নিজেকে আড়ালে রেখে সব কৃতিত্ব মেয়েদেরই দিলেন ‘গুরু’ ছোটন

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৫

নিজেকে আড়ালে রেখে সব কৃতিত্ব মেয়েদেরই দিলেন ‘গুরু’ ছোটন

তোফায়েল আহমেদ ১২:২১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০২, ২০১৮

print
নিজেকে আড়ালে রেখে সব কৃতিত্ব মেয়েদেরই দিলেন ‘গুরু’ ছোটন

দেশের ফুটবলে নানা হাহাকারের মাঝে নারী ফুটবলাররা সাফল্য পেয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত। একে একে ভেঙে চলেছেন উপরে ওঠার সিঁড়ি। ফেলে আসা বছরেই যেমন এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের মূল পর্বে খেলে এসেছে বাংলাদেশ। শিরোপা জিতেছে অনূর্ধ্ব-১৫ বালিকা সাফের। অথচ দেশে নারী ফুটবলের চর্চা শুরুর এক যুগও পেরোয়নি এখনো। মেয়েদের ধারাবাহিক সাফল্যের অন্যতম কারিগর গোলাম রব্বানী ছোটন। গত কয়েক বছরে সাফল্য পাওয়া সব নারী দলেরই কোচ তিনি। নতুন বছরের শুরুতেই সেই তিনি মুখোমুখি হলেন পরিবর্তন ডটকমের। তোফায়েল আহমেদকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন অতীতের সাফল্যের মন্ত্র ও আগামীর পরিকল্পনার কথা। আর নিজেকে আড়াল করে আদর্শ গুরুর মতো সব সাফল্যের কৃতিত্ব দিলেন মেয়েদেরই।

প্রশ্ন : ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েরা আরেকটি সফল বছর শেষ করে নতুন বছরে পা রাখল। ফেলে আসা বছরের মূল্যায়ন দিয়েই শুরু করা যাক।

গোলাম রব্বানী ছোটন : ২০১৫ সাল থেকেই কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েদের অর্জন শুরু হয়েছে। সেবছর নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে আমরা শিরোপা জিতি। সেখান থেকেই আমাদের শুরু। এরপর ২০১৬ সালে তাজিকিস্তানে একই টুর্নামেন্টে আমরা শিরোপা পেলাম। ঠিক তখন ফেডারেশন উপলব্ধি করলো মেয়েরা যখন দেশের বাইরে গিয়ে সাফল্য পাচ্ছে তখন দেশের মাটিতে একটা খেলা আয়োজন করা যাক। সেই চিন্তা থেকেই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের বাছাই পর্বের স্বাগতিক হয় বাংলাদেশ। ৬টি দেশের বাছাইয়ে আমরা একচেটিয়া খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূল পর্বে চলে যাই।

এরপর মেয়েদের মূল জাতীয় দলের সাফ ফুটবল হলো ভারতে। এর আগে সেমি ফাইনালে খেলাই ছিল আমাদের সেরা সাফল্য। সেখানে আমরা প্রথমবারের মতো রানার্স আপ হলাম। জাতীয় দল হলেও আমাদের বেশিরভাগই অনূর্ধ্ব-১৬ দলের খেলোয়াড় ছিল। আর ভারতের মেয়েরা অনেক বয়েজ্যেষ্ঠ ছিল। সদ্য শেষ হওয়া বছরে থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের মূল পর্ব আমাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। সবার সংশয় ছিল আমরা কেমন করি। সেখানে আমরা বড় বড় দলের সঙ্গে লড়াই করেছি। এরপর সাফে অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলের শিরোপা জিতে ২০১৭ সাল শেষ করলাম। সব মিলিয়ে আমি বলবো, ২০১৫ সালে থেকে ২০১৭ আমাদের নারী ফুটবলের জন্য দারুণ সময় গেছে এবং আমাদের মেয়েরা দেশবাসীকে ভালো কিছু দিতে পেরেছে।

প্রশ্ন : এর মধ্যে নিশ্চয়ই ২০১৮ সালের মিশনগুলো নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা করে ফেলেছেন। এবছর কি কি মিশন আপনাদের? কি লক্ষ্যই বা ঠিক করলেন?

ছোটন : ২০১৮ সালে আমাদের অনেকগুলো খেলা। বয়সভিত্তিক দুটি এবং সিনিয়র সাফ (জাতীয় দল) রয়েছে। এএফসির দুটি কোয়ালিফাইং রাউন্ড আছে। আবার জাতীয় দলের ফুটসাল আছে। হংকংয়ে অনূর্ধ্ব-১৫ দলের বাছাই আছে। সব মিলিয়ে ব্যস্ত শিডিউল। আমাদের মেয়েরা অনেক দিন ধরেই ক্যাম্পে আছে। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফের পর সবাইকে ১০ দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। ওরা এখন বাড়িতে ছুটি কাটাচ্ছে। ছুটি শেষে ১০ জানুয়ারি সবাই ক্যাম্পে যোগ দেবে। আগে যে কাজগুলো হয়েছে সেগুলোই ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে।

প্রশ্ন : প্রত্যেকটা মিশন যখন আসে সবগুলোতেই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ থাকে। ২০১৬ সফলভাবে শেষ করার পর ২০১৭ যখন এলো তখনও নতুন চ্যালেঞ্জ ছিল। সেটিও আপনারা ভালোভাবে পার করলেন। তো সেই চ্যালেঞ্জগুলো জয় করা সম্ভব হলো কিভাবে?

