রোহিঙ্গা গ্রাম মুছে রাখাইনে সরকারি অফিস, পুলিশ ব্যারাক

ঢাকা, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | 2 0 1

রোহিঙ্গা গ্রাম মুছে রাখাইনে সরকারি অফিস, পুলিশ ব্যারাক

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:০৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

রোহিঙ্গা গ্রাম মুছে রাখাইনে সরকারি অফিস, পুলিশ ব্যারাক

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পুরো গ্রাম গুড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুলিশের ব্যারাক, সরকারি ভবন এবং শরণার্থী পুনর্বাসন শিবির।

মিয়ানমার সরকারের আয়োজিত এক সফরে গিয়ে বিবিসি অন্তত চারটি স্থান খুঁজে পেয়েছে, যেখানে সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। অথচ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলো আগে ছিল রোহিঙ্গা মুসলিমদের বসতি।

তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রামে এসব স্থাপনা তৈরির অভিযোগ নাকচ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

২০১৭ সালের আগস্টে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ একে জাতিগত নির্মূল কর্মকাণ্ডের ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে শুরু থেকেই নিজেদের বাহিনীর হাতে বড় মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নাকচ করে আসছে মিয়ানমার।

তবে এক পর্যায়ে কিছু পরিমাণ রোহিঙ্গা ফেরত নিয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে। যদিও গত মাসে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের অনুমোদিত ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মধ্যে কেউই ফিরতে না চাইলে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, ২০১৭ সালে সংঘটিত নিপীড়নের জন্য কোনো জবাবদিহিতা নেই। নিজেদের চলাফেরায় স্বাধীনতা ও নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং এসব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ফিরবে না।

এই ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেছে মিয়ানমার। তারা বলছে, তারা অনেক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিল। আর বিষয়টি প্রমাণ করতেই বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের তাদের প্রস্তুতি পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

সাধারণত রাখাইনে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি রয়েছে। কিন্তু আমন্ত্রিতরা সরকারি গাড়ি বহরে ভ্রমণ করেন। আর পুলিশের তত্ত্বাবধানেই ছবি তোলা ও সাক্ষাৎকার নিতে হয়।

বিবিসি বলছে, এভাবেই সফরে গিয়েও তারা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে উচ্ছেদের অকাট্য প্রমাণ দেখতে পেয়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট জানায়, ২০১৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ ভাগ গ্রাম পুরোপুরি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের সরকার সাংবাদিকদের হ্লা পো কং নামে একটি ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ দাবি করে, স্থায়ী আবাসে ফেরার আগে এই শিবিরটিতে ২৫ হাজার শরণার্থী দুই মাস ধরে থাকতে পারবে। এই শিবিরটি এক বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল। তবে এখনো এর অবস্থা করুণ। এরইমধ্যে এর টয়লেটগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।

২০১৭ সালের সহিংসতায় ধ্বংস হওয় দুটি গ্রাম ‘হ রি তু লার’ এবং ‘থার হায় কোন’ নামে রোহিঙ্গা গ্রামের ওপর এই শিবিরটি তৈরি করা হয়েছে। শিবিরটির পরিচালক সো শোয়ে অং এর কাছে বিবিসি জানতে চায়, গ্রাম দুটো গুড়িয়ে দেয়া হল কেন। তখন কোনো গ্রাম গুড়িয়ে দেয়ার কথা অস্বীকার করেন তিনি। কিন্তু স্যাটেলাইট চিত্রে ঠিকই গ্রাম দুটি গুড়িয়ে দেয়ার প্রমাণ রয়েছে। তখন শোয়ে অং বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।

এরপর কিয়েন চং নামে আরেকটি পুনর্বাসন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় সাংবাদিকদের। সেখানে জাপান এবং ভারত সরকারের সহায়তায় বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য। তবে এই পুনর্বাসন শিবিরটি তৈরির জন্য মিয়ার জিন নামে একটি রোহিঙ্গা গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এই গ্রামটি ছিল নতুন করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা পুলিশ বাহিনীর জন্য বানানো একটি ব্যারাকের পাশে।

