সুচিত্রা সেন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ৪ মাঘ ১৪২৫

সুচিত্রা সেন

ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম ডিউ ৪:০৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৮

সুচিত্রা সেন

সন ২১৭১।

পূর্ণবতী, নিভৃত এক গ্রামে আছি বেশ কিছুদিন। গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়ায় অখণ্ড অবসর, খুব বেশি ব্যস্ততা নেই। লেখালেখি করে সময় কাটানো অবশ্য মন্দ নয়। ছোট মেয়েটা ছুটি কাটিয়ে মাইজদী ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এ যাবার পর থেকে মোটামুটি একা। সঙ্গী বলতে রোবত্রী আরশিয়া। রোবট মেয়েটি আমাকে মামা বলে ডাকে। দুষ্টু টাইপের। বার বার বলেছি, আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে বেশি মেমোরি ওভারলোড না করতে। কিন্তু তার সমস্ত আগ্রহ এখানেই।

মামা উইঠগা পড়েন। কত্ত সুন্দর সকাল।

তুমি চা কর।

চা রেডি আছে মামা। মামা ঢাহার একখান পত্র আসছে।

চিঠিটি হাতে নিলাম। দেড়শো বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে ‘শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব প্লাস্টিক সার্জারি এন্ড রোবটিক্স’-এর। মনটা অসাধারণ ভালো লাগায় ভরে গেল। দেড়শত বছর আগে অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন নামের একজন চিকিৎসকের স্বপ্ন আর সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞার ফসল ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুতে ইনস্টিটিউট হিসেবে যাত্রা করে আজ সে এক মহীরুহ। ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় একটি দাওয়াত পাঠিয়েছেন। যেতেই হবে। অনেক দিন ঢাকায় যাওয়া হয় না।

কোটালীপাড়ার আলো, বাতাস, বিলের মাছ, বিলের পাড় দিয়ে রোবত্রী আরশিয়াকে নিয়ে হেঁটে চলার নেশায় পেয়ে বসেছে আমাকে। বিলের পাড়ের সোলার প্যানেল থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়ে আসছে অনেক বছর। মাইক্রো সোলার প্যানেলগুলো যেন পূর্ণিমার রাতে আকাশ থেকে মাটিতে খসে পড়া তারা।

সারা পৃথিবীতে কোটালীপাড়ার কৈ বিখ্যাত। কালো কালো সে কৈ মাছ ধনিয়া পাতা দিয়ে ভূনার কথা মনে হলে আর কোথাও যেতে মনে চায় না। রান্নার কাজে যে রোবটটি সাহায্য করে থাকে সে মাইক্রো ফিস বোন হ্যান্ডেলিং করে একেবারে মায়ের মতো। মা খুব যত্ন করে মাছের কাঁটা বেছে দিতে পারতেন। মায়ের হাতের চিতলের কোপ্তা, ইলিশের লেজের ভর্তার স্বাদ ছিল তুলনাহীন। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরার ওপর দেড়শ বছর আগে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল সে তারিখটি আজ  রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি একটি সরকারি ছুটির দিন। মধুমতি, ঘাগর নদীসহ অনেক ছোট নদ-নদীতেও আজ প্রচুর ইলিশ মেলে।

রোবত্রী আরশিয়াকে বিদায় দিয়ে বুলেট ট্রেনে উঠেছি। বুলেট ট্রেন ছুটে চলেছে, বলাকইড়ের বিলে যেন পদ্ম ফুলের মেলা বসেছে। ট্রেনের গ্লাস স্ক্রিনে বিলটির মেলা তথ্য উপাত্ত ভেসে উঠেছে। আমি আগেই অর্ডার দিয়ে রাখায় ভিসি মহোদয়ের জন্য পদ্ম ফুল দিয়ে অসাধারণ তোড়া করে ট্রেনে রেখে দিয়েছে। ভাঙ্গার কাছাকাছি এসে টানেলের ভেতরে ঢুকেছে ট্রেন। টানেলে ঢুকলে মাটির ট্রেঞ্জে আশ্রয় নেওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। ১৯৭১ এ জন্মের পর পর মা আমাকে নিয়ে ট্রেঞ্জে আশ্রয় নিয়েছিলেন, অনেক কষ্ট করেছিলেন।  বাংলাদেশ তার অবর্ণনীয় কষ্টের অধ্যায় শেষে যে বার্ন এন্ড প্লাস্টিক ইনস্টিটিউট করেছিল সেটি সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে উৎসর্গ করেছিল। সেটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। এত সুদূর চিন্তা চেতনার প্রতিষ্ঠান সারা পৃথিবীতে বিরল। শারীরিক বিকৃতি, জন্মগত ত্রুটি,ক্যান্সার কিংবা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অঙ্গ সংযোজন, শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানটির নিরন্তর গবেষণা, সৃষ্টিশীল উদ্ভাবন, সেবা প্রদানে বিশাল কর্মযজ্ঞ অচিন্তনীয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্কিন ব্যাংক, পোড়া রোগীদের ব্যথা মুক্ত ড্রেসিং করার জন্য বার্ন ট্যাংক, বিশাল মাইক্রোসার্জারি প্রশিক্ষণ ল্যাব, হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বার কত কিছুর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন সেসময়ের প্লাস্টিক সার্জনরা। তাদের ওয়াটার হার্ভেস্টিং এন্ড ট্রিটমেন্ট প্লান্ট আজও বিখ্যাত।

