পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বেহাল দশা!

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বেহাল দশা!

জাহিদ সুজন ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০১৮

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বেহাল দশা!

শিল্প খাতের বিকাশে পুঁজিবাজারকে অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসাবে ব্যবহার করেছে উন্নত বিশ্ব। এতে করে শিল্প খাতের সম্প্রসারণের সাথে সাথে বিনিয়োগকারীদেরও পুঁজির বিকাশ হয়। কিন্তু উল্টো চিত্র বাংলাদেশ পুঁজিবাজারে।

২০১৩ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে যেসকল কোম্পানি অর্থ উত্তোলন করেছে তাদের অধিকাংশের ব্যবসায়িক মুনাফা বাড়লেও নিম্নমুখী রয়েছে শেয়ার দর। এতে করে শিল্প খাতের বিকাশ হলেও বেহাল দশা এখাতের বিনিয়োগকারীদের। বিশেষ করে সেকেন্ডারি মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতে শুধু মূলধারার আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১৭৯৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে। একই সময় আইপিও’র মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে মাত্র ৪৯ কোটি ৯১ লাখ ডলার সংগ্রহীত হয়েছে।

অন্যদিকে, শুধু ২০১৭ সালে ভারতে আইপিও’র মাধ্যমে ১১৬ কোটি ডলার বা ৭৫ হাজার ৫০০ কোটি রুপি সংগ্রহিত হয়েছে। একই সময় ব্যাংক থেকে ঋণ ও অগ্রিম ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০০ কোটি রুপি সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৭ সালে ভারতে মূলধনের ২৫ শতাংশ জোগান দিয়েছে পুঁজিবাজার।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালে বিভিন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেছে। কিন্তু একই সময় ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ ও অগ্রীম গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এসময় পুঁজিবাজার থেকে মাত্র ৩ শতাংশ মূলধনের জোগান দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইপিওতে দেশীয় পুঁজিবাজারে অর্থ সংগ্রহ ও অনুমোদনের প্রবণতা কমেছে। কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের উচ্চ মূল্যের শেয়ার কেনার প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে করে বিনিয়োগকারীরা মূলধন হারানোর পাশাপাশি বাজারে আস্থা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিবর্তন ডটকমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাজারে ৬২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি কোম্পানি বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত হয়েছে। বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭টির শেয়ার দর ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। এছাড়া বস্ত্র খাতে লেনদেন শুরু করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের শেয়ার দর প্রথম দিনের মূল্যের নিচে অবস্থান করছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ৮ মার্চ পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করে বস্ত্র খাতের শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ। লেনদেন শুরুর প্রথম কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার বেড়েছিল ৪৩১ শতাংশ। ওদিন কোম্পানিটির শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ৫৩.১ টাকা। এর পর ৯ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ার দর ৫৫.৪ টাকায় স্থিতি পেলেও এর পর থেকে অব্যাহত দর পতনে মঙ্গলবার দিনশেষে কোম্পানিটির ২৫.১০ টাকায় স্থিতি পেয়েছে। যা কোম্পানিটির সর্বনিম্ন দরের কাছাকাছি।

২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করেছিল ফ্যামিলিটেক্স। বড়মূলধনী ও মুনাফার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকায় প্রথম কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছিল ৩৮৫ শতাংশ। ওইদিন কোম্পানিটির কোম্পানিটির সর্বোচ্চ দর ছিল ৪৮.৫ টাকা। সোমবার দিনশেষে কোম্পানিটির শেয়ার ৭ টাকায় লেনদেন হতে দেখা গেছে। যা ইস্যু মূল্য বা ১০ টাকা থেকে ৩০ শতাংশ কম।

এছাড়া মুজাফ্ফর হোসেন স্পিনিংয়ের প্রথম কার্যদিবসে দর বেড়েছিল ৩৫৩ শতাংশ, সোমবার (১২ মার্চ) দিনশেষে দর ছিল ১৫.৭ টাকা। হা-ওয়েল টেক্সটাইলের দর বেড়েছিল ৩৪১ শতাংশ, সোমবার দিনশেষে দর ছিল ৩৮.৯ টাকা। প্যাসিফিক ডেনিমসের দর বেড়েছিল ১৭০ শতাংশ, সোমবার দিনশেষে কোম্পানিটির দর ছিল ১৬ টাকা।

অনুসন্ধানে আরো দেখা যায়, ২০১৩ সালের পর বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে তুংহাই নিটিং, ইভেন্স টেক্সটাইল, সিএনএ টেক্সটাইল, নূরানী ডাইং, ফার ইস্ট নিটিং, হামিদ ফেব্রিকস, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, মতিন স্পিনিং ও রিজেন্ট টেক্সটাইলের বর্তমান দর লেনদেন শুরুর প্রথম কার্যদিবসের তুলনায় নিচে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, আইপিও’র সময় কোম্পানির মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে। পাশাপাশি লেনদেন শুরুর পর লোভ সামলাতে না পারায় বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি শেয়ারের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। তাই সেই সময় পর্যন্ত ছোট বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা করা উচিত। নতুবা বড় বিনিয়োগকারী ও কারসাজি চক্রের সক্রিয়তায় পুঁজি হারাতে হবে।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ.কে.এম মিজান-উর রশীদ চৌধুরী বলেন, আমরা বারংবারই নতুন করে আইপিও অনুমোদনের বিপক্ষে রয়েছি। কেননা, বর্তমান আইপিও প্রক্রিয়া অস্বচ্চ।

তিনি বলেন, আইপিও হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের নিঃশ্ব করার ফাঁদ। এখন পর্যন্ত যতগুলো কোম্পানি আইপিও পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করেছে তার সিংহভাগের শেয়ার দর প্রথমদিনের দরে আর ফিরে যেতে পারেনি। অর্থাৎ প্রথম দিনেই যারা বিনিয়োগ করছে তারা লোকসানেই শেয়ার বিক্রয় করে বাজার থেকে বের হচ্ছে।

জেডএস/এসবি