নবীজির সংসারে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত

ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি , ২০১৯ | 2 0 1

নবীজির সংসারে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত

মুহাম্মদ ফাতহী ৪:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০১৯

নবীজির সংসারে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য আদর্শ। আমরা যদি উম্মাহাতুল মুমিনীনের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনযাপনের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে আমরা তাদের প্রতি নবীজি (সা.) এর যত্ন, স্নেহ, সহানুভূতি ও ভালোবাসার এক অনন্য মাত্রা দেখতে পাই।

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক পারস্পরিক যত্ন, দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির এক শক্তিশালী বন্ধন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,  

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

“আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (সূরা রুম, আয়াত: ২১)

বিভিন্ন হাদীস থেকে স্ত্রীগণের প্রতি রাসূল (সা.) এর আচরণ কেমন ছিল, এখানে তুলে ধরা হলো।

উত্তম ব্যবহার

১. হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার যার চরিত্র সুন্দর এবং তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম।” (তিরমিজি)

২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “উত্তম সেই যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম এবং তোমাদের মধ্যে আমিই উত্তম আমার স্ত্রীদের কাছে।” (ইবনে মাজাহ)

৩. হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “একজন মুমিন পুরুষের উচিত নয় একজন মুমিন নারীকে ঘৃণা করা (স্বামী-স্ত্রী); যদি সে তার চরিত্রগত কোন বৈশিষ্ট্যকে অপছন্দ করে, তবে সে তার অন্য কোন বৈশিষ্ট্যকে পছন্দ করতে পারে।” (মুসলিম)

৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “এই পৃথিবী এক মুহূর্তের আনন্দ উপভোগ মাত্র; পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম উপভোগ্য বিষয় দ্বীনদার স্ত্রী।” (মুসলিম)

ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ

৫. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) কে একবার প্রশ্ন করা হল,

“হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মাঝে আপনার কাছে সর্বাধিক প্রিয় কে?”
রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, “আয়েশা।”
তাকে আবার প্রশ্ন করা হল, “আর পুরুষদের মধ্যে?”
তিনি উত্তর দিলেন, “তার পিতা।” (ইবনে মাজাহ)

৬. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা.) এর অন্যকোন স্ত্রীর প্রতি আমি ঈর্ষা অনুভব করিনি যেরূপ আমি খাদিজার প্রতি অনুভব করেছি। যদিও আমি তাকে কখনোই দেখিনি। যখনই আল্লাহর রাসূল কোন বকরী জবাই করতেন, গোশতের কিছু অংশ তিনি খাদীজার বান্ধবীদের নিকট প্রেরণ করতেন।”

একবার হযরত আয়েশা (রা.) হযরত খাদীজা (রা.) সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলেন, যা রাসুল (সা.)কে মর্মাহত করেছিল। রাসূল (সা.) বলেন, “আয়েশা! আল্লাহর কসম! আমি তার ভালোবাসায় ধন্য ছিলাম।”

কাজের মাধ্যমে ভালোবাসার প্রকাশ

৭. হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি পানির পাত্রের যে স্থান দিয়ে পানি পান করতেন, রাসূল (সা.)ও পাত্রের ঠিক একই স্থান দিয়ে পানি পান করতেন। (নাসায়ী)

৮. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এর একজন পারসিক প্রতিবেশী ছিল যে সুরুয়া রান্না করতে খুবই দক্ষ ছিল। একদিন সে কিছু সুরুয়া রান্না করে রাসূল (সা.) কে দাওয়াত দিল। সেসময় হযরত আয়েশা (রা.) তার সাথে উপস্থিত ছিলেন। রাসূল (সা.) তাকে হযরত আয়েশা (রা.) কেও দাওয়াত দেওয়ার জন্য বলেন। কিন্তু সেই প্রতিবেশি শুধু রাসূল (সা.) কে আসার জন্য অনুরোধ করে। ফলে রাসূল (সা.) তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন।

সেই প্রতিবেশি দ্বিতীয়বার রাসূল (সা.) কে দাওয়াত করলে তখনও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

পরে তৃতীয়বারে সেই পারসিক প্রতিবেশী হযরত আয়েশা (রা.) কে সহ রাসূল (সা.) কে দাওয়াত করলে রাসূল (সা.) তা গ্রহণ করেন এবং আয়েশা (রা.) কে সহ সেই প্রতিবেশীর দাওয়াতে যান।

৯. আল-আসওয়াদ একবার হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেন, রাসূল (সা.) বাড়ীতে কী কাজ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) উত্তরে বলেন, “তিনি ঘরের সকল কাজই করে দিতেন কিন্তু নামাযের সময় হলে তিনি নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন।” (বুখারী)

স্ত্রীর সঙ্গে রসিকতা-বিনোদন

১০. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূল (সা.) এর সাথে এক সফরে বের হয়েছিলেন। সফরের মাঝে রাসূল (সা.) হযরত আয়েশা (রা.) এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতার আহবান জানান। হযরত আয়েশা (রা.) তখন হালকা হওয়ার কারণে রাসূল (সা.) কে দৌড়ে হারিয়ে দেন।

পরবর্তীতে আরেক সফরে রাসূল (সা.) আয়েশা (রা.) কে দৌড় প্রতিযোগিতার আহবান জানান। আয়েশা (রা.) ততদিনে খানিক ভারি হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি রাসূল (সা.) এর কাছে দৌড়ে পরাজিত হন। 

রাসূল (সা.) তখন তাকে বলেন, “আমরা এখন সমান-সমান।” (আল-আলবানী)

১১. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার ঈদের দিনে মদীনায় হাবশীরা বর্শা ও ঢাল নিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী খেলার প্রদর্শনী করছিল। আয়েশা (রা.) রাসূল (সা.) এর কাছে খেলা দেখতে চেয়ে অনুরোধ করেছিলেন অথবা রাসূল (সা.) তাকে খেলা দেখতে চান কিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন এবং আয়েশা (রা.) এতে সম্মতি জানিয়েছিলেন।

রাসূল (সা.) তখন আয়েশা (রা.) কে আড়াল করে খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যতক্ষণ আয়েশা (রা.) তাঁর কাধে মাথা রেখে খেলা দেখছিলেন, ততক্ষণ রাসূল (সা.) সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। এক পর্যায়ে আয়েশা (রা.) ক্লান্ত হলে তিনি স্থান ত্যাগ করেন। (বুখারী)

অনন্ত ভালোবাসা

১২. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এর কাছে যখন কিছু আনা হত, তখন তিনি বলতেন, “এটি অমুক ও অমুককে দাও কেননা তারা খাদিজার বান্ধবী।” (আল-আলবানী)

১৩. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন হযরত খাদিজা (রা.) এর বোন হযরত হালা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.) রাসূল (সা.) এর কাছে এসে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। রাসূল (সা.) খাদিজা (রা.) এর কথা স্মরণ করে বিহ্বল হয়ে পড়েন এবং বলতে থাকেন,

“আল্লাহ, এ যেনো হালা বিনতে খুয়াইলিদ হয়!” (বুখারী)

এমএফ/

 

নবী ও সাহাবা-চরিত: আরও পড়ুন

আরও