সহজ শিশু

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

সহজ শিশু

মনদীপ ঘরাই ৭:০৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৮

সহজ শিশু

পোস্টারগুলো আজ আর সব লাগানো গেল না। এখনো গোটা বিশেক বাকি। শরীরটা আজ একদম ভালো লাগছে না রইসের। বিন্দু বিন্দু ঘামও জমেছে কপালে। এই বাকি পোস্টারগুলোর জন্য নিশ্চিত ৫০ টাকা কম পাবে। ভেবেই মনটা কেমন করছে। শরীরের সাথে আর যুদ্ধ করে পারছে না। পোস্টারগুলো একহাতে আর আঠার বালতিটা অন্যহাতে নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলো রইস।

রাবেয়ার গর্ভে সন্তান। ৬ মাস চলছে। তবুও রইসের জন্য অপেক্ষা না করে রাতের খাবার খায় না সে। আজ রাতে রইসকে তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে বিচলিত হয় খানিকটা।

- আপনে আইজ এহন আইলেন? শইলডা খারাপ নাকি?

-  নাহ্। ভাত দেও।

বউয়ের কাছে অসুস্থ্যতার কথা স্বীকার করতে চায় না রইস।

ভাত খেতে খেতে রইস লক্ষ্য করে রাবেয়ার নজর তার আনা পোস্টারগুলোর দিকে। এই প্রথম পোস্টার ফিরিয়ে এনেছে রইস। এতদিন শুধু খালি আঠার বালতিটাই চিনতো রাবেয়া। আজ প্রথম দেখছে পোস্টারগুলো।

রইসের খাওয়া শেষ হতেই  উতলা হয়ে পোস্টারগুলো দেখতে যায় রাবেয়া। বাচ্চাদের ডায়াপারের বিজ্ঞাপনের পোস্টার। ফুটফুটে দেখতে একটা বাচ্চা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। নিচে ডায়াপারের ছবি। বাচ্চার ছবিটা দেখামাত্র কেন জানি ওর মধ্যেই মনটা বেঁধে ফেলে রাবেয়া। কিছু না ভেবেই রইসকে বলে,

“আমারে এইডা দেবেন? ঘরে টানামু”

বউয়ের এত ছোট চাওয়া নিয়ে কথা বাড়াতে মন চায় না রইসের। শরীরটা ভালো না তার। আঠার বালতিটা এনে একটা পোস্টার ঘরের দেয়ালে লাগিয়ে দেয়। শহরের দেয়ালে দেয়ালে লাগানো পোস্টারগুলোর মতো এ পোস্টারটা নিখুঁতভাবে লাগাতে পারলো না রইস। তিন-চারটা ভাঁজ রইলো। 

রাবেয়ার চোখে ওগুলো পড়ে না। ওর চোখে- শুধু মুগ্ধতা। সে রাতে দু চোখ লেগে আসার আগ পর্যন্ত প্রাণ ভরে দেখে ছবিটা। এমন একটা সুন্দর বাচ্চা যেন তাদের তাদের হয়! 

সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখে রইস নেই। কাজে বেরিয়ে গেছে।

সারাদিনে  কতবার যে ছবিটা দেখলো তার কোনো হিসেব নেই।

“পোলাডা কি সুন্দার!” 

একাকী জীবন আর অসুস্থ্যতার একমাত্র সঙ্গী এখন ছবিটা। রাবেয়া কথা বলে ছবিটার সাথে! যদিও একা একা।

এই যেমন একটু আগে একা একাই বলছিল,

“ও সোনা, তোমার খিদা লাগসে? কিছু খাবা?”

ছবি তো আর জবাব দেয় না। তবে পেটে থাকা সন্তানের নড়াচড়া টের পায় সে।মনযোগটা এবার নিজের সন্তানের দিকে দেয়।

পাড়া বেড়ানো খায়রুন নানী এসেছে। পান খেতে খেতে দাঁত বের করে রাবেয়াকে বলে,

“কেবল তো এট্টা নিলি। তাইতেই এত্তো ঢং। গরীব মাইনষের ৫-৬ ডার আগে থামোন যাইতো না। রেডি হ বেডি!” 