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়ে এ দেশে যে প্লাস্টিক সার্জারি গড়ে উঠেছিল তাদের হাতেই ইনস্টিটিউটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক মাইক্রোসার্জারি বিভাগটি বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে প্রথম। রোবটিক হ্যান্ড ডেভেপমেন্টে তাদের সৃজনশীলতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। হ্যান্ড অ্যান্ড এলবো ট্র্যান্সপ্লান্টের জন্য সারা পৃথিবী থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর আগমন ঘটে।

পদ্মা নদীর নিচ দিয়ে টানেলের ভেতর দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে। ট্রেনের চারপাশে সাঁতার কেটে চলেছে ইলিশ। কত্ত বড় বড় ইলিশ। তিন/চার কেজি ইলিশের বেশ দেখা মেলে এ টানেলের পাশে। যেন রুপার ছড়াছড়ি। চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায়। আমাদের নামার সময় হয়ে এসেছে। বঙ্গবাজার ইন্টারন্যাশনাল টানেল স্টেশনের খুব কাছেই চলে এসেছি। সারা বিশ্বের বুলেট ট্রেনের একটি হাব হিসেবে স্টেশনটি দিনরাত জেগে আছে।

শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব প্লাস্টিক সার্জারি এন্ড রোবটিক্সের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক আক্তার শরমিন আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে অনেক দিন বাদে ঢাকা এলাম। অধ্যাপক আক্তার শরমিন দুর্দান্ত সব অপারেশনে লিড দিয়ে আসছেন বেশ কয়েক যুগ ধরে। সারা পৃথিবীর অসংখ্য প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীতে আজ বঙ্গবাজার ইন্টারন্যাশনাল টানেল রেল স্টেশন ভরে উঠেছে। ট্রেন থেকে নামার পর পরই আমার ট্রলি আমার পিছু নিয়েছে। তাকে ডিরেকশন দিয়ে দেওয়ায় হোটেলের দিকে আবার রওনা দিয়েছে।

অনেকদিন বাদে রোবত্রী ইশরাক কলি এএফএম ১৪-এর সাথে দেখা। টার্মিনালে আমাদের রিসিভ করতে এসেছে।

শুভ সকাল স্যার। আসসালামু আলাইকুম।

কি খবর একেবারে শুকিয়ে গেছো দেখছি?

জি স্যার, আমাদের মেলা আপডেট এসেছে। একেবারে সুপার স্লিম করে ছেড়েছে। স্যার শাড়িতে কেমন লাগছে?

অসাধারণ। একেবারে যেন সুচিত্রা সেন। এটা কী মনিপুরি জামদানি?

পাশেই ছিল রোবত্রী ফারাহ আমান এএফএম১৫। বিশাল টোল ফেলা হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো।

জ্বি স্যার মনিপুরি জামদানি পরেছি আমরা। কিন্তু আপনি খুব বাড়িয়ে বলেন, এ নিয়ে অন্তত দশজনকে বলেছেন সুচিত্রা সেনের মত লাগছে..!

শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব প্লাস্টিক সার্জারি এন্ড রোবটিক্সে যতবার এসেছি এরা আমার খবর নিয়েছে। এসেই বলবে, 'স্যার স্কিন ব্যাংকে আপনার স্টেম সেল কিন্তু রয়েছে, চাইলে আপনাকে আরো কালো করে দিতে পারি আমরা। রোদে তাপে আপনার কিচ্ছু হবে না'। বলেই একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে চোখ টিপ দিবে। চোখ টিপ দেয়া ভালই রপ্ত করেছে। মানুষের সাথে থেকে থেকে বদের হাড্ডি হচ্ছে দিন দিন।

বলেন না স্যার আমাকে কেমন লাগছে? রোব আপু ইশরাক কলি এএফএম ১৪ তো এমনিতেই অনেক সুন্দর তাই না স্যার?

রোবত্রী ফারাহ আমান এএফএম ১৫, তোমাকেও সুচিত্রা সেনের মত লাগছে।

আমাকে? আবারও স্যার!

কি করবো বলো বাড়িয়ে বলা যে ছোটবেলার অভ্যাস।


ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম ডিউ

১৯তম ব্যাচ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল।

২২/১০/২০১৮