পতনের বাজারেও কারসাজি, লাগামহীন ৪ কোম্পানি

ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | 2 0 1

পতনের বাজারেও কারসাজি, লাগামহীন ৪ কোম্পানি

জাহিদ সুজন ৮:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

পতনের বাজারেও কারসাজি, লাগামহীন ৪ কোম্পানি

বিক্রয় চাপ ও দরপতনে হতাশ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু অব্যাহত দরপতনের মধ্যেও লাগামহীন দর বাড়ছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত স্বল্পমূলধনী ৪ কোম্পানির শেয়ার দর। যা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িছে সচেতন বিনিয়োগকারীদের। কারণ, স্বল্পমূলধনী এ কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়মিত কারসাজিতে সক্রিয় থাকে চক্রটি। যার কারণে লোভে পড়ে খেসারত দিতে হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ার সংখ্যা কম হওয়ায় কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর বাড়াতে কারসাচিতে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। যার কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে কোম্পানিগুলোর দর বৃদ্ধিতে। কোম্পানিগুলোর অব্যাহত দর বাড়লেও স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকা চোখে পড়ছে না।

তারা বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতিপূর্বে কোম্পানিগুলোর কারসাজির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কারসাজি চক্রের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে অর্থদণ্ড দিয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা উচিত।

পতনের বাজারেও লাগামহীন দর বাড়ার তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলো হলো- মুন্নু জুট স্টাফলার্স, মুন্নু সিরামিক, ওয়াটা কেমিক্যাল ও স্টাইল ক্রাফট।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্প্রতিক সময়ে ডিভিডেন্ড গুজবে বাজারের স্বল্পমূলধনী ও লোকসানি কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। এনিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা হলেও কোন তদন্ত কমিটি বা কোন কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গত ৩০ কার্যদিবসে মুন্নু জুট স্টাফলার্সের শেয়ার দর ১৮০ শতাংশ বাড়লেও কোম্পানিটির শেয়ার দর বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে মাত্র ১ বার নোটিশ দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মুন্নু সিরামিক, ওয়াটা কেমিক্যাল ও স্টাইল ক্রাফটের শেয়ার দর গত ৩০ কার্যদিবসে ৬০ শতাংশের বেশি বাড়লেও ডিএসই’র পক্ষ থেকে কোন দর বাড়ার নোটিশ প্রদান করা হয়নি।

মুন্নু জুট স্টাফলার্স ও মুন্নু সিরামিক

গত ২২ জুলাই প্রকৌশল খাতের মুন্নু জুট স্টাফলার্সের শেয়ার দর ছিল ৬৮৭.৩ টাকা। যা ৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৭.২ টাকায় স্থিতি পেয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ ৩০ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ১২৩৯.৯ টাকা বা ১৮০.৪ শতাংশ।

২ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনধারী কোম্পানিটির শেয়ার দরের হিসাবে গত ২২ জুলাই বাজার মূলধন ছিল ১৪২ কোটি ২৭ লাখ ১১ হাজার টাকা। কিন্তু সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩৮৫ কোটি ৩৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৩০ কার্যদিবসের ব্যবধানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়েছে ২৪৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

এদিকে, গত ৩০ কার্যদিবসে মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর বেড়েছে ৬০.৮২ শতাংশ। গত ২২ জুলাই সিরামিক খাতের কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ১৩৫.২ টাকা। যা ৯ সেপ্টেম্বর ২১৭.৫ টাকায় স্থিতি পেয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ ৩০ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৮২.২ টাকা।