রাবেয়া অশিক্ষিত। মানুষের বাসায় কাজ করে খেত এতদিন। তাই বলে নানীর মতো ৫-৬ সন্তানের স্বপ্ন নেই তার। তবে, ওসব স্বপ্ন নাকি মহিলাদের দেখা লাগে না। পুরুষ মাইনষের ইচ্ছা।

ওর শুধু পোস্টারের বাচ্চাটার মতো একটা সুস্থ্য বাচ্চা চাই। ফুটফুটে সুন্দর। একটু নাদুস-নুদুস। 

বস্তির ছোট ঘরটাতে আজ খুশির জোয়ার। ছেলে  হয়েছে রাবেয়া আর রইসের। 

বাড়ীতে বাড়ীতে মিষ্টি বিলানোর সামর্থ না থাকলেও সুখবর বিলাতে থাকে রইস। 

ওদের বাচ্চাটা ফর্সা হয়নি। বেশ চাপা গায়ের রং। রইসের মতো। রাবেয়ার গর্ভকালীন অপুষ্টির প্রভাবটা বাচ্চার মধ্যেও ছড়িয়েছে। লিকলিকে গড়ন বাচ্চাটার। খায়রুন নানী এসে শুধু বললো,

“গরীবের ছাও। যেমন হওয়ার তেমনি হইছে”

সন্তান যে “ছেলে” এটুকুতেই খুশি রইস।

আর রাবেয়া? অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, “কিভাবে হল?তার সন্তান ছবির বাচ্চাটার চেয়েও সুন্দর হলো কিভাবে?”

কিন্তু রাবেয়ার এই চোখ দিয়ে দেখে না কেউ! শক্ত করে কোলের মাঝে লুকায় “চাঁদ” কে। ছেলেটার নাম চাঁদ রেখেছে রাবেয়া। 

কিন্তু মন খারাপ করা ব্যাপার হয়েছে একটা। সময়ের সাথে সাথে “চাঁদ” হয়েছে “চাঁন”। আর বস্তির মানুষগুলো এতো খারাপ! গায়ের রঙ্গের সাথে মিশিয়ে রাবেয়ার ছেলের নাম হয়ে গেছে কালাচাঁন। 

ওতে কিছু আসে যায় না রাবেয়ার। 

গরীবের শৈশবে নাকি বলার মতো কিছু থাকে না। কালাচাঁনের শৈশবেও তাই নিজে বুঝতে শেখার আগের কোনো গল্প নেই। 

দেখতে দেখতে কালাচাঁনের বয়স এখন ছয়। পোস্টারের বাচ্চাটা আগের মতোই আছে।

এখনো হাসছে অজানা সুখে।

আর কালাচাঁনের চোখে আজ জল।

একটু আগে একটা আইসক্রিমওয়ালা এসেছে বস্তিতে। খুশির ঢল নেমেছে বাচ্চাদের জগতে। যে পারছে কিনে খাচ্ছে। সুপারিওয়ালা বুড়োটা দেখছে তাকিয়ে।

এই তো এইমাত্র পাশের সবজিওয়ালা তার দুই জমজ বাচ্চাকে দুটো আইসক্রিম কিনে দিলো।

কালাচাঁনের ও কপাল নেই। সবার আইসক্রিম খাওয়া দেখছে দাঁড়িয়ে।ওর বাবাও যদি আজ থাকতো!

এ বছরের শুরুতে বাবা আরেকটা বিয়ে করে চলে গেছে অন্যকোথাও।

ঘরে ছোটছোট দুটি বোন। মা কাজ করে বাসায় বাসায়। দিনের শুরুতে যেখানে হিসেব কষতে হয় আজ চুলা জ্বলবে কিনা, সেখানে আইসক্রিম ছুঁয়ে দেখতে চাওয়টাই তো পাপের।

ছয় বছর বয়স হতে পারে, তবে মগজটা এর মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্কের হয়ে গেছে কালাচাঁনের। বস্তির জগতটাই তো এমন। বুঝতে শিখলো যেদিন, সেদিনই রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখতে হয়েছে বাবা-মায়ের আদর-সোহাগ।

বেডরুম বলে তো আর কিছু ছিলনা! ওই দুঃসহ দৃশ্য এখনও তাড়া করে ফেরে তাকে।

বয়স যখন চার, তখন “এর বাচ্চা”, “তার বাচ্চা” গালিগুলো মুখস্ত হয় পুরোপুরি। ইচ্ছে না থাকলেও কিভাবে রোদে পুড়তে হয়, বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, কিংবা শীতের রাতে গরম কাপড় ছাড়া থাকতে হয়, সে ট্রেনিং তার নেয়া শেষ।

মায়ের সাথে এক বাসায় কাজে যেত কালাচাঁন। ওকে দিয়ে মরিচের বোঁটা আলাদা করাত। একদিন চোখে লেগে সে কি যন্ত্রণা। কেউ যত্ন করে নি। উল্টো মা এসে পিঠের ওপর দুটো কিল দিয়ে বলেছিল,

“হারামজাদা, শান্তিতে আমারে কাজও করতে দিবি না!”

কান্নাগুলো তাই অনেক আগেই গিলে খেতে শিখে গেছে কালাচাঁন।

তবু, এক আইসক্রিম সব এলোমেলো করে দিলো। মন মানছে না। একটা আইসক্রিম খেতে কত সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়? জানা থাকলে নিশ্চিত তা পাড়ি দিত কালাচাঁন। 

বাস্তবে আইসক্রিম কিনতে লাগে টাকা। কালাচাঁনের ছেঁড়া পকেটে একটা রাবার ব্যান্ড ছাড়া কিছুই নেই। মনের অজান্তে চোখে জল এসেছে তার। সামলাতে গিয়েও পারলো না।

হঠাৎ দেখলো, সুপারিওয়ালা ডাকছে। কাছে যেতেই বললো, “আইসক্রিম খাবি, মধু?”

সর্বশক্তি দিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো কালাচাঁন।

“এই নে টাকা” এ কথা বলে একটা এক টাকার কয়েন দেয়ার ভান করেও দেয় না। মিনিট পাঁচেক এ জঘন্য খেলার পর হাতে আসে কয়েনটা।

ওই এক টাকা নিয়ে প্রাণপনে ছোটে আইসক্রিমওয়ালার কাছে। আইসক্রিমওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলে,

“ফইন্নির পুত, এক টাকায় আইসক্রিম তোর বাপে দেবে? যা, ভাগ!”

সত্যিই তো। কালাচাঁনের বাপও নেই। আইসক্রিম খাবার সাধ্যও নেই। কান্নাটা এবার গিলে খেয়ে নেয় নিজের মধ্যে। মোড়ের মুদি দোকানটা থেকে ১ টাকা দিয়ে একটা চকলেট কেনে।

ওটাতেই সুখ খোঁজে সে। ছয় বছরের জীবনে আর কতকিছু মেনে নেবে সে!

এ বয়সেই মানুষের বাজারের ব্যাগ টানে। ময়লার স্তুপে টোকায় এটা-ওটা। পড়াশোনার সাথে ভাব হয় নি।

খেলনা নিয়ে খেলার বয়সে খেলছে জীবন আর বাস্তবতা নিয়ে।

সবচেয়ে বেশি শিখেছে সবকিছু মেনে নিতে। চকলেটটা খেতে যেয়েও পারে না। বাসায় ছোট দুটো বোনকে রেখে কিভাবে?

একদৌঁড়ে বাসায় যেয়ে মায়ের সুপারি কাটার যন্ত্রটা দিয়ে দুভাগ করে চকলেটটা।

মেজ বোন সীমাকে চকলেট দিতেই টুপ করে মুখে ভরে নিল। চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী এখন সীমাই।

ছোটটা নিজে খেতে পারে না। তাকে নিজ হাতে একটু একটু করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতে থাকলো।

হঠাৎ মা হাজির। চারমাস বয়েসী নাসিমাকে চকলেট খাওয়াতে দেখে অগ্নিমুর্তি ধারণ করে,

“হারামির বাচ্চা, তুই ওরে চকলেট দিলি ক্যান। জানিস না ও দুধ ছাড়া কিছু খাইতে পারে না!”

বমি করছে ছোট্ট নাসিমা। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালাচাঁন। নাসিমার দিকে খেয়াল করার সময় নেই রাবেয়ার। স্যান্ডেলটা খুলে বেধড়ক মারতে থাকে কালাচাঁনকে।

মার খেয়ে মাটিতে লুটায় কালাচাঁন। একটুও নড়ে না। এগুলো সহ্য করার জন্যই তো তার জন্ম। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে জলে। চোখ পড়ে দেয়ালের ছেঁড়াফাটা পোস্টারটার দিকে। পোস্টারের বাচ্চাটা হাসছে। হেসেই চলেছে।

ওর জীবন কত মধুর! হাসি ছাড়া কিছু নেই। আর কালাচাঁনের হাসি ছাড়া যাবতীয় সব আছে।

একদিন পোস্টারের এই শিশুটার মতো সন্তান চাইতো রাবেয়া। সে প্রাপ্তির ঘাটতি হলো কি কোথাও? 

একটু আগে জ্ঞান হারিয়েছে চাঁদ। রাবেয়া ছোট্ট নাসিমাকে কোলে নিয়ে কাঁদছে। আইসক্রিমওয়ালার ঘন্টার শব্দ অচেতন অবস্থাতেও কিভাবে শুনতে পাচ্ছে চাঁদ? 

লেখক: সিনিয়র সহকারি সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার