তায়েফে রক্তাক্ত প্রিয় নবী : ঘটনা ও শিক্ষা

ঢাকা, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯ | ২৪ কার্তিক ১৪২৬

তায়েফে রক্তাক্ত প্রিয় নবী : ঘটনা ও শিক্ষা

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৪:২৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৪, ২০১৮

তায়েফে রক্তাক্ত প্রিয় নবী : ঘটনা ও শিক্ষা

দ্বীনের দাওয়াত ও ইসলামের প্রচার-প্রতিষ্ঠা মুমিনদের উপর একটি গুরুদায়িত্ব। উম্মতে মুহাম্মাদির সাফল্য ও বিজয় এর মাঝেই নিহিত। ইতিহাস সাক্ষী, যতদিন পর্যন্ত উম্মত এই দায়িত্ব যথাযথ ও উত্তমপন্থায় আদায় করেছে, সাফল্য ও বিজয় তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে জড়িয়ে রয়েছে। এবং দ্বীন অব্যাহতভাবে অগ্রসর হতে থেকেছে ও মৃত মানবতা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এরপর যখন থেকে উম্মতে মুহাম্মাদি এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা, উদাসিনতা আর গাফলতি প্রদর্শন আরম্ভ করেছে, তখন থেকে উম্মত ধাপে ধাপে জিল্লতী ও ব্যর্থতার অতল গহবরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ভাঙ্গন, বে-ইজ্জতি আর বঞ্চনা হয়েছে তাদের কর্মফল।

দ্বীনের দাওয়াত ও এর প্রচার-প্রতিষ্ঠার জন্য একের পর এক আসতে থাকা বিভিন্ন বিপদাপদ, দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার, এবং উম্মাহর সামগ্রিক লক্ষ্য ও স্বার্থ অর্জন ও রক্ষায় ব্যক্তির বহু স্বার্থের বিসর্জন আবশ্যক হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত উম্মতে মুসলিমাহ এই মহান মর্যাদাপূর্ণ কাজের জন্য প্রতিবন্ধক নিজের পার্থিব চাওয়া-পাওয়াগুলোর বিশাল কুরবানির নজির পেশ করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আমল কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সফল ও ফলপ্রসূ হবে না। এক্ষেত্রে হযরত রাসুলুল্লাহ সা. এর পুরো হায়াতে জিন্দেগী উম্মতের জন্য পথ চলতে আলোর মশাল হয়ে সমুজ্জ্বল রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ সা. এর হায়াতের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বরং তাঁর জিন্দেগির মূল লক্ষ্যই ছিল দ্বীনের দাওয়াত ও হকের পয়গামকে সমগ্র ইনসানিয়্যাতের কাছে পৌঁছে দেয়া। তিনি এর জন্য কত কুরবানি দিয়েছেন? কত শত হাজারো বিপদ মুসিবতে কষ্ট সয়েছেন- ত্যাগ স্বীকার করেছেন? এক্ষেত্রে তায়েফ অভিমুখে রাসুলুল্লাহের দাওয়াতি সফর আমাদের জন্য অনুসরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নবুয়তের দশম বছর- যাকে ‘আমুল হুযন’ বা দুশ্চিন্তার বছরও বলা হয়। এ বছরই আমাদের প্রিয় নবী সা. এর স্নেহময়ি চাচা আবু তালেব ও প্রিয়তম বিশ্বস্ত জীবন সঙ্গিনী হযরত খাদিজা রা. এর ইন্তিকাল হয়। চাচা আবু তালেবের মৃত্যুতে হুযুর সা. খুব চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ আবু তালেবই রাসুলুল্লাহ সা. এর প্রতি মক্কার কাফেরদের অত্যাচার প্রতিরোধ করে আসছিলেন।

একদিকে যেমন বাহ্যিক উপায়-উপকরণের দিক থেকে চাচা আবু তালেবের সমর্থন ও সাহায্য তার মৃত্যুতে শেষ হয়ে গিয়েছে, অপর দিকে তার মৃত্যু হয়েছে কুফরের উপর- এর জন্যেও রাসুলুল্লাহের ছিল গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা । আবার এর অল্প কিছুদিন পরেই হযরত খাদিজাহ রা. এর ইন্তিকাল হয়- যিনি কেবল আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীই ছিলেন না, বরং সত্যের আহবানে সর্ব প্রথম ‘লাব্বাইক’ তিনিই বলেছিলেন, এবং তিনিই ছিলেন ইসলামের বাগানের প্রথম পুস্পকলি।

