পাতা ফাঁদে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

পাতা ফাঁদে

মনদীপ ঘরাই ৩:১৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০১৯

পাতা ফাঁদে

রমিজের ভুলই হয়েছে মাওলাকে এই মেসে আনা। ভেবেছিল দুজনের রুমে তিনজন থাকলে ভাড়াটা একটু সাশ্রয় হবে। বাড়িওয়ালা তো আর জানছে না। রমিজের রুমমেট তারেক আরও এক ডিগ্রী উপরে। রমিজকে বললো,

“সাশ্রয় হবে মানে! পুরোটাই সাশ্রয়। আমরা দুজন মিলে দেই ৩০০০ টাকা। ওকে বলে দে এখানে উঠতে হলে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। সাথে সার্ভিস চার্জ ৪০০ টাকা। তাহলে বুয়ার খরচটাও চুকে যাবে”

শুরুতে শুরুতে রাজি হতে চায় নি রমিজ। কিন্তু গত সপ্তাহে লিজা তার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হয়। সম্ভাব্য খরচের কথা চিন্তা করে রমিজও রাজি হয়ে যায় নতুন রুমমেট আনার প্রস্তাবে।

এবার শুরু হয় হিসেব-নিকেষ। তারেকের সাথে মিলে হিসেব করতে থাকে। তাহলে ১৭০০ টাকা নিরেট লাভ। বিশাল কিছু। ছাত্রজীবনে বিরাট কিছু।

এবার অন্যচিন্তা মাথায় খেলে। তিনজন থাকতে পারলে ৪ জন কেন পারবো না। কথায় তো আছেই, যদি হয় সুজন তেতুল পাতায় ন’জন। রুম তো সেই বিচারে তেতুল পাতার তুলনায় পাহাড়ের সমান বড়। আর থাকবে তো ‘মোটে’ চারজন! যেই কথা সেই কাজ। মাওলা তো আছেই হিসাবে। এবার লাগবে আরও একজন। দেয়া হল গলিতে গলিতে বিজ্ঞাপন। সেই সাথে রুমের জিনিষপত্র কোনটা ফেলে কোথায় একটু যায়গা বের করা যায় সেই প্রতিযোগিতা। এ ফেলনা জিনিষের তালিকায় সবার আগে পুরোনো পেপার, ছেড়া মোজা, ভাঙ্গা ব্যাগ, পুরোনো কেডস, জং ধরা তালা তাদের উপস্থিতি জানান দিলো। জিনিষপত্র সব বিদেয় হলো, কিন্তু জায়গা সাশ্রয় হলো না একটুও। কারণ, এদের সবাই প্রায় দুটি খাটের নিচে ছিল। তাহলে উপায় কি? নজর পড়লো পড়ার টেবিলের দিকে। ১ ঘন্টার মাথায় দুটো পড়ার টেবিল বেচে দিয়ে একটা তোষক পাতার জায়গা বের করে ফেললো রমিজ-তারেক জুটি।

বারুদের মতো কাজ হয়েছে বিজ্ঞাপনটা দেয়ায়। সকাল থেকে কমপক্ষে ১০ টা ফোন এসেছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, একটা মেয়েও ফোন করেছিল। মাথায় আসে না রমিজের।

আলাপ-আলোচনা হচ্ছে চতুর্থ কে হতে পারে। এর মধ্যে খবর পেয়ে মাওলা এসে উঠে পড়লো রমিজদের মেসে। এখন তাদের ৩ জনের সুখী পরিবার।

আহা রে! শুরুর দিনে যদি রমিজ বুঝতো , কি বিপদ ঘাড়ে করে এনেছে সে গ্রাম থেকে। মাওলা পারিবারিক ভাবে রমিজের চেনা। ছোটবেলায় দেখেছিল একবার। সে সময় বয়স বোঝে নি। এখন তো দেখছে বয়স কম করে তার চেয়ে ৩-৪ বছর বেশি হবেই।

মাওলা ঢাকায় এসেছে গাড়ির গ্যারেজে কি নাকি এক চাকরি পেয়েছে সে সুবাদে। গাড়ীর গ্যারেজে তো আর এক্সিকিউটিভের পদ নেই! হবে কোনো মেকানিক-টেকানিকের চাকরি।

শরীর-স্বাস্থ্য, গড়নে মাওলা এককথায় বিশাল। গায়ের রংটাও বেশ। মবিল মাখলেও টের পাওয়া যাবে না। রমিজের মনটা শুরু থেকেই একটু খারাপ। এ বান্দা শতভাগ খাবারে টান ফেলবে। তারেক বলে ওঠে, “তোর কথা জানি মিথ্যে হয়”

না। রমিজের কথাকে সত্য প্রমান করতে থাকে মাওলা শুরুর দিন থেকেই। শুরুর সকালে তার ভাগের তিনটা পরোটাই খায় সে। এ ব্যাপারে সে খুব সতর্ক। তবে সাবাড় করে দিল প্রায় সব সবজি। তারেক একটু দেরি করে উঠে শেষমেষ পানিতে ভিজিয়ে পরোটা খেয়েছে।

দুপুরে আবার মাওলার আইন ভিন্ন। সবজি খেয়েছে সীমিত। মাছও একটাই খেয়েছে। তবে বাকিদের মাছ চামচের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে বেশ ভরেছে প্লেট। আর বাকিদের সব ঝোল, সব আলুও নিজের প্লেটে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলো না। সেই সাথে ভাত খেল একাই তিনজনের। রাতেও ঠিক তাই। রমিজ তো ঝোল ছাড়া মাছ ভাত দিয়ে খেতে খেতে দু:খের ঠ্যালায় বলেই বসলো, “মরুভূমির মতো শুকনো লাগছে”