২০১৭ সালের জুলাইয়ের শেষদিকে মুন্নু জুট স্টাফলার্সের শেয়ার দর ছিল ৪০০ টাকার নিচে এবং মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর ছিল ৪০ টাকার নিচে। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর মুন্নু জুট স্টাফলার্সের দর উঠে ৫৬৩৪ টাকায় এবং ২০১৯ সালের ৩ মার্চ মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর উঠে ৪৪১ টাকায়। ওই সময় অভিযোগ উঠে কোম্পানিটির শেয়ারে কারসাজি হচ্ছে। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে ওই সময় মুন্নু জুট স্টাফলার্স বেশকিছু মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করে। পাশাপাশি শেয়ার দরের সর্বোচ্চ অবস্থানে কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা প্রায় ৮ শতাংশ শেয়ার বিক্রয়ের ঘোষণা দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২২ জুন মুন্নু জুট স্টাফলার্স ও মুন্নু সিরামিকের শেয়ার কারসাজি তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিএসইসি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএসইসির ৬৭৬তম কমিশন সভায় শেয়ার কারসাজি প্রমাণ হওয়ায় কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের তৎতকালীন এভিপি সাইফুল ইসলামকে ৫০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ও হেড অব ইনভেস্টমেন্ট মো. আব্দুল হালিমকে ২৫ লাখ, ব্যাংকটির ভিপি ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে ২৫ লাখ টাকা, বিনিয়োগকারী মো. আলী মনসুরকে ৫০ লাখ টাকা, আবদুল কাউয়ূমকে ৫ লাখ টাকা, মরিয়ম নেছাকে ৫ লাখ টাকা, সাইফ উল্লাহকে ১০ লাখ টাকা, মো. আব্দুস সেলিমকে ৫ লাখ ও মো. জিয়াউল করিমকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে।

এছাড়া, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোস্তফা হেলাল কবীরকে ১০ লাখ টাকা, তার স্ত্রী ফউজিয়া ইয়াসমিনকে ১০ লাখ টাকা ও বিনিয়োগকারী কাজি মো. শাহাদাত হোসেনকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি। একই ইস্যুতে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক ইমাদ উদ্দিন আহমেদ প্রিন্স, সহকারী মহাব্যবস্থাপক তাইজুদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার সৈয়দ মো. আকবরসহ তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী হাফেজা খাতুন, মবিউর রহমান সরকার ও অহনা কন্সট্রাকশনকে সতর্কপত্র ইস্যু করে।

স্টাইল ক্রাফট

বস্ত্র খাতের স্টাইল ক্রাফটের শেয়ার দর সর্বশেষ ৩০ কার্যদিবসে বেড়েছে ৮৫.৪৪ শতাংশ। গত ২২ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৪৮২.৩ টাকা। যা ৯ সেপ্টেম্বর ৮৯৫.৪ টাকায় স্থিতি পেয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ ৩০ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৪১৩.১ টাকা ।

স্বল্পমূলধনী কোম্পানিটির শেয়ার দরের হিসাবে গত ২২ জুলাই বাজার মূলধন ছিল ২৪৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। কিন্তু সোমবার (০৯ সেপ্টেম্বর) শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪৪৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩০ কার্যদিবসের ব্যবধানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়েছে ২০৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

ওয়াটা কেমিক্যাল

গত ২২ জুলাই ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওয়াটা কেমিক্যালের শেয়ার দর ছিল ৪০৫.২ টাকা। যা ৯ সেপ্টেম্বর ৬৫৩.৬ টাকায় স্থিতি পেয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ ৩০ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ২৪৮.৪ টাকা বা ৬১.৬ শতাংশ।

স্বল্পমূলধনী কোম্পানিটির শেয়ার দরের হিসাবে গত ২২ জুলাই বাজার মূলধন ছিল ৪৮০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কিন্তু সোমবার (০৯ সেপ্টেম্বর) শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭২৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩০ কার্যদিবসের ব্যবধানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়েছে ২৪৩ কোটি ০৯ লাখ টাকা।

১৯৯২ সালে পুঁজিবাজারে আসা ওয়াটা কেমিক্যালসের অনুমোদিত মূলধন ১৫ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ১১ কোটি ৮৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬টি। কোম্পানির মোট শেয়ারের ৩৬ দশমিক ৪১ শতাংশ মালিকানা রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ ও বাকি ২৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

জেডএস/এসবি

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও