ব্রাশফায়ার

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ব্রাশফায়ার

মনদীপ ঘরাই ৩:৪৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

ব্রাশফায়ার

গল্পের টাইটেল দেখেই যারা গোলাগুলি আর ফাইটিং এর স্বাদ পাবার জন্য বসেছেন, তাদের শুরুতেই বিদায় বলি। আমাদের আজকের গল্পটা অন্যকিছু নিয়ে।

আমি ব্রাশ। টুথব্রাশ। মানুষের জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকি; তারপরেও আমাদের কদর নেই। পড়ে থাকি বাথরুমের তাকে। এক কোণায় একটু ফাটা, এক গ্লাসে।

রহিম সাহেবের বাড়ীটাই আমাদের ঠিকানা। আমরা পরিবারের সদস্য ৪ জন। ঠিক রহিম সাহেবদের মতই।

জনপ্রতি একটি ব্রাশ।

আমি বলে উঠি, “জনপ্রতি একটা এ আবার বলার কি আছে!”

ব্রাশটা বলে, “ভাই, বলার কি আছে মানে? পাশের বাড়ির ঘটনা শোনেন নি!”

আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকে ব্রাশটা:

পাশের বাড়ির সেলিম সাহেবকে তো চেনেন। তার স্ত্রী পরিবারের সবার ব্রাশ বেডরুমে এক ড্রয়ারে রাখেন। হাইজিন নিয়ে চিন্তায়। তবে, সেলিম সাহেবের টা ছাড়া। তার ব্রাশ বাথরুমেই থাকে। তার এতো ভেজাল ভালো লাগে না।

যাই হোক, গ্রাম থেকে সেলিম সাহেবের এক দুঃসম্পর্কের কাকা এসেছিল গত সপ্তাহে।

সেলিম কাকা সকালে উঠে দেখে তার ব্রাশটা ভিজা। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলা শেষ। সেই চিৎকারে ছুটে আসে গ্রাম থেকে আসা বুড়ো নজির কাকা।

সে সেলিম সাহেবকে বলে, “ও বাজান, কি অইসে, চিল্লাস ক্যান, অ্যা?”

সেলিম সাহেব বলে, “চিল্লাবো না মানে, বাথরুমে এসে দেখি ব্রাশটা ভিজা। হলো টা কি?”

নজির কাকা শিশুর মতো অবাক হয়ে বলে, “হবে আবার কি? আমি দাঁত মাজছি! বাথরুমে দেখলাম সাবান এট্টা, শ্যাম্পু এট্টা, পেস্ট এট্টা, ব্রাশও এট্টা। আমি তো ভাবসি তোরা একব্রাশ দিয়া সবাই দাঁত মাজোছ। তাই....”

বলেই একটু থামে আমার গল্পের চরিত্র ব্রাশ টা। তার দৈনিক কাজের সময় এসেছে। এই ব্রাশটা রহিম সাহেবের। মিনিট পাঁচেক পর ভিজে-টিজে গ্লাসে এসে ঢোকে সে।

 

ব্রাশটা বলতেই থাকে। বুঝলেন ভাই, আমার স্বামী পিএইচডি হোল্ডার। ওনার নাম ডক্টর ওয়েস্ট। উনি রহিম সাহেবের স্ত্রীর ব্রাশ। আমি ট্রিশা। আমাদের সন্তান দুটো। দুটো ছেলে। রহিম সাহেবের দুটো মেয়ে তো! ওদের ব্রাশ। ওদের দুজনের নাম ম্যাটাডর সবুজ আর ম্যাটাডর গোলাপী। ওরা জমজ। কিন্তু গায়ের রং টা আলাদা।

ব্রাশের জগতে সিস্টেমটাই এমন। ছেলে মানুষের মেয়ে ব্রাশ আর মেয়েদের ছেলে ব্রাশ।

আমার ছেলেদের নাম নিয়ে সেদিন কি হলো শুনুন। রহিম সাহেবের মেয়ে সারিকা সকালে উঠে কি মনে করে থমকে দাঁড়ায়। ব্রাশের নামটা নিয়ে যত ভেজাল। এ নামের অর্থ কী? তার বাবা-মা কেউ জানে না Matador অর্থ। পরে পাশের বাড়ির সেলিম সাহেবের ছোট্ট মেয়েটা হাসতে হাসতে জবাব দিয়ে দেয়, Matador মানে ষাঁড়ের সাথে লড়াই করা যোদ্ধা।

আহা শান্তি। নিজের ছেলের নামের অর্থই জানতাম না এতদিন!

ব্রাশের জীবনকাল নাকি তিনমাস হওয়া উচিত। এ বাসায় হিসেবটা ভিন্ন। আমার স্বামী আর আমার বয়স দেড় বছর। ছেলেদের বয়স ছয় মাস। রহিম সাহেবের মেয়েদের ব্রাশ চেঞ্জ করার সময় এসেছে। ক'দিন ধরেই তাই মনটা খারাপ।

ম্যাটাডর নামটা আসলে রহিম সাহেবের হওয়া উচিত ছিল। কারণ, সে মনে হয় ব্রাশের সাথে যুদ্ধ করে। এজন্যই ট্রিশার ব্রিসেলগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে। ড. ওয়েস্ট এর কপাল ভালো। মিসেস রহিম ব্রাশকে খুব যত্নে রাখে। খাপে ভরে। আর ট্রিশার ছেলেগুলোর কপাল স্মার্ট। তাদেরকে হেলমেট পড়িয়ে রাখা হয়েছে।

ট্রিশার কপালে খালি মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিই বা থাকতে পারে? রহিম সাহেবের যে অযত্ন!

