ছড়ালো কে?

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ছড়ালো কে?

মনদীপ ঘরাই ৩:২২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮

ছড়ালো কে?

খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই আবীরের। তাও আবার শুক্রবার! সকাল ১১:৩০ এ আড়মোড়া ভেঙ্গে চোখ না খুলতেই সে হাতড়ে চললো মোবাইল। এই মোবাইল খুঁজতে যেয়ে ঘুমটা পুরোপুরি ভাঙ্গে।

ফেসবুক আর মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশনে ঠাসা মোবাইল।

মেসেঞ্জারে ঢুকে দেখলো অফিসের দারোয়ান জহির একটা ছবি পাঠিয়েছে।

ছবিটা একটু কাঁপা হাতে তোলা। ৭-৮ বছরের একটা বাচ্চা। চেহারাটা হাত কেঁপে যাওয়ায় দেখা যাচ্ছে না। তবে, মনটা যে খারাপ হতে পারে তা ধরেই নেয়া যায়। সেলফিটা বিছানার সামনে তোলা। বিছানাটায় শুয়ে আছে সাদা চাদরে মোড়া একজন। বুঝে নিতে কষ্ট হয় না দেহটা নিথর।

আবীরও তাই বুঝে নেয়। ছবির ক্যাপশনে লেখা:

“ Baba slain”

কী ভয়ংকর। তার মানে বাচ্চাটার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। ওহ্। প্যাথেটিক। বাচ্চাটার জন্য কষ্ট হতে লাগলো। কষ্ট লাগলো লোকটার জন্যও। কীনির্মম মৃত্যু!

“আহারে। বাচ্চাটার বাবাকে কে যে মারলো! এত নিষ্ঠুর মানুষ হয়?”

আমি বললাম, “সত্যিই তো। তা এ ছবি পেলেন কোথায়?”

“পেলাম কোথায়? এক মিনিট ভাই।”

দারোয়ান জহিরকে ফোন দেয় আবীর। তাকে কেউ একজন ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়েছে ছবিটা। তবে ব্যক্তিটা কে এ জবাব মেলে না। তারপর কিভাবে কিভাবে যেন শেয়ার দিয়েছে। তবে, জহিরের নাকি মনে হয়েছে ছবিটা সিলেটের হতে পারে। একটা চা বাগানের ‘ভাব’ নাকি টের পেয়েছে সে। এটা কেমন যুক্তি কে জানে!

হঠাৎ ছবির অচেনা বাচ্চাটার জন্য মনটা কেমন জানি অস্থির হয়ে উঠলো। কষ্টের সাগরে ডুবে আবীর লিখে ফেলে ক্যাপশন:

“দেখুন, কত নির্মম পরিণতি সিলেটের এই বাচ্চা ছেলেটির। পরিচয় পেলে জানান।”

একটু অবাকই লাগলো আমার। দারোয়ানের অনুমানের ‘সিলেট আবীরের লেখায়!

লিখেই ক্যাপশনসহ ছবিটা মেসেঞ্জারে একের পর এক শেয়ার করতে লাগলো। ছেলে-বুড়ো, বন্ধু-বান্ধবী কিংবা শত্রু; বাদ গেলো না একজনও। এমনকি অসাবধানতায় দারোয়ান জহিরের কাছেও চলে গেল ছবিটা। জহির সাথে সাথেই ফোন দিয়ে বললো, “ঠিক কয়েসেন, ছার। তাইলে শিওর অইলাম।আসলেই সিলট।”

এবার আবীরেরও একটু বিব্রত লাগলো। ভুল করলো নাকি সে সিলেটের কথা লিখে? যাই হোক, নিজের মধ্যেই চেপে গেল সে। ছবিটার প্রতি মমত্বটাই তো আসল!

খানিক বাদে নোটিফিকেশনের শব্দ। ইনবক্সে ঢুকে অবাক আবীর। সেই ছবিটাই। পাঠিয়েছে আরেকজন। এবারের ক্যাপশন:

দরিদ্র এই শিশুটির বাবা মারা গেছে। দাফনের টাকা নেই। সাহায্য বিকাশ করুন: ০১*********** নাম্বারে।

আবীর ১ হাজার টাকা বিকাশ করে দিল সাথে সাথেই। এমন সময় কি বসে থাকা যায়?

ফেসবুকের নিউজফিডে সেই ছবিটারই জোয়ার। সবাই শেয়ার দিচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাপশনে। একজন লিখেছে: বিষ খাইয়ে হত্যা। কেউ লিখেছে দেনার দায়ে আত্মহত্যা। তবে কমবেশি আবীরের সিলেট কথাটা সব পোস্টেই আছে।

আবীরের মন কাঁদে। সেই সাথে একটা আপডেটও তো জানা দরকার। ফেসবুক ছেড়ে টিভি খোলে সে। টিভির স্ক্রলে দেখাচ্ছে: সিলেটে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে নিজ বাসায় হত্যা।

যাক। ঘটনা তাহলে সত্যি। আর ঘটনাটা নিয়ে কথা বাড়াতে মন চায় না। ছুটির দিনটা প্রায় শেষ। কিছু ব্যক্তিগত কাজ সারা দরকার।

চুল কাটাতে সেলুনে গিয়েও একই আলাপ। কে মারলো? কেন মারলো? রাজনীতি না সন্ত্রাস? নাকি জঙ্গিবাদ?

