নথিতে তাজাবের জায়গায় তাজাপ উঠায় নাগরিকত্ব বাতিল!

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

নথিতে তাজাবের জায়গায় তাজাপ উঠায় নাগরিকত্ব বাতিল!

পরিবর্তন ডেস্ক ১০:৫৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০১৮

নথিতে তাজাবের জায়গায় তাজাপ উঠায় নাগরিকত্ব বাতিল!

আসামের রিয়াজুল ইসলাম বলছেন, তিনি ১৯৫১ সাল থেকে তার পরিবারের ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণের জন্য, সেইসাথে তারা যে বাংলাদেশি অভিবাসী নয় সেটারও প্রমাণ হিসেবে।

কিন্তু জুলাইতে প্রকাশ করা নাগরিকত্বের তালিকার খসড়ায় তিনি এবং তার মা বাদ পড়েছেন। শুধু তিনিই নয়, তার মত আরও ৪০ লাখ মানুষের নাম নেই তালিকাতে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ৩৩ বছর ধরে বসবাসকারী রিয়াজুল জানান, তিনি এবং তার মায়ের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য অধিকতর আর কোনো ডকুমেন্ট তাদের কাছে নেই। কিন্তু এরপরেও তার বাবাসহ তার পরিবারের অনেকের নামই এসেছে নাগরিকত্বের খসড়া তালিকায়।

রাজ্যটির বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা ধুবরিতে বসে তিনি বলছেন, যদি আমার বাবা ভারতের নাগরিক হতে পারেন, তাহলে আমি কেন নয়? আমাদের নাগরিকত্বের জন্য তারা আর কী প্রমাণ চায়?

এ ধরনের মনোবেদনার কথা শোনা যাচ্ছে আসামজুড়ে। দুই বছর আগে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল রাজ্যটিতে ক্ষমতা নিলে এ নাগরিকত্ব তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু করে দ্রুতগতিতে। তারা ঘোষণা করেছে, রাজ্য থেকে অভিবাসীদেরকে বের করে দেয়া হবে, সেইসঙ্গে তাদের কাছ থেকে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয়দের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে।

তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখ মানুষ সম্পর্কে বিশদ কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন (এনআরসি)।  তবে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম। এছাড়া তিন কোটি ৩০ লাখ অধিবাসীর বাকি জনগোষ্ঠী হচ্ছে অসমীয়ভাষী হিন্দু।

বাদ পড়াদের অধিকাংশই দরিদ্র এবং শিক্ষা-দীক্ষার দিকে পিছিয়ে। খসড়া তালিকা বিবরণী ঘেটে রয়টার্স জানাচ্ছে, তাদের অনেকেই শুধু নামের ভুল বানানের কারণে নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। শুধু নামের ভুলই নয়, জন্ম ও শিক্ষাসনদের তথ্য দিতে ভুল করে বাদ পড়েছে অনেকে।

বাদ পড়া নাগরিকদের একাধিক সমস্যা নিয়ে কাজ করা আইনজীবী আমান ওয়াদুদ বলেন, এদের অধিকাংশ নামের সঙ্গে বংশীয় পদবি নামের কারণে সমস্যায় পড়েছেন তারা। মূলনামের সঙ্গে আলী, আহমদ, হোসাইন নাম ইচ্ছামত পরিবর্তন করার কারণে এটা ঘটেছে।

তিনি রয়টার্সকে তাজাব আলী নামে একজন নাগরিকের ট্রাইব্যুনালের রায় দেখিয়েছেন, যিনি তার নাগরিকত্বের প্রমাণের জন্য ১৯৬৬ সালের ডকুমেন্টস উপস্থাপন করেছেন। তাজাব আলী বলছেন, তাজাব আলীর বদলে তার নাম তাজাপ আলী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। ১৯৮৫ সালের ভোটার লিস্টে ভুলভাবে নাম লিপিবদ্ধ হওয়া তার বাবাও একই সমস্যার কারণে বাদ পড়েছেন। তার বাবার সুরমান আলীর জায়গায় লিপিবদ্ধ হয়েছে সুরমান আলী মুন্সি হিসেবে।

একইভাবে সাজিদা বেগম নামের আরেক নারী বিয়ের পর নাম পরিবর্তন করে সাজিদা বিবি করায় ঝামেলায় পড়েছেন। অথচ ১৯৫১ সালের নাগরিকত্বের তালিকায় তার নাম ছিল। স্কুল থেকে বিয়ে পর্যন্ত কয়েকবার নাম এফিডেভিড করায় তিনিও এখন বাদ পড়ে গেছেন তালিকা থেকে।

আমান ওয়াদুদ বলছেন, ট্রাইবুন্যালে সাজিদা বেগম তার এফিডেভিডের সকল প্রমাণ হাজির করলেও এনআরসি জানাচ্ছেন এক্ষেত্রে কোনো ধরনের এফিডেভিড গ্রহণযোগ্য হবে না।

দেশটির বিরোধী দলগুলো দাবি করছে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পরিকল্পনা করে মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিল করছে। একপক্ষীয়ভাবে নির্বাচনে জিতে আসার জন্য শুধু হিন্দুদের নাগরিকের তালিকায় স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

তবে বিজেপির আসামের মুখপাত্র বিজন মহাজন বলেন, ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে নাগরিকত্ব তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তারা রাজনৈতিক কারণে এসব কথা বলছেন যার কোনো ভিত্তি নেই।

যদিও সম্প্রতি মোদি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী অরুন জেটলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, আসামে মুসলমানের চেয়ে হিন্দুদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এনআরসির এ কাজ গুরুত্বপূর্ণ।

আসামের স্থানীয় অধিবাসীরা এসব অভিবাসীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৮৩ সালে এসব অভিবাসীদের তাড়াতে গিয়ে দুই হাজারের মত লোক ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়। যদিও এটা এখনও প্রমাণ করা যায়নি যে কারা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য জড়িত।

আসাম এনআরসির খসড়াটিতে অনেক হিন্দুকেও বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে বিজেপি প্রধান অমিত শাহ দাবি করেন, বাদ পড়া অমুসলিমরাও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে এসেছেন।

এখনও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, কিসের ভিত্তিতে আসলে তারা তালিকা থেকে কাকে বাদ দিয়েছে আর কাকে রেখেছে। আইনজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এর শেষ পরিণতি হবে হয়ত ডিটেনশন ক্যাম্প। বাদ পড়াদের সবাই নিজেদের ভোটাধিকারও হারাবেন। কেন্দ্রীয় নির্বাচনে অর্ধডজনেরও বেশি এমপি ভাগ্য নির্ধারিত হয় এদের ভোটে।

আরজি/এমএসআই