রসিকতায়ও আদর্শ হোক নবীজি (সা.)

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

রসিকতায়ও আদর্শ হোক নবীজি (সা.)

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৫, ২০১৮

রসিকতায়ও আদর্শ হোক নবীজি (সা.)

সফলতা-ব্যর্থতা, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, হাস্য-রসিকতা, পারস্পরিক হৃদ্যতা ও আদান-প্রদান – এ সব কিছুর মিশেলেই আসলে আমাদের এ নশ্বর জীবন। হাস্য-রসিকতা মানবজীবনের একটি সুখকর উপাদান। হাসি-রসিকতা হতে পারে স্ত্রী-সন্তানের সাথে, ভাই-বোনদের সাথে, ভালো বন্ধু ও কর্মস্থলে সহকর্মীদের সাথে।

রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর স্ত্রীগণের সঙ্গে হাসি-কৌতুক করতেন। সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে কখনও কখনও হাসি-আনন্দ ও রসিকতা বিনিময় করতেন। এটা হচ্ছে বড়দের পক্ষ থেকে ছোট ও অধীনস্তদের প্রতি সুখপ্রদ সোহাগ। এতে করে ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পায় ও অন্যদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি নিরঙ্কুশ ভালোবাসার একটা স্থান তৈরি হয়।

তবে রসিকতা হতে হবে নির্দোষ, পরিচ্ছন্ন এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ। একদম রসিকতাহীন নিরস-গম্ভীর জীবনযাপন করা যেমন বেমানান ও মানসিক স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি এ ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনও ভালো নয়। ক্ষেত্র বিশেষ তা নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। যে হাস্য-রসিকতায় বা আমোদ-প্রমোদে মিথ্যা বা ধোকার সংমিশ্রণ থাকে এবং যে রসিকতা কারও মনোবেদনা বা মানহানির কারণ হয়, ইসলামে তা নাজায়েয ও নিষিদ্ধ।

রাসুলুল্লাহ সা. এদিকে ইঙ্গিত করেই বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া কর না এবং ঠাট্টা-বিদ্রুপ কর না।’ অর্থাৎ যে হাসি-রসিকতা অন্তরে কঠোরতা সৃষ্টি করে অথবা আল্লাহর ধ্যান থেকে মানুষকে গাফেল করে বা কারও কষ্টের কারণ হয় কিংবা কারও গাম্ভীর্য ও মর্যাদা নষ্ট করে, এ ধরনের হাসি-তামাশা নিষেধ।

পক্ষান্তরে যে হাস্যরস মনে প্রফুল্লতা আনে এবং যে রসিকতা ইবাদত-বন্দেগি ও  দ্বীনি কাজে দেহ-মনকে সজীব করা এবং দৈহিক ও মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে আর তা নির্দোষও হয়, তা শুধু জায়েযই নয়, বরং মুস্তাহাবও বটে।

এক্ষেত্রে আমরা আল্লাহর রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের আমলকে সামনে রাখতে পারি। যেমন আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন - ‘নবী করিম সা. কখনও কখনও তাকে (কৌতুক করে) ‘দুই কানওয়ালা’ বলে ডাকতেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ২৩৬)

রাসুল সা. আনাস রা. কে দুই কানওয়ালা বলে সম্বোধন করেছেন, এতে কোনো মিথ্যা বা ভুল ছিল না।  বিশেষ কোনো কারণে আনাস রা. কে দুই কানওয়ালা বলেছেন। যেমন তার দুই কান তুলনামূলক বড় ছিল বা তার শ্রবণশক্তি প্রবল ছিল। তিনি দূরের কথাও অনায়সে শুনতে পেতেন।

তেমনি রাসুল সা. ছোট শিশুদের সঙ্গেও হাসি-মজা করতেন। তাদের আনন্দ দিতেন। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল সা. আমাদের সঙ্গে অবাধে মিশতেন। এমনকি তিনি আমার ছোট ভাইকে কৌতুক করে বলতেন- يا أبا عُمَيْر ما فعل النُغَيْر ‘হে আবু উমাইর কি করলো তোমার সাথে নুগাইর।’ অর্থাৎ তোমার নুগাইর পাখিটার কী হল? আবু উমায়ের এর খেলার পাখিটা মারা গেলে সে অনেক কষ্ট পায়। তাই হাসিচ্ছলে বাক্যের অন্ত মিলিয়ে তার মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে রাসুল সা. তাকে পাখিটির কথা জিজ্ঞেস করেন। এভাবে রাসুল সা. তার সঙ্গে কথা বলার দ্বারা তার মাঝে দুঃখ দূর হয়ে আনন্দ ফিরে আসে।

আমরা অনেক সময় শিশুদের সঙ্গে রসিকতা করতে গিয়ে তাকে কাছে ডাকার জন্য খালি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলি- ‘আস তোমাকে (কিছু একটার কথা বলি) দেব’ এটা মিথ্যা, ধোকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এতে প্রথমত ধোকার গোনাহ হয়। দ্বিতীয়ত, এই শিশুটি এখানে একটা অনৈতিক শিক্ষা পায় এবং তার হৃদয়ে বিষয়টি বদ্ধমূল হয়ে যায়। বড় হলে তার কাছে এটাকে আর অন্যায় বা অনৈতিক মনে হবে না। অতএব যার সঙ্গেই হোক না কেন হাসি-মজা বা রসিকতা হতে হবে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ধোকামুক্ত। হতে হবে নির্দোষ ও সত্য। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, তিনি বলেন- ‘একবার কিছু সাহাবি আরজ করেন ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি আমাদের সঙ্গে কৌতুকও করেন? রাসুল সা. বলেন, আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি। (এমনকি কৌতুকেও)।’ (শামায়েলে তিরমিযি : ২৩৮)

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে এক বৃদ্ধা এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে জান্নাত দান করেন। তখন রাসুল সা. (রসিকতা করে) বললেন, হে অমুকের মা; জান্নাতে কোনো বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না। পরে বৃদ্ধা মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাচ্ছিল। তখন রাসুল সা. সাহাবাদের বললেন, তাকে গিয়ে বল, সে বৃদ্ধা হয়ে যাবে না; বরং সে তরুণী ও চিরকুমারী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ২৪১)

এখানেও রাসুল সা. কোনো মিথ্যা বা অসত্য বলেননি। এভাবে বিভিন্ন সময় রাসুল সা. সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে রসিকতা করতেন। তবে রসিকাতর মধ্যে কখনও মিথ্যা বা ধোকার আশ্রয় নিতেন না। সর্বদা সত্য ও বাস্তব বিষয়েই রসিকতা করতেন। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও পরিমিত রসিকতা করতেন। তাই আমরাও যেন এ থেকে শিক্ষা নেই এবং পরিমিতিবোধ বজায় রেখে হাস্য-রসিকতা করি, দৈনন্দিন কাজ ও ইবাদতে একাগ্রচিত্ত ও প্রফুল্ল থাকি।

এমএফ/আরপি