আকাশে...

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

আকাশে...

মনদীপ ঘরাই ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৮

আকাশে...

জীবনের প্রথম আকাশ ভ্রমন। প্লেনে আগে কোনোদিনই ওঠা হয় নি জামালের। সামর্থের কারণেই হয়তো। জ্যাকফ্রুট বিস্কিটের প্যাকেটের সাথে থাকা স্ক্র্যাচকার্ড ঘষে কপালের ধুলো সরিয়েছে। মিলেছে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের একটি ওয়ান ওয়ে টিকেট।

তার মতো মুদি দোকানদারের জন্য এ এক বড় পাওয়া।

গত এক সপ্তাহ সারা গ্রামে টিকেটটা দেখিয়ে বেড়িয়েছে সে। এই গ্রামে সে প্লেনে চড়বে ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে। ইস্। কলিমের পোলাডা কামলা খাটতে মালয়েশিয়া না গেলে....

গেছে যাক তো। সে তো আর কামলা খাটতে যাচ্ছে না, সে যাচ্ছে কপালের জোরে।

এ কথাটাতেও আর কেউ না জানুক, লেখক হিসেবে আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে। বললাম,

“জামাল, এটা কি ঠিক হলো? অন্যের প্রাপ্য জিনিষ...”

জামাল কুৎসিত এক হাসি হেসে বলে, “ধুর মিয়াভাই, কি যে কন। অন্যের হবে ক্যান? দোকান আমার সব ইসক্যাচকাড ও আমার। আমার কাস্টমার ভোদাইরা জানে নাকি কেমনে কাড ঘঁষতে হয়? তা ওরা পেলেনে ওটপে কি? তবে, অবিচার করি নাই। পেত্যেকরে এট্টা কইরা চকলেট ফ্রি দিসি বিস্কুটের লগে”

আমি এর মধ্যে কোনো সুবিচার খুঁজে পাই না। ওখান থেকে উঠে এসে বাসায় লিখতে বসি।

এর মতো বজ্জাতের গল্প আমায় লিখতে হবে।

গত সপ্তাহে বিস্কুটের ডিলার এসে টিকেটটা দিয়ে গেছে। তারপর থেকে প্লেনে চড়ার আগেই আকাশে উড়ছে জামাল।

এলাকায় এতদিন তাকে “মুদিচোরা” নামেই চিনতো সবাই। ওজনে কম- টম দেয়ার বিশেষ সুনাম তো আছেই। শোনা যায়, বাসায় চাল ডাল নেয়ার সময়ও ১ কেজির জায়গায় ৯০০ গ্রাম নিতো। এ এক অবাক করা অভ্যাস।

যাই হোক, টিকেট তো ওয়ান ওয়ে। ঢাকা থেকে ফিরবে কিভাবে? লঞ্চে ফেরার সিদ্ধান্তটাই ভালো। “ডেক” এ শত শত মানুষকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে তো পারবে প্লেনে চড়েছে সে।

পরশু ফ্লাইট। এর মধ্যে প্লেনে চড়া উপলক্ষ্যে একটা রং চটা জিন্স আর লাল শার্ট কিনেছে জামাল। ইসটাইলের একটা ব্যাপার আছে না!

গ্রামের কিছু লোক এত হারামি! বলে কিনা প্লেনে চড়তে পাসপোর্ট লাগবে। এ নিয়ে দুই রাত ঘুম বন্ধ ছিল জামালের। সত্যিই যদি লাগে! পরে এক আদম ব্যাপারির কাছে জেনেছে, দেশের মধ্যে লাগে না।

গ্রামের সবাই আবার খারাপ না। এই যেমন কালই একজন ভালো মনের মানুষকে দেখলো সে। প্লেনে চড়বে শুনে তার সাথে সেলফি তুলতে এসেছে। ফেসবুকে নাকি দেবে। বাহ্। কি ভালো ছেলে!

বউ ছেলে-মেয়ের কাছে এমনভাবে গল্প চলছে যেন সে এর মধ্যে দশ-বারোবার প্লেনে চড়ে ফেলেছে। সবাই তালিকাও করে দিয়েছে ঢাকা থেকে কি আনতে হবে। জামালের মনে অন্য চিন্তা। হিসাব করে রেখেছে, লিস্ট সে ঠিকই নেবে, তবে ফিরে এসে বলবে মার্কেট বন্ধ ছিলো!

