উদ্যোক্তাদের ৪৫.২৩% শেয়ার বিক্রি করেছে পিপলস লিজিং

ঢাকা, ১৬ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

উদ্যোক্তাদের ৪৫.২৩% শেয়ার বিক্রি করেছে পিপলস লিজিং

জাহিদ সুজন ৪:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০১৯

উদ্যোক্তাদের ৪৫.২৩% শেয়ার বিক্রি করেছে পিপলস লিজিং

নগদ টাকা সংকটে ও দেনার দায়ে বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) উদ্যোক্তা-পরিচালকরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের হাতে থাকা শেয়ারের ৪৫.২৩ শতাংশ বিক্রি করে দিয়েছে।

এদিকে, বিগত ১৫ মাসে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ৬.৬৭ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করলেও স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার বিক্রির কোনো ঘোষণা দেয় নি। যা সিকিউরিটিজ আইন পরিপন্থী।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ব্যবসায়িক দুরবস্থায় ও খেলাপি ঋণের কারণে নগদ অর্থ সংকটে ভুগছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ও দেশের আর্থিক খাতের আওতাভুক্ত পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২(৩) এবং ২৯ ধারায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর মতামত চাওয়া হয়। এতে সম্মতি দিয়ে অর্থমন্ত্রী গত ২৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দেন।

ওই চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিতে আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ, অনিয়মের ধরন, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ও মাসিক বেতন-ভাতার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, পিপলস লিজিংয়ে মোট আমানত রয়েছে ২ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। তবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার মতো কোনো নগদ টাকা প্রতিষ্ঠানটির হাতে নেই।

পিপলস লিজিংয়ে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি দেখানো হয়েছে ৭৪৮ কোটি টাকা, যা ৬৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এর মোট শেয়ারের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই রয়েছে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে।

বাকি শেয়ারের মধ্যে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩১ ডিসেম্বর ২০১১ শেষে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৪২.৪৩ শতাংশ শেয়ার ছিল। কিন্তু ৩১ মে ২০১৯ শেষে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে মাত্র ২৩.২১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ বিগত ৮ বছরের কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ারের ৪৫.২৩ শতাংশ বিক্রি করে দিয়েছে।

এদিকে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ শেষে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ২৯.৮৮ শতাংশ শেয়ার ছিল। কিন্তু পরবর্তী দেড় বছরে (৩১ মে ২০১৯) কোম্পানিটি ৬.৬৭ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। এসময় কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা শেয়ার বিক্রির কোনো ঘোষণা দেয় নি।

সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালকদের কোম্পানির সর্বমোট শেয়ারের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের আগে ঘোষণা দিতে হবে।

২০১৪ সালের পর থেকে ডিভিডেন্ড দেয় নি পিপলস লিজিং

ব্যবসায়িক দুরবস্থায় ২০১৪ সালের পর থেকে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারে নি পিপলস লিজিং। এরই ধারাবাহিকতায় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হয় কোম্পানিটি। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির লোকসান হয়েছিল ৮৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এদিকে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে কোম্পানিটির কর পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ৫.৫২ টাকা। শেয়ার সংখ্যার হিসাবে এ সময় কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ১৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

পিপলস লিজিংয়ের প্রতি শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের দায় ৬৫.৫৯ টাকা

বিনিয়োগকারীরাই কোম্পানির মালিক। তাই মুনাফা করলে যেভাবে ডিভিডেন্ড পায় ঠিক একইভাবে লোকসান করলে দায়ও যায় বিনিয়োগকারীদের কাঁধে। ২০১৫ সালের পর থেকে ব্যবসায়িক দুরবস্থায় থাকা ও খেলাপি ঋণের নিচে চাপা পড়া পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার প্রতি দায় ৬৫.৫৯ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির প্রতি শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের দায় ৬৫.৫৯ টাকা।

১০ টাকার শেয়ার .৩০ টাকায় কিনছে না বিনিয়োগকারীরা

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের প্রত্যেকটি শেয়ারের ফেসভ্যালু বা অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। কিন্তু ব্যবসায়িক মন্দায় বিগত ১ বছরেও কোম্পানিটির শেয়ার ১০ টাকায় পৌঁছাতে পারে নি।

‘জেড’ ক্যাটাগরির তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির শেয়ার টানা দর পতনে বর্তমানে ৩.৩০ টাকায় অবস্থান করছে। বিগত ২ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ১৮.৩৩ শতাংশ।

বুধবার দিনশেষে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ৮.৩৩ শতাংশ বা ০.৩ টাকা। এদিন কোম্পানিটির শেয়ারে বিক্রেতা থাকলেও ক্রেতা সংকট ছিল লক্ষণীয়। দিনশেষে কোম্পানিটির ৭৩ হাজার ৮৬৩টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, লোকসানি ও দেনার দায়ে ডুবতে থাকা কোম্পানিতে অর্থাৎ ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিতে বিনিয়োগের আগে সর্তক থাকতে হবে। কারণ এ ধরনের কোম্পানির কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

জেডএস/এইচআর

 

শেয়ারবাজার: আরও পড়ুন

আরও