নবীজির কাছে শিখুন ঘর ও ঘরণীর যত্ন

ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২ পৌষ ১৪২৫

নবীজির কাছে শিখুন ঘর ও ঘরণীর যত্ন

মাজিদা রিফা ১০:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০১৮

নবীজির কাছে শিখুন ঘর ও ঘরণীর যত্ন

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘর অন্যান্য সাধারণ মানুষের ঘরের মতোই ছিল। ঘরণীরাও ছিলেন সাধারণ ঘরণীদের মতো মানুষ। ঘরে যেমন নবীজি কাজকর্ম করতেন, ঘরণীরও তিনি অত্যন্ত যত্ন নিতেন। নবী জীবনের সকল কাজের মতো এ কাজগুলোও ছিল সংসারের সুখের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আসুন দেখি নবীজি কিভাবে ঘর ও তাঁর ঘরণীর যত্ন নিতেন।

স্ত্রীর আরাম আয়েশের প্রতি লক্ষ্য রাখা

মদিনার রাত। লোকজন শুয়ে পড়েছে। পাশাপশি শুয়ে আছেন আয়েশা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আয়েশার নিঃশ্বাস শুনে মনে হচ্ছে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেছেন। নবীজি উঠলেন। চুপেচুপে চাদর নিলেন, জুতা পরলেন। এরপর দরজা খুলে বেরিয়ে আস্তে করে কপাট বন্ধ করে দিলেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ঘুমাননি। উঠে বসলেন তিনি। কোথায় যাচ্ছেন নবীজি? অন্য স্ত্রীর কাছে না তো? আয়েশা চটপট কাপড় পাল্টে বেরিয়ে নবীজির পিছু নিলেন। নবীজিকে অন্য কারো হুজরার দিকে যেতে দেখা গেল না। তিনি জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দোয়া করলেন। আয়েশা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলেন। দোয়া শেষে নবীজি ঘরে ফেরার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেন। আয়েশাও ঘুরে দাঁড়ালেন। হঠাৎ নবীজি দ্রুত চলতে শুরু করলেন। সর্বনাশ! তিনি কি বুঝতে পেরেছেন কেউ তার পিছু নিয়েছে! আয়েশা নবীজির চেয়ে দ্রুত পা চালিয়ে নবীজির আগে ঘরে পৌঁছে গেলেন। এরপর আয়েশা শুয়ে পড়ামাত্রই নবীজি ঘরে প্রবেশ করলেন এবং বললেন, ‘আয়েশা কী হয়েছে তোমার? এভাবে হাঁপাচ্ছো যে?’

আয়েশা বললেন, ‘কিছু হয়নি।’

নবীজি বললেন, ‘ঠিক করে বলো, অন্যথায় অচিরেই আমাকে জানিয়ে দেয়া হবে।’

আয়েশাকে সবকিছু খুলে বলতে হলো। নবীজি তো ঠিকই জেনে যাবেন। লুকিয়ে কী লাভ!

নবীজি বললেন, ‘তাহলে তুমিই সেই কালো ছায়া যা আমার সামনে দেখেছি?

স্বীকার করলেন আয়শা, ‘হ্যাঁ।’

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর এমন সন্দেহে স্বামীর রাগে ফেটে পড়ার কথা, কিন্তু নবীজি আয়েশার গায়ে মৃদু আঘাত করলেন, তারপর বললেন, ‘তুমি কি ধারণা করেছো আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার ওপর অবিচার করবেন?’

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, ‘মানুষ যা গোপন করে আল্লাহ তা জানেন।’

নবীজি বললেন, ‘অবশ্যই।’