যখনই রাসুলুল্লাহ সা. কাফের মুশরিকদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত ও কষ্টের স্বীকার হতেন, তখন খাদিজা রা.-ই তাঁর কষ্ট লাঘব করতেন এবং তাঁকে সান্তনা ও সাহস যোগাতেন। এই উভয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর সাথে সাথেই হুযুর সা. এর উপর মক্কার কাফের মুশরিকদের যুলুম ও নির্যাতনের ঘন কালো মেঘ নেমে আসে, তাগুতি শক্তিগুলো তাদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ভরপুর থলে খালি করতে শুরু করে।

কুরাইশের অমানবিক ও হিংস্র জন্তুর মত নৃশংস আচরণ কেবল ইসলামের পয়গম্বরের সাথেই ছিল না, বরং তারা সাধারণ মুসলমানদের উপরেও চালাত বড় নির্মম নির্যাতন। তন্মধ্যে হুযুর সা. এর চাচা আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী উম্মে জামিল, হাকাম ইবনে আবুল আস (আবু জাহেল), উকবা ইবনে আবু মুঈত ও তাদের সঙ্গী-সাথিরা অন্যদের তুলনায় ছিল অনেক বেশিই অগ্রগামী। খুব বেশিই জুলুম-নির্যাতন তারা করেছে।

আবু লাহাব ছিল হুযুর সা. এর চাচা। তা সত্বেও সে ছিল রাসুলুল্লাহ সা এর ঘোর দুশমন। প্রতিটি মুহূর্তে তাঁকে কিভাবে কষ্ট দেওয়া যায় সে এ চেষ্টাতেই থাকত।

হজ্জের মৌসুম হোক বা মক্কার বাজার- যেখানেই আল্লাহর রাসুলকে দ্বীনের প্রচার করতে দেখত, পেছন থেকে আওয়াজ উঠিয়ে বলত, “হে লোকেরা! এই ব্যক্তি বদ-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী, তার কথা তোমরা শুনো না”। এবং অন্যদেরকে আল্লাহর রাসুলের বিরুদ্ধে উস্কে দিত। ফলে সে সকল লোকেরা অধিনস্ত গোলাম ও কুরাইশের অবুঝ শিশুদেরকে হুযুর সা. এর পথে বসিয়ে দিত। যখন হুযুর সা. পথ অতিক্রম করতেন, সকলে তাঁর পিছনে লেগে যেতো, তাঁকে নিয়ে মজা, হাসি-তামাশা করতো, তাঁর উপর পাথর নিক্ষেপ করতো।

এ সকল অবস্থার কারণে মক্কার জমিন আল্লাহর রাসুলের জন্য সঙ্কীর্ণ হয়ে উঠল। রাসুলুল্লাহ সা. দেখলেন, নবুয়তের মেঘ বৃষ্টি তো বর্ষণ করছে, কিন্তু মক্কার জমিন এর জন্য অনুপযুক্ত ও অনুরবর সাব্যস্ত হচ্ছে। তাই হুযুর সা. তায়েফের দিকে ফিরলেন- যা ছিল বসতি ও সমৃদ্ধির দিক থেকে মক্কার পর দ্বিতীয় অবস্থানে। মক্কা ‘হুবল’ দেবতার উপাসনার কেন্দ্র ছিল আর তায়েফে ‘লাত’ এর পূজা পাঠ হতো। তদুপরি সেখানে ছিল হাশেমি খানদানের বংশধরেরা। কিছু গোত্র ছিল রাসুলুল্লাহ সা. এর মামার বংশধর। মক্কার লোকেরা ব্যবসা ও গ্রীষ্ম কাটানোর জন্য তায়েফে আসতো।

উর্বর ফসলী জমিন, সুন্দর আবহাওয়া এবং বাগ-বাগিচার সমৃদ্ধিতে এখানকার অধিবাসীরা যথেষ্ট সুখী-সমৃদ্ধ ছিল। তবে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর এই সফর না তিনি সেখানকার লোকদের সুখ-সমৃদ্ধি ও জমিনের উর্বরতায় প্রভাবান্বিত হয়ে করেছেন, আর না তিনি সেখানে নিজের শিশুকালের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং সুন্দর প্রশান্তিকর মৌসুমি আবহাওয়া উপভোগ করে দেহমন জুড়িয়ে নিতে গিয়েছিলেন। বরং হুযুর সা. এই সফর করেছিলেন পায়েদল চলে খালেস তাওহিদের পয়গামকে ছড়াতে এবং ইনসানিয়্যাতকে কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে ঈমান ও ইয়াকিনের আলোতে আলোকময় করতে। তিনি এসেছিলেন এই আশায় যে, এখানের লোকেরা হয়ত তাওহিদের পয়গামকে কবুল করবে এবং তাঁকে একটি নিরাপদ ঠিকানা দেবে।