আজ ফ্লাইট। লাল জামা আর রংচটা জিন্সের বাহারে সেজেছে জামাল। গ্রাম থেকে এয়ারপোর্ট। দূরত্ব ঘন্টা দুয়েকের। নৌকা, ভ্যান, বাস, অটো হয়ে তারপর এয়ারপোর্ট। এতদিনের আনন্দ আর আত্মবিশ্বাস এয়ারপোর্টের যত কাছে আসতে লাগলো, ততই মোবাইলের চার্জের মতো কমতে লাগলো। শত হলেও প্রথমবার তো! বিয়ের দিনের মতো অনুভূতি হচ্ছে। খানিকটা ভয়, কিছুটা অজানা আর পুরোটাই টেনশন....

গেটের চেকিং পয়েন্টে কি যে তল্লাসি! সব মেটাল পাশে রাখার পরও বদমাশ মেশিন টা টু টু করেই চলছে। কি এমন আছে? জামালের শরীরটাই কি লোহার নাকি? রহস্য খুললো খানিক পরে। কোমরে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছোটবেলার চারআনা পয়সাটাই দায়ী। ওটাও খুলতে হলো বাধ্য হয়ে। এবার টিকেট কাউন্টার। ওখানের ইতিহাস আর না বলি...
শেষমেষ স্বপ্নের সামনে জামাল। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ছোট প্লেনটাই তার কাছে পাহাড়ের মতো বড় লাগে...

ওঠার মুহূর্তেই দেখলো সুন্দরী এক তরুণী সালাম দিয়ে বললো, “সুপ্রভাত স্যার, কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”

বিমানবালার “কিভাবে সাহায্যের'' মানেটা জামাল কি বুঝলো কে জানে!
সে বললো, “আমার হাতের এই ব্যাগটা এট্টু সিট পর্যন্ত লইয়া জান তো!”

বিমানবালার মুখটা দেখার মতো হলো। সে প্রফেশনাল হাসি দিয়ে বললো, “সরি স্যার, সিটটা দেখিয়ে দিতে পারি শুধু”

সিটটা জানালার পাশে হলেও হতো। টিকেট কাউন্টারে সে তো ঠিকই বলেছিল। তবে তার এপাশের সিট পড়লো কেন?

কাউন্টারে বসা লোকটি জিজ্ঞেস করেছিল, “স্যার সিট কি উইন্ডো দেব না আইল?”

জামাল এসব ভালোই বোঝে। আইল তো জমির সীমানাতেই থাকে। তাইলে জানালার পাশেরটাই তো আইল। সে বলেছিল আইল, এখানে এসে দেখে সিট ঘুরে গেছে। বাটপার কতগুলা!

সেই সুন্দরী তরুণী বারবার বলছে, “সিটবেল্ট বেঁধে নিন।”

কিভাবে বাঁধবে জামাল? তার তো সিটবেল্ট নেই! বিমানবালাকে ডেকে বললো, “ব্যাগ তো টাইন্যা দিলেন না একটা সিটবেল্ট তো দেবেন!”

বিমানবালা অবাক হয়ে বলে, “স্যার আপনার সাথে তো কোনো বেবি নেই, তাহলে এক্সট্রা সিটবেল্ট!!!!”

জামাল রেগে ওঠে একটু, “এক্সট্রা মানে? এট্টাই তো দেন নাই!”

বিমানবালা বললো, “স্যার, দয়া করে একটু উঠুন। আপনি সিটবেল্টের উপর বসে আছেন”

চরম লজ্জ্বা পেয়ে জামাল বললো, “তাই তো ভাবি, সিটটা উচা নিচা ক্যান!”

উড়লো প্লেন। বাতাসের চাপে জামালের কান বন্ধ হয়ে গেছে। মারাত্মক ভয়ও করছে। সারাপথ পানি খেতে খেতে এসে এখন ভয়াবহ প্রকৃতির ডাক। সেখানেও ঝামেলা বাঁধবে তাই বলে?

