কচ্ছপ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯ | ৭ চৈত্র ১৪২৫

কচ্ছপ

মনদীপ ঘরাই ১:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৮

কচ্ছপ

সাদ সাহেব গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন আজ। ৫০ বছরের এই জীবনটাতে টাকা উপার্জন ছাড়া আর করেছেন টা কী? শৈশব আর কৈশোরে তো সেটাও করেন নি। এতবড় ব্যবসা আর বিপুল সম্পদ গড়ার সময় চিন্তা ছিল একটাই- ‘ভবিষ্যৎ’

রোজকার সকালের সূর্য তার জন্য নতুন করে ভবিষ্যৎ নিয়ে এসেছে। বর্তমান নিয়ে ভাববার সময় হয় নি।

গতকাল খুব কাছের বন্ধু রাহাতের মৃত্যু তাকে ভাবিয়ে তুলেছে।

আমাকে বললেন, ‘রাহাত যে মারা গেল, সে তো বর্তমানেই গেল। ভবিষ্যৎ কি আমরা কেউ ধরতে পারি? ছুঁতে পারি? আর এই ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে ভুলে যাই আমরা!

আমি কিছুই বলি না। এসব খেয়ালি কথা বহুবার শুনেছি আমার তৈরি এই চরিত্রটার কাছ থেকে।

‘একটা প্রেম পর্যন্ত করি নি জানেন, ভবিষ্যতের চিন্তায়! ফল কি হলো? একগাদা টাকা আয় করে বিয়ে করলাম দুইটা। শান্তি নাই রে ভাই।’

এবার আর চুপ থাকতে পারলাম না, ‘শান্তি খোঁজেন। নিষেধ টা করলো কে!’

‘আরেকটা বিয়ে করবো?’

এবার আর মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন। আমি কিছু না বলে উঠে বের হয়ে গেলাম। এর মতো নির্বোধের গল্প আমাকে লিখতে হবে!

এক সপ্তাহ পরের কথা। সকাল বেলায় বাসায় দেখি একখানা কার্ড। সাদ সাহেব পাঠিয়েছেন। বুঝতে দেরি হলো না। তৃতীয় শুভকাজের দাওয়াত। কার্ডের রং তো তাই বলে।

খাম খুলে কার্ড দেখে অবাক! বিয়ে তো না। একটা বড় কচ্ছপের ছবি। এটা আবার কিসের কার্ডরে বাবা!

ভয়ে ভয়ে ভেতরটা তে নজর দিলাম। কচ্ছপ বাঁচাও আন্দোলন শুরু করেছেন সাদ সাহেব। কাল বিশাল মিটিং। একটা স্লোগানও লেখা, ‘কচ্ছপ বাঁচান, পরিবেশ বাঁচবে’।

কার্ডটা ওভাবেই রেখে কাজে বের হলাম। যত্তসব!কালকে দেখবো কি করে এই পাগল।

কার্ডে বিকেল ৪টার কথা লেখা ছিল। একটু আগেভাগেই গেলাম। আমার তো মাথা ঘুরাচ্ছে। শত শত লোক। কারণটা কচ্ছপের প্রতি দরদ মোটেও না। পাঁচতারা হোটেলে আয়োজন বলে কথা। সেই সাথে কোত্থেকে যেন বড় এক অ্যাকুরিয়ামে ১০-১২ টা কচ্ছপ এনে রেখে দিয়েছে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কচ্ছপ দেখার জন্য।

মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো। পরিবেশবাদীদের কেউ বাকি নেই সবাই এসেছে। ১০-১২ টা টিভি চ্যানেল মুহূর্মুহু শ্যুট করছে।

এর মাঝেই প্রধান অতিথি জনাব সাদমান সাকিব ওরফে সাদ সাহেবের বক্তব্য শুরু: ‘একবার ভাবুন। এই কচ্ছপগুলো কালের সাক্ষী। এদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে ইতিহাস জানা সম্ভব। চলুন এদের বাঁচাই। এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।এদের বাঁচান প্লিজ।’

বলেই বক্তব্যের মাঝে চোখ মুছতে লাগলেন।

আমি নির্বাক। বক্তব্য শেষে আমার কাছে এসে বললেন, ‘কেমন দিলাম? কচ্ছপ শালারা তো নিজেরাই তিনশো-চারশো বছর বাঁচে। ওদের আমরা আবার কি বাঁচাবো। তবু মনের মধ্যে ভালো লাগছে, কিছু তো একটা করছি। তাও আবার বর্তমানে!’

ছিঃ মানুষ এমন খারাপও হয়!

রাগে ক্ষোভে বললাম, ‘ঠিকই তো ভাই। ওরা চারশো বছর বাঁচবে আর আপনাকে- আমাকে মরতে দেখে হাসবে! পারবেন হতে কচ্ছপ? পারবেন বেঁচে থাকতে শত শত বছর?’

বুনো পশুর মতো তেড়ে আসতে যেয়েও নিজেকে সংবরণ করলেন সাদ সাহেব। শুধু বললেন,

‘খেয়ে যেয়েন’

আমার এক কথা এলোমেলো করে দিল সাদ সাহেবের জীবন।

কচ্ছপ তাঁকে হতেই হবে। শুরুতে বিদেশ থেকে ডাক্তার আসলো। চারশো বছর বাঁচার ওষুধের কথা শুনে শুধু বললো,

‘Crazy’

এরপর বিজ্ঞানীদের পালা। তারা বললো, আপনাকে রাখা সম্ভব না। আপনার লাশ প্রিজার্ভ করা সম্ভব। রেগেমেগে এক বিজ্ঞানীর দিকে গ্লাস ছুঁড়ে পর্যন্ত মারতে দ্বিধা করলেন না তিনি।

মিশরের মমি শিল্পীরা শিডিউল ক্যানসেল করলেন। তাদেরও তো কাজ লাশ নিয়ে। সেধে মার খাবার কোনো মানে হয়!

এবার প্রাণী বিশেষজ্ঞদের ডাক পড়লো। তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে। এরা মরা কিংবা জ্যান্ত কোনো মানুষ নিয়েই কাজ করে না। শুধু অন্য প্রাণী তাদের ভাববার বিষয়। মানুষ কি প্রাণী না? ভেবে পান না সাদ।

নিরাশা বাড়ে। কেউ দিতে পারে না কচ্ছপ হতে পারার সমাধান।

অবশেষে এক মাস পর এক বিকেলে। ক্লান্ত, শ্রান্ত সাদ সাহেব হাজির হন আমার অফিসে।

‘পারলাম না কচ্ছপ হতে। ৩০০-৪০০ বছর বাঁচা তো দূরে থাক, জীবনের এক সেকেন্ডও বাড়াতে পারলো না জগতের কেউ!’

আমি যুদ্ধ জয়ের আনন্দ লুকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বললাম, ‘আপনার পরিবারের সবাইকে জিজ্ঞেস করেছেন?’

এমন কি বলে ফেললাম কে জানে! মুহূর্তের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে ছুট লাগালেন সাদ সাহেব।যেতে যেতে বলে গেলেন, ‘ইচ্ছে করে নিজেই আমার কাছে হারলেন রে ভাই।আপনি বোকা।যাচ্ছি পরিবারের কাছে।’

শুরুতেই প্রথম ঘরের একমাত্র ছেলে মাসুমের কাছে সমাধান চাইলো সাদ সাহেব। ছেলের সহজ জবাব, ‘ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলো। তুমি জগতে না থাকলেও তোমার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তোমার স্মৃতিগুলো থেকে যাবে বছরের পর বছর’।

চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সাদ সাহেবের। মনে মনে বলেন, আরে তাইতো! এভাবেও তো কচ্ছপ হওয়া যায়।

শুরু হয় ফেসবুকে ছবি আর ছেলের লিখে দেয়া স্ট্যাটাস শেয়ার।একটা তো গতি হলো!

এবার সাদ সাহেব গেলেন মেয়ের কাছে।মেয়েকে মনে হয় কোনো সহজ প্রশ্ন করা হয়েছে। সে বলে,

‘এটা তো ইজি বাবা। পলিথিনের বিনাশ নেই। পানিতেও মেশে না, মাটিতেও না। তোমার একটা বড় প্লাষ্টিকের ভাস্কর্য বানাও। তুমি মরে গেলেও রং একটু চটে যেতে পারে, কিন্তু রয়ে যাবে কচ্ছপের মতো’।

এটাও মনে ধরলো। অর্ডার দেয়া হলো দেশের সবচেয়ে বড় প্লাস্টিকের ভাস্কর্য, ভুড়িওয়ালা সাদ সাহেবের বেঢপ ভাস্কর্য।

এবার সে গেল বড় বউয়ের কাছে। বড় বউও সাবলীল। বলে, ‘ছবি তোলো। একগাদা ছবি। তুমি মরলেও ছবি থাকপে’।

তৃতীয় পদ্ধতিও গিলে খেলেন সাদ সাহেব। মাঝখান থেকে চাকরি পেলো একটা ছেলে। সারাদিন সাদ সাহেবের পিছে ঘোরে আর ছবি তোলে। কচ্ছপের পিঠে আরেক কচ্ছপ।

এবার ছোট বউয়ের দুয়ারে। সে বলে, ‘সিনেমা বানাও। নায়ক হও। উত্তম কুমার কবে মরি গেসে, অহনও হগ্গলে দ্যাহে’।

আনন্দে গদগদ হয়ে গেলেন সাদ সাহেব। তাহলে নায়ক হওয়াও একটা সমাধান! এজন্যই তো ছোট বউকে এত ভালবাসি। যেই কথা সেই কাজ। ছবি হিট হোক আর ফ্লপ, নায়ক হবোই। কচ্ছপের মতো ২০০ বছর রয়ে যাবে সিনেমা। প্রযোজক খোঁজা শুরু।

শেষমেস মায়ের কাছে গেলেন সাদ সাহেব। মা একটু সময় নিয়ে বললেন, ‘নিজেরে বিলাইয়া দে মাইনসের লাইগ্যা। দান কর। দান।’

মায়ের আজ্ঞা মানে আজ্ঞাই। নিজ খরচে নিজের নামে হাসপাতাল করলো ৫টা। চিকিৎসা ফ্রি।

এবার পাকাপোক্ত হলো কচ্ছপ হওয়া। শুধু কাজগুলো শেষ হলেই কচ্ছপের মতো দীর্ঘজীবী হবেন।

তবুও আমি জিতে গেলাম। এমনভাবে জিততে চাই নি আমি। কাল রাতে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছেন সাদ সাহেব। পরিবারের সবাই কাঁদছে। আমার চোখ আটকে রইলো ড্রইংরুমে রাখা সেদিনের অনুষ্ঠানের সময় আনা সেই অ্যাকুরিয়ামটার দিকে।

১০-১২ টা কচ্ছপ এখনও সাঁতরে চলছে।

অ্যাকুরিয়ামের বাইরে একটা স্টিকারে লেখা:

‘আপনি জানেন তো? কচ্ছপ শুধু দীর্ঘজীবী নয়, এর কামড় সবচেয়ে শক্তিশালী। ভেতরে হাত দেবেন না।’