হারিকেন মাইকেল মার্কিন সামরিক শক্তির দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়ে গেল

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

হারিকেন মাইকেল মার্কিন সামরিক শক্তির দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়ে গেল

আহমেদ শরিফ ১:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৮

হারিকেন মাইকেল মার্কিন সামরিক শক্তির দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়ে গেল

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ফ্লোরিডা উপকূল লণ্ডভণ্ড করে গেল ক্যাটাগরি-৪ হারিকেন ‘মাইকেল’। ঘন্টায় ২’শ কিঃমিঃ-এর উপর গতির বাতাসের ঝাপ্টায় খুব কম গাছপালা এবং স্থাপনাই দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের মুখে মার্কিন সামরিক বাহিনীও পার পায়নি। ঘূর্ণিঝড়ের পথের মাঝে পড়েছিল মার্কিন বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ‘টিনডাল এয়ার ফোর্স বেইস’। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই ঘাঁটির ধ্বংসযজ্ঞের ছবি মিডিয়াতে হাইলাইট হবার পর অনেকেই হতবাক হয়েছেন। সুপারপাওয়ারের অতি শক্তিশালী বিমান বাহিনী কি করে এই ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে ব্যর্থ হলো, সেই প্রশ্নই এখন অনেকের মুখে মুখে। 

ফ্লোরিডার টিনডাল বিমান-ঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন ৩ হাজার ৬’শ জন সামরিক সদস্য। ঘূর্ণিঝড় মাইকেল আঘাত হানার আগেই ৮ই অক্টোবর সকল সামরিক সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ঐ এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পরদিন বিকেলের মাঝেই প্রায় সকলেই ঘাঁটি ছেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড়ে টিনডালের প্রায় সকল ধরনের স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; যেকারণে সামরিক সদস্যদের সেখানে শীঘ্রই ফেরত নিয়ে আসাটাও কঠিন হবে।

১১ই অক্টোবর মার্কিন বিমান বাহিনীর কর্নেল ব্রায়ান লেইড’ল সামরিক সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক বার্তায় বলেন যে, নিরাপত্তা দিতে পারার আগে সামরিক সদস্য এবং তাদের পরিবারকে সেখানে ফেরত যেতে বলা হবে না। রাস্তার উপর থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত গাছ, বৈদ্যুতিক খাম্বা সরানো, ইউটিলিটি সার্ভিস পূণঃ-প্রতিষ্ঠা করা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলির কাঠামোগত অবস্থা যাচাই – এই সকলই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর এই মুহুর্তে বলাও যাচ্ছে না যে, এক্ষেত্রে কত সময় লাগতে পারে। 

টিনডালে অবস্থিত ছিল মার্কিন বিমান বাহিনীর ৩’শ ২৫তম ফাইটার উইং-এর অধীনে ৪৩তম এবং ৯৫তম ফাইটার স্কোয়াড্রন। এই স্কোয়াড্রনগুলি বিমান বাহিনীর ৮টা স্কোয়াড্রনের মাঝে দু’টা যেগুলি সর্বাধুনিক এফ-২২ ‘র‍্যাপটর’ স্টেলথ ফাইটার বিমান অপারেট করে। এখানে মার্কিন বিমান বাহিনীর মোট ১’শ ৮৭টা এফ-২২-এর মাঝে ৫৫টা ছিল। আলাস্কা, ভার্জিনিয়া, নেভাডা এবং হাওয়াই-এ বাকি এফ-২২ বিমানগুলি রয়েছে। এই যুদ্ধবিমান মার্কিন বিমান-শক্তির সর্বাগ্রে। ‘

ডেইলি মেইল’ পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে একেকটা বিমানের নির্মাণ খরচ ছিল ৩’শ ৩৯ মিলিয়ন ডলার, যা কিনা ছোটখাটো একটা দেশের এক বছরের সামরিক বাজেটের সমতুল্য। খবরে প্রকাশ যে, খুব সম্ভবতঃ ৩৩টা এফ-২২ বিমানকে হারিকেন মাইকেল আঘাত হানার আগেই সেখান থেকে উড়িয়ে অন্য ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। অর্থাৎ হয়তো ২২টা যুদ্ধবিমান ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় সেখানে ছিল। তবে এই সংখ্যা কমবেশি হতে পারে, কারণ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা কতগুলি বিমান সরানো হয়েছে, তা অফিশিয়ালি বলতে চা ননা। কমপক্ষে ৩টা এফ-২২ সেখানে রয়ে যেতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। অন্ততঃ ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখে বিশ্লেষকেরা তা-ই বলছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর সবচাইতে বড় সামরিক শক্তি সুপারপাওয়ার আমেরিকার সবচাইতে দামি এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইটার জেটগুলিকে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে আগে কেন নিরাপদে সরিয়ে নেয়া গেল না? যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই তুমুল ঝড় তুলেছেন এবং কেউ কেউ কিছু কর্মকর্তাদের চাকুরিচ্যুত করার ব্যাপারেও বলছেন। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন এমন কিছু বিষয়, যা কিনা সাধারণ জনগণের হিসেবের মাঝে পড়ে না।