তবে মাওলার মুখের ওপর কথা বলতে পারছে না কেঊ। যে সুঠাম দেহ! কখন না জানি মেরে বসে।

তবে মাওলার প্রশংসা করতেই হয়। নিজের ব্রাশটা সে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে। বাদবাকি সাবান,পেস্ট, চিরুনি এগুলো রমিজ-তারেক জুটির ওপর ভর করেই চলছে।

রমিজের মরে যেতে মন চাইছে। কি ভাবলো আর কি হলো! তবে এ তো কেবল শুরু।

হঠাৎ একদিন মাওলা বলে,

“আচ্ছা,আমার তোষকের জায়গাটুকু তো আমার তাই না?

রমিজ অনিচ্ছা সত্বেও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। মনে মনে ভাবে, চতুর্থ জন আনার কত প্ল্যান ছিল তাদের। আহা রে।

শুনেই চোখ চকচক করে ওঠে মাওলার। বলে, তাহলে আমার দুজন কলিগ আছে মেকানিক। ওদের এনে আমার বেডেই রাখবো। একজন রাতে ডিউটি করে। একজন দিনে। তোমাদের আর কিছুই করতে হবে না। শুধু ভোর চারটায় দরজাটা খুলে দিতে হবে।

রমিজ স্তব্ধ হয়ে যায়। এ কেমন প্রস্তাব? মৃদু স্বরে বলে,

“ভাই, এই প্ল্যানটা বাদ দেন না”

-ক্যান্। বাদ দিতে হবে ক্যান? তোমার খাটে তো আর থাকবে না।

তেতুল পাতা থিওরির কাছাকাছি চলছে জীবন। মুরগির খোপের মতো ঘরে পাঁচজন।

একরাতে পুলিশ এসে তল্লাশী চালিয়ে মাওলার পিরিতের কলিগের একজনকে ধরে নিয়ে যায়। সে নাকি কার মোবাইল ছিনতাই করেছিল। সে চলে যাওয়ার পর আবিষ্কার হয়, রুমের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু “হারিয়েছে”

এই পয়েন্টে বাকিজনকেও বিদায় করা যেত। কিন্তু দুপুরের মধ্যে কোত্থেকে যেন রিপ্লেসমেন্ট খুঁজে নিয়ে আসলো। এ ছেলে কোন ব্যান্ডে নাকি গিটার বাজায়। সারাদিন শুধু গিটারের সাউন্ড শুনলে কেমন লাগে তা বলে বোঝানো অসম্ভব। অন্তর থেকে সঙ্গীত ভক্ত হলেও পাগল হবার যোগাড় হবে।

টয়লেটের মতো নোংরা ইস্যু সামনে আনতে মন চাইছিলো না। কিন্তু না বলে উপায় কি? ভোর পাঁচটা থেকে লাইন ধরার অভ্যাস করলো রমিজ-তারেক।তারপরেও কখনও কখনও হেরে যেত গিটারিস্টের সাথে।

আর সম্ভব না।মাওলা কে বিদায় না করলে হচ্ছেই না। মাসখানেক পর রমিজ যেয়ে মওলাকে বললো,

“ভাই, আর এভাবে সম্ভব না। এভাবে একসাথে থাকা যাবে না”

শুনেই মওলা বললো, “আমারও তাই মত। তোমরা বাসা খোঁজো”

-মানে? এই রুম আমাদের। আমরা আগে থেকে ছিলাম।

“কি শিশুর মতো আলাপ করো? আগে থেকে ছিলাম! এটা কি বাসের টিকেট নাকি যে আগে আসলে আগে পাবেন। আমাকে রাগিও না ব্রাদার। থাকলে থাকো না থাকলে চলে যাও। আর চাচাকে আমার ফোন করে বলতে হবে তোমার নতুন প্রেম প্রেম খেলার কথা”

শেষের লাইনটা শুনে বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠলো রমিজের । মন চাইলো চিৎকার চেচামেচি করতে, কিন্তু কিছু না বলে উঠে চলে গেল।

তারেক আর রমিজ মিলে গলিতে গলিতে খুঁজতে লাগলো টুলেটের বিজ্ঞাপন। কোনোটাই সাধ-সাধ্যের সাথে মিলছে না। সন্ধ্যার সময় ওদের মেসের গলির দেয়ালের হোটেলের সামনে নতুন একটা বিজ্ঞাপন দেখে মনে ধরলো তারেকের। সাথে সাথেই ফোন দিল:

-হ্যালো, সিট ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম।

-জ্বি সিট ভাড়া

আপনারা কয়জন?

-আমরা স্টুডেন্ট। ২ জন।

-খুব ভালো ভাই। সিট ভাড়া ৩ হাজার করে। বুয়া ৫০০।

-ভাই একটু কম হবে না।

-সম্ভব না ভাই। ওঠলে ওঠেন না হলে অন্য জায়গা দেখেন।

শেষের কথাগুলো পরিচিত মনে হয় তারেকের। উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

-ভাই আপনার নামটা?

-আমার নাম গোলাম মাওলা….. 

লেখক: সিনিয়র সহকারি সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার