পুড়ে ছাই

ঢাকা, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ | 2 0 1

পুড়ে ছাই

মনদীপ ঘরাই ১:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯

পুড়ে ছাই

নৌকায় উঠতে চিরজীবনই ভয় পেয়ে এসেছে শঙ্খ। এখন প্রতিদিনের কাজে যাওয়ার বাহন ওই নৌকাই। এলাকায় বলে খেয়া পারাপার। শুরুতে শুরুতে ভয়ে জমে থাকতো শঙ্খ। এখন অনেকটা জড়তা কেটেছে। এ অঞ্চলের নৌকাগুলো বেশ বড় আর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চ্যাপ্টা। রোজ বেশ কিছু ভ্যান, মোটর সাইকেল পার হতে দেখে সে। কিন্তু গতকাল যা দেখলো তা নিজের চোখে বিশ্বাস করা কঠিন। একটা মাইক্রোবাস পার হচ্ছে নৌকায়! খোদ মাঝি পর্যন্ত হাতে পায়ে ধরাধরি করছিল। শেষমেষ ৫০০ টাকা বেশি পেয়ে মেনে নিল।

বরপক্ষের গাড়ী। এ পাড়ে রেখে গেলে মান ইজ্জ্বত কি আর কিছু বাকি থাকবে? তার চেয়ে মাইক্রোবাস পানিতে ডুবে যাওয়াও ভালো।

মাইক্রোবাস ডোবে না। তবে ওপারে ওঠার সময় নাটকের পর নাটক হয়। পাক্কা একঘন্টা ধরে চেষ্টার পর মাইক্রো পারে ওঠে।

শঙ্খ পুরোটা দেখে তারপর রওনা দেবে কাজে। সবার কাজ শেষ হয় বিকেলে। তারটা শুরু হয় ওই সময় থেকে। একটা ক্লিনিকে নার্সের কাজ করে সে। বিকেলের শিফট টা সামলাতে হয় তাকেই।

নার্সের সাদা পোশাক আলাদা করে পড়তে হয় না শঙ্খের। সে বিধবা। স্বামী হারিয়েছে আজ পাঁচ বছর।  নিয়ম কানুন মেনে যে সাদা শাড়ী পড়ে তা ঠিক না। জীবনে আর নতুন করে রং মিশতে দিতে চায় না ।

আজ বিয়ের মাইক্রোটা দেখে তার বিয়ের কথা মনে পড়ে যায়। আহা। এভাবেই তো বর এসেছিল। মাইক্রো নিয়ে!

“ভাড়া দেন সিস্টার”

চিন্তার জগত থেকে বের হয়ে পার্স ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে ব্যস্ত হয় শঙ্খ।

তাকিয়ে দেখে বাকি সবাই নেমে গেছে। শুধু একটা সবজি ভর্তি ভ্যান উঠানোর জন্য কসরত হচ্ছে। সে পাশ কাটিয়ে নেমে যায়। বরযাত্রীর মাইক্রোটা ধুলো উড়িয়ে চলে যাচ্ছে। দূরে। চোখে দেখার সীমার বাইরে।

ভ্যানে উঠে আবার চিন্তায় ডুব দেয় সে।  তার বিয়ের দিনে গেট ধরা নিয়ে সে কি কান্ড। তার বোনেরা আর পাড়ার সবাই মিলে বরকে তো ছাড়বেই না। দু হাজার টাকা দিতেই হবে…

ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এসে জমে শঙ্খের। সুখের সময়গুলো এভাবেই ফুরিয়ে যায়, তাই না?

যেদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তার স্বামী শেষ কটা শ্বাস গুনছিল, সেদিন কতটা অসহায় ছিল শঙ্খ? সেবিকা হিসেবে সবাইকে সুস্থ্য করতে করতে নিজের বেলায় এসে কেন জানি মিলছিল না কোন হিসেব। বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল প্রবাল।

কারণটা আজও অজানা। বিয়ের পাঁচদিনের মাথায় কেন একটা শান্তশিষ্ট মানুষ এ পথ বেছে নেবে?

তার চেয়ে বড় অবাক করা ব্যপার, পাঁচদিনের বিবাহিত জীবনকে আঁকড়ে ধরে শঙ্খই বা কেন মুছে ফেলেছে জীবনের সব রং?

মোবাইল বেজে ওঠে। ক্লিনিক থেকে ফোন দিচ্ছে।শঙ্খ মনে মনে বলে,  ধুর! এখন কে ধরবে? ৱ

দুবার-তিনবার-চারবার।বাজতেই থাকে ফোনটা।

শেষবারের বার ফোন ধরতেই শোনে ক্লিনার নরেশের ফোন,

“সিস্টার , তাড়াতাড়ি আসেন। সর্বনাশ হয়ে গেছে। বিষ খাওয়া কেস”

মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে শঙ্খের। ফিরে যায় পাঁচ বছর আগের সেই দিনে। ভ্যানওয়ালাকে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,

“তাড়াতাড়ি টানো তো”

ক্লিনিকের কাছে এসে একটা বড়সড় ধাক্কাই খায় শঙ্খ। বরযাত্রীদের সেই মাইক্রোটা দাঁড়ানো। অনেক ভীড়।

বিষ খেয়েছে বর। পৌঁছানোর কিছু পরে। বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে উদ্ধার করেছে সবাই। ঠোঁটের পাশ থেকে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে।

আজ আর হারতে চায় না শঙ্খ। ফিরে এসেছে প্রবাল। ভিন্ন কোন শরীরে। ওকে বাঁচাতেই হবে।

ওয়াশ করার প্রস্তুতি নিতে নিতেই বাইরে হইচই শুনতে পায়-

“একবার ছেলেটা বেঁচে উঠুক না। তোর চৌদ্দগুষ্টির নামে হত্যাচেষ্টার মামলা করবো। আমার সোনার ছেলেটাকে বিষ তোরা খাইয়েছিস।“

মানুষটা আলাদা হলেও হুমকি-ধামকিটা শঙ্খের খুব চেনা মনে হয়। তার শ্বশুর বাড়ির সবাই একই দোষ দিয়েছিল প্রবাল চলে যাওয়ার পরে। থানা-পুলিশও কম হয় নি। ছেলেটার নাম জানে না শঙ্খ।

কাঁধটা ধরে আলতো ঝাঁকিয়ে বললো, ওঠো প্রবাল। তোমাকে এবার বাঁচতেই হবে।

ছেলেটা প্রায় অচেতন অবস্থাতেই বলে ওঠে, “আমাকে বাঁচান। মিলিকে চাই আমি। মিলিকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।“

তবে কি শ্বশুরবাড়ীর লোকজনই….

ওসব চিন্তা ভুলে ডাক্তারের সাথে ওয়াশে মনযোগ দেয় শঙ্খ। শঙ্কামুক্ত হয়েছে  আজকের প্রবাল। নামটা শোনা হয় নি ছেলেটার। ওটি থেকে বের হয়ে ছেলেটার নামের কথা ভুলে শঙ্খ অন্য প্রশ্ন করে বসে ছেলেটার ভাইকে…

“আচ্ছা, কনের নাম কি মিলি?”

ছেলেটার ভাই অবাক হয়ে বলে,

“না তো সিস্টার। হবু বৌদির নাম তো দীপালি। ডাকনাম দীপা। কেন বলুন তো!!”

“ না। কিছু না। এই প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধগুলো নিয়ে আসুন তো, যান”

শঙ্খ ওটির লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকে। নড়বার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। এতদিন সে কষ্টে শুধু পুড়েছে। আজ সে পুড়ে পুরোপুরি ছাই।

লেখক: সিনিয়র সহকারি সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

গল্প: আরও পড়ুন

আরও