অনলাইন ম্যাগাজিন ‘দ্যা ড্রাইভ’এ এক লেখায় সামরিক বিশ্লেষক টাইলার রোগোওয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে কেন ইচ্ছে করলেই একটা এফ-২২ যুদ্ধবিমানকে উড়িয়ে নেয়া যায় না। এরকম একটা যুদ্ধবিমানকে এক ঘন্টা আকাশে ওড়াতে বেশকিছু টেকনিশিয়ানের কয়েক দিনের পরিশ্রম করা লাগে। বিমানের নিয়মিত মেইনটেন্যান্সের জন্যেই বিশাল সময় ব্যয় করতে হয়। কখনও কখনও বিমানের ইঞ্জিনসহ বড় বড় অংশগুলিকে খুলে অন্যত্র নিয়ে সেগুলির উপরে কাজ করা হয়। এর উপরে খুচরা যন্ত্রাংশের সময়মত সরবরাহের ব্যাপার তো রয়েছেই। ঠিক সময়ে যন্ত্রাংশ পাওয়া না গেলে বিমানকে ঘাঁটিতে বসে থাকতে হবে। কখনও কখনও দরকারের সময়ে এক বিমানের যন্ত্রাংশ খুলে অন্য বিমানে লাগানো হয় ওড়ানোর উদ্দেশ্যে। মার্কিন বিমান বাহিনীর যতগুলি যুদ্ধবিমান রয়েছে, তার মাঝে এফ-২২ ফাইটারের সার্ভিসে থাকার হার সবচাইতে কম – খুব বেশি হলে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ যেকোন সময়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে যে, অর্ধেক এফ-২২ আকাশে ওড়ার যোগ্য নয়।

অন্যান্য বিমানের তুলনায় এই বিমান অতি-সংবেদনশীল এবং এর অনেক ব্যাপারই মার্কিন সরকার অতি গোপনীয়তার সাথে রক্ষা করে থাকে। যেমন, এই বিমানের শরীরে এমনকিছু গোপনীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়, যার কারণে এটা সহজে রাডারে ধরা পড়ে না। এই প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে রক্ষা করে। এসব কারণে এই বিমান উড়তে সক্ষম না হলে একে ট্রাকের উপরে উঠিয়ে রাস্তা দিয়ে সকলের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়, যেখানে ঘূর্ণিঝড়ের আগে আগে হাইওয়েতে পলায়নপর গাড়ির লম্বা লাইন লেগে যায়। সাড়ে ১৯ টনের এই বিমানগুলিকে আবার যেকোন ট্রাকেও ওঠানো যাবে না। বড় পরিবহণ বিমানে করেও বহণ করা কঠিন। কারণ বিমানে তুলতে হলে এর ৪৪ফুট ডানা এবং ৬২ফুট দেহের অনেক অংশকেই আলাদা করে ফেলতে হবে, যা কিনা অতি সময়-সাপেক্ষ। ঘূর্ণিঝড়ের আগে আগে হঠাত করেই এই কাজ করা একেবারেই সম্ভব নয়।

ফ্লোরিডা সবসময়ই ঘূর্ণিঝড়-প্রবণ এলাকা। টিনডাল ছাড়াও সেখানে আরও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি এবং নৌ-ঘাঁটি রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সেখানে নতুন না হলেও টিনডালের স্থাপনাগুলি তৈরির সময়ে ক্যাটাগরি-৪-এর শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সরাসরি আঘাত করলেও দাঁড়িয়ে থাকার সক্ষমতা সেগুলিকে দেয়া যায়নি। টাইলার রোগোওয়ে বলছেন যে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সমালোচনা না করে বরং মার্কিন বাজেট সংকটের এই দুঃসময়ে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করতে পারে এমন স্থাপনা তৈরি করার মতো অর্থ এবং গুরুত্ব মার্কিন বিমান বাহিনী যোগাড় করতে সক্ষম হবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা করা উচিৎ।  

ঘূর্ণিঝড় মাইকেল প্রমাণ দিল যে মার্কিন সমরশক্তি দুনিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী হলেও তা সকল কিছুর উর্ধ্বে নয়। একইসাথে প্রবল শক্তিশালী মার্কিন সামরিক বাহিনীর যে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলি রয়েছে, তা আরও একবার সামনে আসলো। প্রযুক্তিগত উতকর্ষতার মাঝে সমস্যার বেড়াজালগুলি বলে দেয় যে সুপারপাওয়ারের সক্ষমতাকে অতি-উচ্চতায় দেখতে চাওয়ার অভিপ্রায় আসলে দিবাস্বপ্ন।

এএসটি/