একই আলাপে ক্লান্ত হয়ে বাসার পথে আবীর।

বাসার নিচে এসে দেখলো পুলিশের গাড়ী। কেউ আজ ধরা খেতে যাচ্ছে। মানুষজন বড় অপরাধপ্রবণ হচ্ছে আজকাল!

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই থেমে গেল আবীরের পা। তার বাসাতেই পুলিশ!!! কাহিনী কী?

ড্রইং রুমে পুলিশের একজন অফিসার বসা। মুখ গম্ভীর।

“আপনি কি আবীর সাহেব? আপনাকে একটু আমাদের সাথে যেতে হবে”

“মানে কি? কী কারণ? আমি একজন ইংরেজির প্রভাষক, ক্রিমিনাল তো নই!”

“আমরা ট্র্যাকিং করে জেনেছি, আজ সকালে আপনার মোবাইল থেকে একটি ছবি শেয়ার করা হয়েছে। ছবিটি নিয়ে নানান গুজব চলছে। সারাদেশে।”

“ওহ! ওই ছবিটা? ওটা তো দারোয়ান জহিরের মোবাইল থেকে এসেছিল। এক্ষনি ডাকছি ওকে।”

“ঠিক আছে ডাকুন।” বলেই ওয়াকিটকিতে মনযোগ দিলেন পুলিশের ওই অফিসার।

কাঁপা গলায় জহিরকে ফোন করে আসতে বললো আবীর।

পুলিশ চড়াও। “বল্ এই ছবি তোকে কে পাঠিয়েছে? সারা দেশ তোলপাড় করে রেখেছিস।”

জহির কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, “স্যার, আমি তো ফেসবুক অতডা বুঝি না। সকাল বেলা কেডা জানি পাডাইসে, আমার পোলায় শেয়ার করা শিখাইসিল, আমি তাই হগ্গলরে শেয়ার দিসি।”

- দেখি তোর মোবাইল দে।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে পুলিশ অফিসার অবাক! আবীরের মোবাইল থেকে ছবিটা গেছে জহিরের মোবাইলে! এ কেমন ভুতুড়ে ঘটনা! আবির তো ঘুমাচ্ছিল। আর এ ছবি আবীর পাবেই বা কই!

আবীর মোবাইলটা হাতে নিয়ে গ্যালারিতে ঢুকে ভয়ে হিম হয়ে যায়। তার ক্যামেরা ফোল্ডারে ছবিটা। এর কী ব্যাখ্যা হতে পারে?

আরো দুটো ছবি ঘাটতেই পানির মতো পরিস্কার হয় ব্যাপারটা।

শুনতে প্রস্তুত তো সবাই?তাহলে খুলেই বলি।

সকাল ৯টা। আবীর তখন গভীর ঘুমে। তার একমাত্র ছেলে আসমান বেশ কয়েকবার ডাকলো বাবাকে। বাইরে ঘুরতে যাবে বাবার সাথে। কিন্তু বাবা উঠছেই না। রাগ আর দুঃখে কয়েকটা ছবি তোলে আসমান। তার বাবা তখন সাদা রঙ্গের চাদর মুড়ি দিয়ে মহাঘুম। ছবি তুলে বাবার ম্যাসেঞ্জারে ঢোকে ছোট্ট আসমান। তারপর লিখতে যায়, Baba sleeps always. bad baba.

কেবল Baba লিখে  sl  লিখতেই অটো সাজেশনে slain চলে আসে আর চাপ লেগে শেয়ার হয়ে যায় জহিরের মোবাইলে। ভয়ে পাঠানো মেসেজটা ডিলিটও করে দেয় আসমান। তবে ততক্ষণে তা পৌঁছে গেছে জহিরের মোবাইলে। বাকিটুকু...ইতিহাস।

আসমান ড্রইংরুমের কোণায় ভয়ে জুবুথুবু হয়ে কেঁদে কেঁদে সবটুকু বলে।

আবীর নির্বিকার। দারোয়ান জহিরের মাথায় ঢুকছে না কিছুই। আর পুলিশ অফিসার হাসানের চোখ দেয়ালে বাঁধাই করে টানানো শেক্সপিয়ারের হেনরি দ্যা ফোর্থ নাটকের একটা সংলাপের দিকে:

“Rumour is a pipe

Blown by surmises....”

একটু দাঁড়ান। surmise শব্দের মানে খুঁজতে ডিকশনারি ঘাঁটতে হবে না। এতক্ষণের গল্পের মূল নায়ক এই ‘surmise’ ই; যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় অনুমান।

সমাজে আবীরদের এমন “অনুমান” আর “হয়তো” এর বৃত্ত থেকেই জন্ম নেয় ভয়ংকর গুজব। চলুন সুচিন্তার অ্যারোসল মেরে কুপোকাত করি গুজবের সব কীট।

লেখক: সহকারী সিনিয়র সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

গল্প: আরও পড়ুন

আরও