আল্লাহর প্রতি মহানবী (সা.) এর অতুলনীয় সবর

ঢাকা, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ | 2 0 1

আল্লাহর প্রতি মহানবী (সা.) এর অতুলনীয় সবর

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৮:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

আল্লাহর প্রতি মহানবী (সা.) এর অতুলনীয় সবর

প্রজ্ঞা ও ধৈর্য কোনও মানুষের ব্যক্তিত্বকে জানার সবচে গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক। প্রজ্ঞা যাচাইয়েরও কয়েকটি স্তর হতে পারে। যার মধ্যে দুইটি হল যা কোন মানুষের প্রজ্ঞার চূড়ান্ত পরিমাপক হয়। একটি এই যে, ব্যক্তি তার নিজ সন্তানদের পক্ষ থেকে আসা কোন আকস্মিক দুর্ঘটনায় কেমন আচরণের প্রকাশ ঘটায়। দ্বিতীয়টি হল, নিজের শত্রুদের অন্যায়-অত্যাচার সত্ত্বেও তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভের পর ব্যক্তির চেহারা কেমন হয়।  

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ব্যক্তিত্বে এই উভয় অবস্থার উপরই প্রজ্ঞা, সবর, সহনশীলতা, ক্ষমা ও মহানুভবতার চূড়ান্ত প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। প্রথমে সন্তানদের বিষয়টিই দেখা হোক। রাসুলুলাহ (সা.) কে আল্লাহ তাআলা বেশ অনেকজন সন্তান দিয়েই সম্মানিত করেছিলেন। হযরত খাদিজা (রা.) থেকেই চার কন্যা সন্তান – হযরত যায়নাব, হযরত রুকাইয়া, হযরত উম্মে কুলসুম ও হযরত ফাতেমা (রা) জন্মগ্রহণ করেছেন। আরও দুই ছেলে হযরত কাসেম ও হযরত আব্দুল্লাহ (রা.) জন্মগ্রহণ করেছেন যাঁদের লকব তাহের ও তাইয়্যেব ছিল। তাঁর আরেক সন্তান ইবরাহীম বিবি মারিয়া (রা.) থেকেও জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

হযরত ফাতেমা (রা.) ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সকল সন্তান তাঁর চোখের সামনেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। তিন পুত্র শিশুকালেই ইন্তেকাল করেন। আর কন্যাদের তিনজনও পূর্ণ যৌবনে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। অবশিষ্ট হযরত ফাতেমা (রা.)-ও হুজুরের মৃত্যুর ছয় মাস পরেই মৃত্যু বরণ করেন। এই কথাগুলো বইয়ের পাতায় পড়ে নেওয়া তো খুবই সহজ। তবে একটু বুকে হাত রেখে অনুভব যদি করা যায় যে, আমাদের মধ্য থেকে কারো সাথে এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে গেলে কেমন হবে? আমরা তো আমাদের সন্তানদের সাধারণ কোন দুঃখই সহ্য করে নিতে পারি না। দো-জাহানের সর্দার (সা.) এর সত্ত্বার উপর এই অভিযোগ ভেঙ্গে যায় যে, তিনটি ছেলে সন্তানই এমন শৈশবে চলে গেল যখন শিশুর প্রতিটি একটিভিটি পিতা-মাতার মনে উচ্ছ্বাসের ঝড় তোলে। কন্যাদের তিনজনই এমন যৌবনের এমন বয়সে চলে গেল যখন মৃত্যুর কল্পনা করাও বড় কঠিন।          

কিন্তু নবী করীম (সা.) এই ঘটনাগুলোকে কি অনন্যভাবে সয়ে নিয়েছেন। তাঁর সর্বশেষ পুত্র হযরত ইবরাহীমের ইন্তেকাল তাবুক যুদ্ধের একেবারে পরেই হল, যখন ইতিহাসে এই শব্দগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে যা তিনি সে সময়ে বলেছিলেন, “আমাদের চোখে অশ্রুধারা প্রবাহমান, অন্তর ভারাক্রান্ত, কিন্তু আমরা যবানে শুধু তাই বলব যা আমাদের প্রতিপালক পছন্দ করেন।” দুনিয়ায় কি আরও কোন এমন ব্যক্তি আছে, যে সবর ও সহনশীলতার এই দৃষ্টান্ত পেশ করতে পেরেছে!

শত্রুদের সাথে মুআমালাতেও হুযুর (সা.)-এর প্রজ্ঞা অনন্য উচ্চতর ছিল। আল্লাহর রাস্তায় তাঁকে যতদূর ভাবা যায় সকল প্রকার কষ্টগুলোই দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজ গোত্র ও নিকটতম আত্মীয়দের নিকৃষ্টতম অজ্ঞচিত বিরুদ্ধতা, সকাল-সন্ধ্যা বিভিন্ন রকম অপমানকর সম্বোধন ও কথা শুনেছেন। সর্ব প্রকার অপবাদ, গালি-গালাজ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং সামাজিক বয়কট সয়েছেন। পবিত্র হারাম শরীফে, মক্কার বাজারগুলোতে এবং তায়েফের পাহাড়গুলোতে হুযুর (সা.) নিজে এবং তাঁর সাহাবাগণ সর্ব প্রকার বিরোধিতা, লাঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হিজরতের পর কখনো যুদ্ধ-চক্রান্ত ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, কখনো কাফেরদের হাতে নিকটতম আত্মীয় ও প্রিয় মানুষদের অত্যন্ত বেদনাদায়ক মৃত্যুর বর্ণনা শুনেছেন। কখনো ইয়াহুদি ও মুনাফিকদের হাতে নিজের ঘর ওয়ালাদের নামে নির্লজ্জ অপবাদ সহ্য করতে হয়েছে। কখনো নিজের সত্ত্বার উপর কঠিন মিথ্যাচার সয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনোই না বদ-দুআ দিয়েছেন, আর না কোন প্রতিশোধ নিয়েছেন।         

এরপর এক এক করে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.) কে তাঁর প্রতিটি দুশমনের উপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন। যদি তিনি চাইতেন তাদের প্রত্যেককেই ধ্বংস করে দিতে পারতেন – কিছুই হতো না। কিন্তু রহমাতুল লিল আলামিন তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। প্রত্যেক যালেমকে মাফ করে দিয়েছেন। প্রত্যেক হত্যাকারীকে ছেড়ে দিয়েছেন। যে ক্ষমা চেয়েছে, যে মাথানত করেছে শুধু তাকেই ক্ষমা করা হয়নি বরং পলায়নকারীরাও তাঁর দরবার থেকে ক্ষমার পরওয়ানা পেয়ে গেছে। এই প্রজ্ঞার সামনে প্রতিটি মাথা ঝুঁকে গেছে। প্রতিটি গর্দান নিচু হয়ে এসেছে। প্রত্যেক দুশমন বন্ধু হয়ে গেছে। আর প্রত্যেক বিরোধী বাঁধা পড়ে গেছে। আল্লাহর সাথে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর সবর ও সীরাত এক তুলনাহীন দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই সবরই সেই গুণ যার সামান্যও যদি তাঁর এখন আমাদের মাঝে খোঁজা হয় খুবই দুঃখজনক যে তা পাওয়া যায় না। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।  

এমএফ/

আরও পড়ুন...
হাদিসের গল্প : নবীজির ক্ষমা প্রদর্শন
নবীজির কাছে শিখুন ঘর ও ঘরণীর যত্ন

 

নবী ও সাহাবা-চরিত: আরও পড়ুন

আরও