তারপর নবীজি আয়েশাকে চুপেচুপে বের হওয়ার কারণ ব্যাখা করলেন। বললেন, ‘আমি বাইরে যাওয়ার কারণ হলো জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আমাকে ডেকে ছিলেন। তোমার কাপড় এলোমেলো থাকায় তিনি ঘরে প্রবেশ করেননি। আমি ভেবেছিলাম- তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো, তাই তোমাকে জাগাতে ইচ্ছে হয়নি। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, আপনার রব আপনাকে জান্নাতুল বাকীর অধিবাসীদের জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ নবীজির কথা শেষ হওয়ার পর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজির কাছ থেকে মৃতদের জন্য দোয়া করার পদ্ধতিটা শিখে নেন। নবীজি তাকে দোয়াটা শিখিয়ে দেন। (১)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজিকে সন্দেহ করেছিলেন। অথচ আসল কথা বলে তাকে চমৎকৃত করে দেন নবীজি। স্ত্রীর আরামের প্রতি কী ভীষণ সজাগ দৃষ্টি নবীজির! নীরবে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন যেন প্রিয়ার ঘুম না ভাঙে! কী চমৎকার যত্ন নিতেন তিনি স্ত্রীদের!

সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন দীর্ঘদেহী ও মোটা। এ কারণে বিদায় হজ্জের সময় নবীজি তাঁকে মুযদালিফা থেকে আগে আগে মীনায় যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেন। যেন ভিড়ের মধ্যে প্রিয়তমা স্ত্রীর কষ্ট না হয়।

স্ত্রীকে নিজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া

এক সফরে সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই বাহনে সওয়ার হলেন। উটটি হঠাৎ কোনো কারণে হোঁচট খেলে নবীজি ও সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা দুজনেই উট থেকে ছিটকে পড়লেন। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু কাছেই ছিলেন, তিনি বাহনের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে গিয়ে বললেন, ‘ইয়া নাবিয়াল্লাহ! আপনার জন্য আমার প্রাণ কুরবান হোক, আপনি কি আঘাত পেয়েছেন?’

নবীজি বললেন, ‘না, তুমি তাকে দেখো!’

আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু মুখ ঢেকে সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁর ওপর একখানি কাপড় ছুঁড়ে দেন। সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা উঠে দাঁড়ান। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের উট প্রস্তুত করে দিলে দুজন আবার উটের পিঠে আরোহন করেন। (২)

স্ত্রীর সুবিধা-অসুবিধার দিকে তীক্ষ্ম নজর রাখা

নবীজি স্ত্রীদের জন্য ছিলেন যেন কাল্পনিক রূপকথার রাজকুমারের বাস্তব রূপ। স্ত্রীদের সাথে এতো চমৎকার আচরণ করতেন যা ছিল অতুলনীয়। একবার সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে নবীজি এক সফরে ছিলেন। নবীজি বাহনে সওয়ার হওয়ার সময় উটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন আর সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজির হাঁটুতে পায়ের ভর দিয়ে উটে আরোহণ করলেন। (৩)

একবার নবীজি ইতিকাফে ছিলেন। সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁকে দেখতে এলেন। নবীজি কিছু সময় তার সাথে কথাবার্তা বললেন। সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা ঘরে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালে নবীজিও উঠে দাঁড়ালেন এবং তাকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। (৪)

আরেকববার সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজির সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। সাফিয়্যাহ কিছুটা ধীরে পথ চলছিলেন। তিনি পিছিয়ে পড়লেন। নবীজি তার কাছে ফিরে এলেন। কাছে এসে দেখলেন সাফিয়্যাহ কাঁদছেন। নবীজিকে দেখে বললেন, ‘আপনি আমাকে একটা ধীরগামী গাধায় সওয়ার করিয়েছেন!’

নবীজি স্নেহভরে সাফিয়্যাহর চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে বললেন, ‘আর কেঁদো না!’ (৫)

অন্য কেউ হলে ধীরে চলার জন্য বরং রাগ করতো! অথচ নবীজির আচরণ ছিল মমতাময়, স্নেহপূর্ণ। স্ত্রী পেছনে পড়ে গেছেন ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেছেন এবং ফিরে এসে যত্ন করে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেনوَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ سورة النساء.  “তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে আচরণ কর।” (সূরা নিসা-১৮)

নবীজি ছিলেন এই আয়াতের জলজ্যান্ত উপমা।

স্ত্রীকে সমমর্যাদা দেয়া

দুজন মানুষ মিলেই হয় একটি ঘর। নবীজি মোটেই ঘরের ব্যাপারে কর্তৃত্ব ফলাতেন না। নবীজি বলতেন, নারীরা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক। তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। আবার তত্ত্বাবধায়ক মানে স্ত্রীকে খাদেমা মনে করতেন না। তিনি স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দিতেন। এ ব্যাপার নবীজি বলেন, তুমি যখন খাবার খাবে, স্ত্রীকেও খাওয়াবে। তুমি যখন পরিধান করবে, স্ত্রীকেও পরিধান করাবে। (৬)