ছোটন : ২০১৫ সালের কথাটাই আগে বলি। নেপালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে আমাদের মেয়েরা জানবাজি রেখে খেলেছে এবং জয় লাভ করেছে। তার পরেরটা (তাজিকিস্তানে) আমার কাছে একটু বেশি চ্যালেঞ্জ ছিল। ওই সময় ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচন ছিল। সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সবকিছু জয় করেই মেয়েরা টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জয় করে। দেশের মাটিতে অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে কোয়ালিফাই করতে পারবো কি পারবো না, সেটা নিয়ে বেশি চিন্তা ছিল না। লক্ষ্য ছিল ভালো খেলা উপহার দেওয়া। আমরা সেটা করেছি এবং থাইল্যান্ডে সুপার এইটে এশিয়ার সেরা দেশগুলোর সঙ্গে খেলে এসেছি। সেবার শিরোপা জয়ের পর তো আমাদের এক বছরের ক্যাম্প হলো। গোলকিপার কোচ, ফিটনেস ট্রেনার দেওয়া হলো। আমাদের মেয়েরাও খেলেছে দারুণ। থাইল্যান্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তো জিততে জিততে হেরেছি আমরা। আর সদ্য শেষ হওয়া টুর্নামেন্টে আমরা শিরোপার লক্ষ্য নিয়েই খেলেছি। এবারই প্রথম আমরা ট্রফি জেতার প্রতিশ্রুতি দেই। এর আগে ভালো খেলার কথা বলেছি কিন্তু ট্রফি জয়ের কথা আগে থেকে কখনো বলিনি। এই যে আত্মবিশ্বাস তার মূলে মেয়েদের শেষ দুই বছরের কঠোর অনুশীলন। আমরাও যারা কোচিং স্টাফ আছি তারা শুধু খেলাকেই ফোকাস করেছি। চ্যালেঞ্জ জয়ে এগুলোই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।

প্রশ্ন : আসছে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের মেয়েদের খেলার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এমন হলে এটিই তো হবে মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বড় আসর?

ছোটন : এশিয়ান গেমসটা হবে আমাদের মেয়েদের জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের। এখানে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে মেয়েদের খেলতে পারাটাই হবে বড় অর্জন। এতোদিন দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল আমাদের মেয়েদের। কিন্তু এখানে পুরো এশিয়ার শীর্ষ দলগুলো খেলবে। ওখানে মেয়েরা নিজেদের যাচাই করতে পারবে। এই আসরে জাপানও আমাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে। তাই সত্যিই শেষ পর্যন্ত এশিয়াডে ফুটবল হলে সেটি হবে বড় পাওয়া।

প্রশ্ন : আপনি ২০০৮ সাল থেকেই মেয়েদের দলের সঙ্গে আছেন। নারী ফুটবলের উন্নতির জন্য কোথায় আরো বেশি নজর দেওয়া দরকার সেটি আপনার ভালোভাবে জানা...।

ছোটন : যখন প্রথম দায়িত্ব পেলাম সেই সময় আর এখনকার সময়ে অনেক তফাত। শুরুর সেই সময় আমরা মেয়েদের কৌশল নিয়ে কোন কাজ করিনি। ফিজিক্যাল কিছুটা কাজ হয়েছে। আর এখন যে মেয়েরা আসছে তাদের আমরা সবকিছু নিয়েই কাজ করাচ্ছি। আমাদের মেয়েদের এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের শারীরিক অনুশীলন হচ্ছে। আধুনিক ফুটবলে যা কিছু করা দরকার ধারাবাহিকভাবে সবই যোগ হচ্ছে। আমাদের জাতীয় দলের বেশির ভাগ মেয়েই অনূর্ধ্ব-১৬ বয়সের। ওদের হাতে সময় আছে অনেক। উন্নতি করার তো আসলে শেষ নেই। প্রতিনিয়ত কাজ চলছেও। নিয়মিত ট্রেনিং হচ্ছে। এবারের অনূর্ধ্ব-১৫ সাফের দিকে যদি তাকাই তবে দেখবো ফিনিশিংয়ে আমাদের বেশ সমস্যা ছিল। আমরা মোট ১৩ গোল করেছি। সেখানে ২৬ গোল হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। তাই সেই জায়গায় আমাদের কাজ করার আছে।

প্রশ্ন : মেয়েরা উঠে আসছে তৃণমূল থেকে। তাই তৃণমূলে ভালো মানের কোচিং বিস্তৃতি করাটাও তো জরুরি।