২০১৭ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর এই অংশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল রোহিঙ্গারা। মংডু শহরের বাইরেই অবস্থিত মিও থু গাই নামে একটি গ্রামে এক সময় ৮ হাজার রোহিঙ্গার বাস ছিল।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, আরেকটি সরকারি গাড়ি বহরে করে ভ্রমণের সময় ওই গ্রামটির ছবি তুলেছিল বিবিসি। ওই গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বড় দালানগুলো অক্ষত ছিল। আর যে গাছগুলো রোহিঙ্গা গ্রাম বেষ্টন করেছিল, সেগুলোও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু এখন মিও থু গাই গ্রামটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বড় সরকারি স্থাপনা আর পুলিশ কমপ্লেক্স ছাড়া কিছুই চোখে পড়বে না। এমনকি সেই গাছগুলোও নেই।

ইন দিন নামে আরেকটি গ্রামেও নিয়ে যাওয়া হয় বিবিসির সাংবাদিকদের। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দি মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত ওই গ্রামটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টি নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে এটি তার একটি।

ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিল মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। এখন, মুসলিমদের কোনো চিহ্ন নেই। রাখাইনরা চুপচাপ এবং শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যেখানে রোহিঙ্গারা থাকতো সেখানে গিয়ে দেখা গেল, কোনো গাছপালা নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া আর বিশাল সীমান্ত রক্ষী পুলিশের ব্যারাক।

রাখাইনের বৌদ্ধ বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিবেশী হিসেবে মুসলিমদের আর কখনোই মেনে নেবেন না তারা।

বিবিসি বলছে, ২০১৭ সালের সামরিক বাহিনীর সহিংসতার অনেক দিন পরও চলমান ব্যাপক এই ধ্বংসযজ্ঞ ইঙ্গিত দেয়, খুব কম সংখ্যক রোহিঙ্গাই আসলে তাদের পূর্বের জীবনে ফিরতে পারবে।

বড় আকারে রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি হিসেবে একমাত্র হ্লা পো কং-য়ের মতো জরাজীর্ণ ট্রানজিট ক্যাম্প এবং কিয়েন চংয়ের মতো পুনর্বাসন শিবিরই দেখানো হচ্ছে। তবে দু’বছর আগে রোহিঙ্গারা যে ধরনের মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে তা থেকে খুব কম সংখ্যকই বের হতে পেরেছে এবং তারা আসলে এ ধরনের ভবিষ্যতের আশা করেনি।

ইয়াঙ্গুনে ফেরার পথে বাস্তুচ্যুত এক তরুণ রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেন বিবিসির সাংবাদিক। সাত বছর ধরে একটি আইডিপি ক্যাম্পে নিজের পরিবারের সঙ্গে আটকা পড়েছে ওই তরুণ। ২০১২ সালে সিত্তে এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর এক লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার সঙ্গে তিনিও ঘরছাড়া হন।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নেই তার। এমনকি অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পের বাইরেও যেতে পারেন না। বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ঝুঁকি নিয়ে তারা যেন বাংলাদেশ থেকে ফিরে না আসে। তাহলে তার মতোই ক্যাম্পে বন্দি জীবন কাটাতে হবে।

রাখাইনে পাওয়া তথ্য সম্পর্কে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি সরকার।

তবে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক নির্যাতন চলার সময়ে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেন, ১৯৪২ সালের ‘অসম্পন্ন কাজ’ সম্পন্ন করছেন তারা।

তিনি আসলে তৎকালীন রাখাইনে জাপানি ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করেন। ওই যুদ্ধে রোহিঙ্গা এবং রাখাইনের বৌদ্ধরা বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করেছিল।

সে সময়, তারা প্রায়ই একে অপরকে মারতো এবং যার কারণে বহু বেসামরিক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। সেনাপ্রধান বলেন, তখন রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে বন্যার স্রোতের মতো আসতে থাকে। যে এলাকাটি বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে অবস্থিত।

সীমান্তের মংডু এবং বুথিডং- এই দুটি জেলাই ছিল মিয়ানমারে একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা। অবশ্য ২০১৭ সালের সহিংসতার সময় ওই দুটি জেলায় বেশিরভাগ গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির পর থেকে ওই এলাকায় মুসলিমরা যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ ভাগ তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে।

ওএস

 

দক্ষিণ এশিয়া: আরও পড়ুন

আরও