অর্থাৎ স্ত্রীরাও ঘরের মালিকা। তারা ঘরের খাদেমা নয়।

ঘরের যত্ন: ঘরের কাজকর্মে অংশগ্রহণ

নবীজি গৃহস্থালি যাবতীয় কাজে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর এতজন স্ত্রী ছিলেন, তিনি কিছু না করলেও চলতো। অথচ তিনি নিজের সব কাজ নিজ হাতে করতেন। এতে বোঝা যায় নবীজি স্বামীর ব্যক্তিগত কাজ করে দেয়াকে স্ত্রীদের দায়িত্ব মনে করতেন না। আমাদের সমাজে পুরুষরা ঘরের কাজে সাহায্য করলে তা লজ্জার বলে মনে করা হয়। স্ত্রীকে মনে করা হয় খাদেমা। স্ত্রী ঘরের খাদেমা নয়। ইমাম মালেক রহ. আবু হানিফা রহ. ও শাফেয়ী রহ. -এর মতে স্বামীর খেদমত করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়। স্ত্রীর জন্য ঘরের কাজকর্ম করা এহসান। (৭)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘নবীজি গৃহস্থালি যাবতীয় কাজে অংশগ্রহণ করতেন। নিজের জামা নিজে সেলাই করতেন। জুতা মেরামত করতেন। (৮)

আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আয়শা রাদিআল্লাহু আনহাকে প্রশ্ন করলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কী করেন?’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, ‘তিনি ঘরোয়া কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন, নামাজের সময় হলে নামাজ পড়তে যান।’ (৯)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আরো প্রশ্ন করা হলো, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারাদিন ঘরে কী করেন?’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘তিনি তো তোমাদের মতোই মানুষ। তিনি নিজ কাপড়ে তালি লাগান। বকরির দুধ দোহন করেন এবং নিজের যত্ন নেন।’ (১০)

কত চমৎকার চরিত্র ছিল নবীজির! অথচ মানুষ এ ধরনের চরিত্রকে স্ত্রৈণ বলে যা আসলে হিন্দুধর্মের প্রথা-প্রকৃতির সাথে মিল রাখে। বাস্তবিক বুদ্ধি দিয়ে বিচার করলে যে পুরুষ নারীকে বিশেষভাবে ভালোবাসে এবং বলিষ্ঠ পুরুষ হয়ে ঘরের যত্ন নেয়, স্ত্রীর যত্ন নেয় তাকে স্ত্রৈণ বলা যায় না। বরং যে পুরুষ স্ত্রীকে আশ্রয় দিতে পারে না, বলিষ্ঠ পুরুষ হওয়ার পরও নারীর গায়ে সব চাপিয়ে দেয়, পড়ে গেলে স্ত্রীকে ধরে উঠে, সম্পদে-সম্মানে স্ত্রীকে পেছনে রাখে, বিপদ দেখলে স্ত্রীকে সম্মুখে বাড়িয়ে দেয় মূলত সেই স্ত্রৈণ। নবীজির মহান চরিত্র এরকম প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। সংসারের এ ক্ষেত্রেও তিনি তার উম্মতের জন্য রেখেছেন সভ্য ও সুমহান আদর্শ।

তথ্যসূত্র:

[১. মুসলিম : ৯৭৪,] [২. বুখারী—৩০৮৬] [৩. বুখারী : ২৮৯৩] [৪. বুখারী : ২০৩৫, মুসলিম : ২১৭৫] [৫. নাসাঈ] [৬. হাকেম] [৭. ফিকহুস সুন্নাহ : ২/১৮৪] [৮. ফাতহুর রাব্বানি] [৯. বুখারী— ৬৭২] [১০. ফাতহুর রাব্বানি]

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী, সিরাত বিষয়ক একাধিক গ্রন্থপ্রণেতা

এমএফ/এমএসআই