ছোটন : এ বিষয় নিয়ে ফুটবল ফেডারেশন কাজ করছে। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্কলি আসার পর এর মধ্যে পাঁচটি ‘সি’ লাইসেন্স কোর্স হয়েছে। আমি দেখেছি যারা মহিলা ফুটবলের সঙ্গে জড়িত তারাও এসেছে কোচিং করার জন্য। আমি মনে করি এটাও ভালো দিক। ভবিষ্যতেও মহিলা ফুটবল নিয়ে যারা কাজ করেন তারা আসবেন। ‘সি’ লাইসেন্স, ‘বি’ লাইসেন্স, ‘এ’ লাইসেন্স করবেন। আমাদের মেয়েদের ফুটবলের উন্নতিকে তা দ্রুতগামী করবে। কোচিং আসলে সবাই করায়। তবে কিছুটা ফারাক আসলে রয়েই গেছে। তৃণমূলে শিক্ষিত কোচের তাই খুব বেশি প্রয়োজন।

প্রশ্ন : আপনার হাত ধরে ধারাবাহিকভাবে সফল বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল। কোচ হিসেবেও যা বড় তারকাই বানিয়ে দিয়েছে আপনাকে। বিয়ষটি নিশ্চিয়ই উপভোগ করেন আপনি?

ছোটন : আমি এভাবে আসলে ভাবি না। আমার ছোটবেলা থেকেই একজন মানুষ হিসেবে স্বভাব হলো, যে কাজটি করি সেটি নিয়েই শুধু ভাবি। মনযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করি। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিষয়টি হলো আমি নিজে নিজেকে মূল্যায়ন করি, মনিটরিং করি। আমি সেভাবে তাই ভাবি না। কাজ করছি আপনারাই সেটার মূল্যায়ন করবেন। মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে আমি মনে করি আপনারা আমার কাজের প্রেরণাটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আমি আগে যা ছিলাম এখনো তাই আছি। আর এখানে সবার কৃতিত্ব। আমার একার কিছু নয়। আমাদের উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যানের (মাহফুজা আক্তার কিরণ) ভূমিকাটা অনেক বড়। সভাপতি (বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন) সাহেবের কথা না বললেই নয়। লিটু, অনন্যা, সাবিনা- আমরা কোচিং স্টাফ যারা আছি সবাই অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু টিমটাকে নিয়েই পড়ে ছিলাম। আর সবচেয়ে বড় ধন্যবাদ দিতে হবে আমাদের মেয়েদেরকে। তারা এতো ছোট বয়সে বাবা-মা সবকিছু রেখে ঢাকায় থাকছে, তিনবেলা ট্রেনিং করেছে, একই সঙ্গে পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাচ্ছে। এতো ব্যস্ততার মধ্যে তারা পরীক্ষায়ও অংশ নিয়েছে। তারা পরীক্ষায় পাশও করেছে, খেলায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। সবকিছুই করেছে। আসলে তাদের মানসিক শক্তি যে অনেক, এটিই তার প্রমাণ।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি মেয়েদের কোচ এটা নিয়ে নাকি একসময় টিপ্পনীও শুনতে হতো?

ছোটন : এটা হতো। তবে আমি ওসব নিয়ে কখনো কিছু মনে করিনি। সবচেয়ে বড় কথা আমাকে ফেডারেশন যে দায়িত্ব দিয়েছে আমি সেটাই পালন করে যাচ্ছি। এর আগে ছেলেদের সিনিয়র জাতীয় দলেরও সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ওখানে যেভাবে কাজ করেছি এখানেও সেভাবে কাজ করছি।

প্রশ্ন : কিন্তু কাজের পেছনে ছুটে ছুটে বিয়েটাও তো করলেন অনেক দেরিতে...।

ছোটন : আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল বিয়েটা আমি করবো না। ভাই-বোনদের চাপে ২০১৪ সালে সেটা করতে হয়েছে। এক শুক্রবার জামালপুরে পাত্রী দেখতে গিয়ে বিয়ে করে ফেললাম। কিন্তু আমার চিন্তায় ছিল না যে ওটা বিয়ের রাত। বরং আমার চিন্তা ছিল শনিবার (পরের দিন) প্র্যাকটিস আছে। আমার জন্য মেয়েরা বসে থাকবে। রাতেই তাই ঢাকায় ফিরি। সকালে বাফুফে ভবনে পৌঁছলে সবাই আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করে। তবে আমার সাফল্যগুলো এক অর্থে বিয়ের পরই শুরু হয়েছে। ১৯৯৩ সালে থেকে আমি কোচিং করি। কিন্তু এতো এতা ট্রফি, অ্যাওয়ার্ড সবই জয় করেছি ২০১৪ এর পর। কোচিং করানোর ক্ষেত্রে আমার স্ত্রীই এখন বড় একটা সাপোর্ট।

টিএআর/ক্যাট

 
.



আলোচিত সংবাদ