প্লেন আকাশে। জামাল চাপে। সিটবেল্ট অনেক কষ্টে খুলে টয়লেটের দরজা খোলার চেষ্টা করলো। দুম দুম বাড়ি দিলো দুইটা। দরজা খুলে গেল খানিকটা, উঁকি দিয়ে দেখলো, টয়লেটে দুজন একসাথে পাশাপাশি বসা। ছিঃ। কিন্তু এটা কেমন টয়লেট। ভুল ভাঙ্গলো খানিক পরে। ককপিটের দরজায় এই তাণ্ডব চালিয়েছে এতক্ষণ। ভেতরে ক্যাপ্টেন তো রেগে ফায়ার।

আবারও সেই বিমানবালা। তাকে টয়লেট দেখিয়ে দিয়ে দরজা খোলা-বন্ধ করাও শিখিয়ে দিলো।

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়েই হলো বিপত্তি। বদনাও নেই। কলও নেই। এবার? দরজা খুলতে জেনেও চুপটি করে বসে রইলো জামাল।

ওদিকে বাইরে খাবার সার্ভ হলো, সবাই খেল। জামালের টা পড়েই রইলো। খানিক পরে ক্রু এসে ঐ খাবার নিয়েও গেল। জামাল তখনও স্বেচ্ছা আটক।

ল্যান্ডিং এর সময় জামালের খোঁজ পড়লো। সেই বিমানবালা। দড়জার বাইরে জামালকে কল সেন্টারের মতো স্টেপ বাই স্টেপ সাপোর্ট দিয়ে তারপর বের করলো।

সবাই এতো বিরক্ত কেন কে জানে? বের হয়েই বিমানবালাকে প্রথম প্রশ্নটা করলো, “ক্ষুধা লাগসে তো, খানা কই?”

বিমানবালা দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “সার্ভ করা এবং ক্লিনআপ শেষ স্যার। এখন আর পাবেন না!

জামাল ফুঁসে ওঠে, “পামুনা মানে, আমি মামলা করমু”। চলতে থাকে হট্টগোল।

ল্যান্ডিং এর পর প্লেন থামার আগেই অতি সতর্ক হয়ে আগেভাগেই রেডি হয় জামাল। তাকে যা যা দিয়েছে সব নিতে তো হবে! সিটের পেছনের বালিশটা, সিটের সামনের একটা কাগজের ঠোঙ্গা, পত্রিকা, দুর্ঘটনার সময় করণীয় কি তা লেখা একটা কাগজ... সব ব্যাগে ভরে সযত্নে। শুধু দুঃখ একটাই। ওই কাগজটাতে অক্সিজেন মাস্ক আর লাইফ জ্যাকেটের উল্লেখ দেখেছে সে। ওই দুটো কোনভাবেই খুঁজে পেল না।

অতি কষ্টে লাগেজ চিনে বের করে নিয়েই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যাগের বেল্টটা নেই! কর্তব্যরত গার্ডকে সব বলতে সে লাগেজ ট্যাগের সাথে মেলালো। একি! এ তো অন্যের ব্যাগ। আধা ঘন্টা চেষ্টার পর উদ্ধার হয় ব্যাগ। ওদিকে যার ব্যাগ জামাল নিয়েছিল তার তো কাঁদো কাঁদো অবস্থা। সমস্ত সার্টিফিকেট ওই ব্যাগে ছিল তার। জামাল অবাক হয়। এত কাঁদার কি আছে। কয়টা কাগজই তো!

এয়ারপোর্ট ছেড়ে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। দুপুর হয়ে গেছে। একটা রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাসে রওনা দেয় সদরঘাটের দিকে। টানা পাঁচ ঘন্টা জ্যাম পেরিয়ে সে যখন সদরঘাটে, শরীরের একটা কণাতেও যেন কোনো শক্তি বাকি নেই।

লঞ্চে উঠেই ঘুম। পরদিন বাসায় ফেরার পর সে বোধ করে সে তো বিশাল বীর। গর্বে বুকটা ফুলতে থাকে। গ্রামের সবার কাছে এ গল্প, সে গল্প করে সবাইকে বিদায় দেয় সে।

ভর দুপুরে আয়েশ করে খেয়ে ছোট ছেলেটাকে পাশে নিয়ে শুতে গেল জামাল। ছোট্ট ছেলেটা প্লেনের বালিশটায় মাথা রেখে শুয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করে, “বাবা, আকাশ থেইক্যা নিচের বাড়িঘর কেমন দেহায়?”

আকাশ থেকে পড়ে জামাল। এত্তসব কাহিনীর মধ্যে প্লেন থেকে নিচের দৃশ্য তো তার দেখাই হয় নি! মনটা কষ্টে ছেয়ে যায়। কিছু বলতে পারে না। সে। আরও দুবার জিজ্ঞেস করার পর ধমকের সুরে বলে, “কি যন্ত্রণা! কেমন আবার দেহাবে? যেমন দেহানের তেমনই দেহায়! আকাশ তো আকাশই, তাই না? ঘুমা তো!”

লেখক: সিনিয়র সহকারি সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

 

গল্প: আরও পড়ুন

আরও