আজ সকাল থেকেই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আছে ট্রিশা। স্বামীর সাথে তুমুল ঝগড়া। কাল রাতে হয়েছে দুর্ঘটনাটা। রাত ২টার দিকে এক মহিলা তেলাপোকা এসে চুপিচুপি ড. ওয়েস্টকে চুমু খেয়ে গেছে। যদিও খাপ ছিল, তাও চুমু তো! এই নিয়ে ঝগড়া। ছেলে দুটো মায়ের পক্ষ নিয়েছে। কিন্তু,  তেলাপোকা নিয়ে কোনো আলাপ নেই!

ট্রিশা হাঁটছে অন্যপথে, “কিসের ডক্টর তুমি! পড়াশোনা তো কোনো ছাতাও জানো না। নিজের ছেলের নামের অর্থ যে বাপ জানে না...চরিত্রহীন কোথাকার!”

পড়াশোনা না জানার সাথে চরিত্রের সম্পর্ক কোথায় তা খুঁজে পায় না ড. ওয়েস্ট। তবে ওসব তর্কে না যেয়ে চুপ থাকে সে।

ব্রাশের শত্রুর কি আর অভাব আছে? টিকটিকি, তেলাপোকা এমনকি সাবান শ্যাম্পু আর তোয়ালেও! ব্যাপারটা হিংসেহিংসির। মানুষের জন্মের কিছুদিন পরপরই সাবান-শ্যাম্পু-তোয়ালের সাথে সখ্য শুরু। এ সম্পর্ক আমরণের। কিন্তু, টুথব্রাশের সাথে সখ্য শুরু দাঁত ওঠার পর। তারপর নতুন দাঁত ওঠার পালাবদলে কিছুটা বিরতি আর বুড়ো বয়সে দন্তহীন হওয়ার পর বিদায়। তাই হিংসে তো একটু হয় ই। আর টিকটিকি আর তেলাপোকার যন্ত্রণা নাই বা বলি। পুরো পরিবারকেই লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে বারবার। তবে, নিজেদের চেয়ে অভাগা শত্রুও আছে টুথব্রাশের। শেভিং রেজর। এদের সম্পর্ক মূলত পরিণত বয়সের পুরুষ মানুষের সাথে। তবে, এরা ধারালো হওয়ায় সবাই সামলে চলে। এমনকি তেলাপোকাও!

ব্রাশদের কি মৃত্যু নেই? অবশ্যই আছে। তবে, ব্রাশদের বেলায় সিস্টেম মানুষের উল্টো। মানুষের দেহ মরে যায়। রুহু বা আত্মা অবিনশ্বর। আর ব্রাশের দেহ রয়ে যায়। মন বা অন্তরাত্মা মরে যায়।

মরে টা কিভাবে? খুব সহজ। আপনি যখন নতুন ব্রাশ কিনে আনেন, স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসেন, তখন ব্রাশের জীবনে ঝড়। এরপর আপনিই মেরে ফেলেন তাকে।কিভাবে?

দাঁত মাজার ব্রাশ দিয়ে জুতা, চিরুনী কিংবা বেসিন পরিস্কার অথবা কমোডের পাশে ফেলে রাখা কি মৃত্যুর চেয়ে কম? এভাবেই প্রতিদিন লাখ লাখ ব্রাশ মনের মৃত্যু মরছে।

মৃত্যুর কথাটা না তুললেই পারতাম! এই তো খানিক আগের কথা। রহিম সাহেবের বাসায় গৃহপরিচারিকা সালেহা করেছে অকাজটি। কাপড় কাচা নিয়ে গৃহকর্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটির শোধ তুলেছে সে। ব্রাশভর্তি গ্লাসটাকে ইচ্ছে করে আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছে। যত্রতত্র বাথরুমের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাশগুলো। পুরো পরিবারের অপমৃত্যু।

মিসেস রহিমের সামনে খুব নিদোর্ষ ভাব নিচ্ছে সালেহা। ওদিকে রহিম সাহেব বাজারের ফর্দে লিখলেন:

ব্রাশ-৪টি।

মৃত্যুর আগে ট্রিশা চেঁচিয়ে বলেছিল, “আমরা দুর্ঘটনায় মরছি না। এই বদমাশ মহিলা আমাদের খুন করছে।কেউ বাঁচাও।”

এই চিৎকার শুনতে পায় নি কেউ। হয়ত এমনি করেই নিভে যায় লাখ-কোটি টুথব্রাশের জীবনের শিখা:

“ব্রাশফায়ার”

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

গল্প: আরও পড়ুন

আরও