কোম্পানি ছাড়ছে অলিম্পিক এক্সেসরিজের পরিচালকরা!

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

কোম্পানি ছাড়ছে অলিম্পিক এক্সেসরিজের পরিচালকরা!

জাহিদ সুজন ৪:৩৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৫, ২০১৯

কোম্পানি ছাড়ছে অলিম্পিক এক্সেসরিজের পরিচালকরা!

মুনাফার উল্লম্ফন দেখিয়ে ২০১৫ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় অলিম্পিক এক্সেসরিজ। তালিকাভুক্তির ৪ বছরের ব্যবধানে খোলস থেকে বের হয়ে আসছে কোম্পানিটি। ব্যবসায়িক মন্দায় মুনাফা কমছে কোম্পানিটির। তাই কোম্পানিটি ছাড়ছে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা-পরিচালকরাও।

কোম্পানিটির ব্যবসায়িক দুরবস্থার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন ২ সদস্য। পদ ছাড়া পরিচালকদের মধ্যে রয়েছে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ফরিদা আক্তার ও বে-পলি অ্যান্ড প্যাকিং লিমিটেড (নমিনি পরিচালক গোলাম মাওলা মজুমদার)। যাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কোম্পানিটির ৯.৯৫ শতাংশ শেয়ার।

পরিবর্তন ডটকমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিটির একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া। তাই, স্বরচিত নাটকের অংশ হিসাবে প্রতিষ্ঠান থেকে অব্যাহতি নিয়েছে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ফরিদা আক্তার ও বে-পলি অ্যান্ড প্যাকিং লিমিটেড। মূলত শেয়ার বিক্রয় করে অর্থ সংগ্রহ করাই তাদের উদ্দেশ্যে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অলিম্পিক এক্সেসরিজের চেয়ারম্যান ফরিদা আক্তার প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী। পর্ষদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ায় বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির উদ্যোক্তাদের শেয়ার হোল্ডিং ২০.৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

এদিকে, বে-পলি অ্যান্ড প্যাকিং লিমিটেডও গোলাম কিবরিয়ার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানটির নমিনি ডিরেক্টর ছিলেন গোলাম মাওলা মজুমদার। গোলাম মাওলা মজুমদার ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়ার ভাই। তাদের বাবার নাম সৈয়দ আহমেদ মজুমদার।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৫ জুন দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু করে অলিম্পিক এক্সেসরিজ লিমিটেড। ওই সময় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিল ৫ জন। এর মধ্যে ফরিদা আক্তার চেয়ারম্যান, যার নিয়ন্ত্রণে ছিল ৫.১৩ শতাংশ শেয়ার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়ার নিকট ছিল ৮.৫৫ শতাংশ শেয়ার।

এছাড়া নাভানা পলি প্যাকিং লিমিটেডের নিকট ছিল ৮.৫৫ শতাংশ শেয়ার। এ প্রতিষ্ঠানটির নমিনি ডিরেক্টর ছিলেন গোলাম কিবরিয়ার ভাই গোলাম সরোয়ার। বে-পলি অ্যান্ড প্যাকিং লিমিটেডের নিকট ৪.২৮ শতাংশ শেয়ার ছিল। যার নমিনি ডিরেক্টর ছিলেন গোলাম মাওলা মজুমদার, গোলাম মাওলা মজুমদারও গোলাম কিবরিয়ার ভাই।

রিভারসাইড অ্যাপারেলস লিমিটেড অলিম্পিক এক্সেসরিজের ৪.২৮ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার ছিল। এ প্রতিষ্ঠানটির নমিনি ডিরেক্টর ছিলেন রিপাত বিন কিবরিয়া। যিনি গোলাম কিবরিয়ার ছেলে।

ওই সময় কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের নিকট সম্মিলিতভাবে ৩০.৭৯ শতাংশ শেয়ার ছিল। কিন্তু ৪ বছরের ব্যবধানে তা ৩১ মে ২০১৯ শেষে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ২০.৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিগত ৪ বছরে উদ্যোক্তা পরিচালকরা ১০.১১ শতাংশ শেয়ার বিক্রয় করে দিয়েছে।

২০১৭ সালের ৩ মার্চ ঘোষণা দিয়ে ৯ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার বিক্রয় করেছে নাভানা পলি প্যাকিং কোম্পানি ও রিভারসাইড অ্যাপারেলস লিমিটেড। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার বিক্রয় করেছে নাভানা পলি প্যাকিং লিমিটেড, আর ৩ লাখ ৫০ হাজার বিক্রয় করেছে রিভারসাইড অ্যাপারেলস লিমিটেড। বাদবাকি ৯.৯৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রয়ের ঘোষণা দেয়নি প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা পরিচালকরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, ৩০ জুন ২০১৮ সমাপ্ত অর্থবছর শেষে অলিম্পিক এক্সেসরিজের উদ্যোক্তা/পরিচালকদের নিকট ২৫.৮১ শতাংশ শেয়ার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিকট ১৯.৪২ শতাংশ শেয়ার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিকট ৫৪.৭৭ শতাংশ শেয়ার ছিল।

কিন্তু ৩১ মার্চ ২০১৯ শেষে উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ার স্থিতি ২০.৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের পরিমাণ বেড়ে যথাক্রমে ২০.১৫ শতাংশ ও ৫৯.১৭ শতাংশে স্থিতি পেয়েছে।

বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের নিজ কোম্পানির ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। এর কম হলে উদ্যোক্তা পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি বা স্থানান্তর করতে পারবেন না।

লিস্টিং রেগুলেশন ২০১৫ অনুযায়ী, উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা নিজ কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে চাইলে স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসিকে লিখিতভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে অলিম্পিক এক্সেসরিজের ওই দুই পরিচালক নিজেদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রির সময় ডিএসইকে কিছুই জানাননি।

৩০ জুন ২০১৮ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সমাপ্ত বছর শেষে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ শেষে কোম্পানিটির পরিচলনা পর্ষদে ছিল গোলাম কিবরিয়া, ফরিদা আক্তার, নাভানা পলি প্যাকিং ও রিভারসাইড অ্যাপারেলস লিমিটেড। যার ২০১৬-১৭ সালেও পরিচালনা পর্ষদে ছিল। কিন্তু এর আগেই বে-পলি অ্যান্ড প্যাকিং লিমিটেড পরিচালনা পর্ষদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছিল। এদিকে, ২০১৮-১৯ সালের পর্ষদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছে ফরিদা আক্তার।

এ প্রসঙ্গে কোম্পানিটির সচিব মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, সদ্য সমাপ্ত বছরের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) পরিচালনা পর্ষদ থেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে অব্যাহতি নিয়েছে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ফরিদা আক্তার। তাই ৩১ মে ২০১৯ শেষে পরিচালকদের শেয়ারধারণে পরিমাণ কমেছে।

ফরিদা আক্তার কি কারণে পদত্যাগ করেছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পর্ষদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছে।

ফরিদা আক্তাদের শেয়ার বিক্রয় হয়েছে কি-না জানতে চাইলে হাবিবুল্লাহ বলেন, বোর্ড থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর উনি শেয়ার বিক্রয় করেছেন কি-না তা আমাদের জানা নাই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ঘোষণা ছাড়া যদি পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করে তা সিকিউরিটিজ আইনের লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে বিএসইসির অ্যানফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অলিম্পিক এক্সেসরিজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

জেডএস/এসবি