টজ্ঞান হয় না। মিথিল আজ স্পষ্ট দেখকে পেল লাল অক্ষরের নতুন লেখা:

‘তাহলে আমিই আসছি’

মিথিল তার ভেতরের কাঁপুনিটা টের পায়। নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। সকালের অপেক্ষা। ফ্যানের ক্যাচ ক্যাচ শব্দ দূর থেকে ভেসে এসে যেন আঘাত হানছে কানে। রাত গভীর হচ্ছে। দম আটকে আসছে মিথিলের। ফ্যানটাকে খুব কাছে অনুভব করে। একেবারে নাকের ডগায়। একটু আগে বলেছিলাম এখন আর অজ্ঞান হয় না মিথিল। ভুল বলেছিলাম।

ভয়টা ক’দিন এমন বেড়ে গেল যে রাতে আর ঘুমাতেই পারে না মিথিল। চোখের নিচে কালি জমার বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়ছে সবার কাছে। শেষমেষ এক রাতে বিছানায় শোয়ার আগে সে সিদ্ধান্ত নিল, কালই বদল করে ফেলবে ফ্যান। খরচ হলে হোক, নতুন ফ্যান কিনে এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হতে চায়।

নতুন ফ্যান কেনার চিন্তাতেই হোক আর অন্য কারণেই হোক, আজ রাতে ঘুমিয়ে পড়লো সাথে সাথে। সিলিং ফ্যান শব্দ করে আর মিথিলের ঘুম ভাঙ্গালো না। মাথা বরবার থাকা সিলিং ফ্যানটা নিঃশব্দে খুলে পড়লো মিথিলের মাথা বরাবর। বুঝতে পারার আগেই মাথাটা থেতলে জীবন হারালো মিথিল। জীবনের শেষ মুহূর্তটায় কি ভাবনা ছিল মিথিলের? ভাবার সময় কি আদৌ পেয়েছিল?

পরদিন সকালে প্রথম সুইপারের নজরে আসে ব্যাপারটা। চিৎকার করে সে সবাইকে ডাকতে থাকে,
‘জলদি আসো। ৩০৯ এ আবার মানুষ মরছে’

‘আবার’ শব্দটা আমারও কানে লাগে! মিথিলের লাশ বের করতে করতেই ওই সুইপার বলে,

‘আগের তিনজনরে তো ফ্যান থেইক্কা নামানো লাগসিলো। গলায় দড়ির কেস। আর আজকের মামার তো কপালই খারাপ। ফ্যানই নাইম্যা আইসে।’

মিথিল চলে যাবার পর সম্পদের অপচয় করে নি হলের হর্তাকর্তারা। আবার আগের যায়গায় ফিরেছে ফ্যানটি।

বছরখানেক পর। নতুন একটা ছেলে উঠেছে রুমে। রুমে আগে থেকেই ফ্যান লাগানো দেখে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, ‘যাক্। এর আগের ভাইরা কাজের মতো কাজ করেছে। কজন এরকম রেডিমেড ফ্যান পায়!’

মানিব্যাগ থেকে ফ্যান কেনার জন্য আলাদা করে রাখা টাকাটা পকেট খরচার মধ্যে মিলিয়ে দেয়। ফ্যানটা শব্দ করে ঘুরে উঠলো। নতুন ছেলেটা একটু অবাকই হলো। সে তো সুইচ অনই করে নি!

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

এএসটি/

 

গল্প: আরও পড়ুন

আরও