কিন্তু তায়েফের লোকেরা হুযুর সা. এর সাথে এমনই অবর্ণনীয় আচরণ করলো, যার স্পর্ধা মক্কাবাসীদেরও কখনো হয়নি। তায়েফের সেই দিনটি হুযুর সা. এর হায়াতে জিন্দেগির একটি কঠিনতম দিন ছিল। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, একবার উম্মুল মু’মিনিন হযরত আয়েশা রা. জানতে চাইলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জীবনে উহুদ থেকেও কঠিনতম কোন দিন কি অতিবাহিত হয়েছে?” হুযুর সা. বললেন, “হ্যাঁ আয়েশা! তায়েফের দিন বড় কঠিন দিন ছিল- যখন আমি নিজেকে সেখানকার সর্দারদের কাছে পেশ করেছিলাম।”

তায়েফ মক্কা মুকাররমাহ থেকে পূর্বে ১২০ কিলোমিটার দুরত্বে এবং সমুদ্র বক্ষ থেকে পাঁচ হাজার ফুট উপরে অবস্থিত। এই সফরে হুযুর সা. স্বীয় আজাদকৃত গোলাম হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাহকে সাথে রাখেন।

ইসলামের তাবলিগের জন্য হুযুর সা. যখন সেখানের সর্দারদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন- যারা ছিলেন তাঁর বাল্যকালের আত্মীয়। তায়েফে আমর ইবনে উমাইর ইবনে আওফের তিন ছেলে- আব্দ ইয়ালিল, মাসউদ ও হাবিব বনু সাকিফের সর্দার ছিলেন। হুযুর সা. উল্লেখিত তিনজন সর্দারের সাথেই সাক্ষাৎ করেন এবং তাদেরকে ইসলামের দা’ওয়াত দেন ও তাঁকে সাহায্যের আবেদন জানান।

হুযুর সা. টানা দশদিন সেখানে অবস্থান করে তাদেরকে সত্যোপলব্ধি করানোর পূর্ণ চেষ্টা করেন। কুফর ও শিরকের অন্ধকার ছেড়ে ঈমানের আলোর দিকে আসার দা’ওয়াত দেন। কিন্তু তিন সর্দারই চূড়ান্ত অবমাননামূলক জবাব দেয়।

একজন বলে, তোমাকে ছাড়া আল্লাহ কি আর কাউকে পায়নি- যাকে নবী করে পাঠাতো?
দ্বিতীয়জন বলে, আল্লাহর কাবা’র এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে যে তোমার মত মানুষ নবী হল?
তৃতীয়জন বলল, আমি তোমার সাথে কোনভাবেই কথা বলব না। যদি তুমি সত্য নবী হও, তাহলে তোমার সাথে কথাবার্তা বলা হবে আদবের খেলাফ, আর যদি তুমি মিথ্যা হও তাহলে তুমি আলোচনার উপযুক্ত নও।

তারা কেবল এটুকুই নয় যে হিদায়াত কবুল করেনি বরং হুযুর সা. কে এই হুকুমও দিয়েছে যে, খুব জলদিই আপনি এই বসতি ছেড়ে যান। এ সকল দুর্ভাগা লোকেরা এপর্যন্তই শেষ করেনি। তায়েফের দুষ্ট ও মন্দ প্রকৃতির লোকদের লেলিয়ে দিয়েছে যেন তারা হুযুর সা. কে নিয়ে তামাশা করে। হুজুর সা. পথ অতিক্রমকালে এ সকল দুশ্চরিত্র লোকেরা পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করে।

হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাহ রা. নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে হুযুর সা. কে পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছিলেন। এমনকি এক সময় তার মাথা ফেটে যায়। পাথরের আঘাতে আঘাতে হুযুর সা. এর শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তাঁর জুতা মোবারকও শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তে ভরে যায়। যখন জখমে জখমে আর না পেরে বসে যেতেন, তাঁকে বাহু ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। এরপর হুযুর সা. যখন আবার চলতে শুরু করতেন, আবার প্রস্তর বর্ষণ শুরু হতো। সাথে সাথে নিচু ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হাতে তালি বাজিয়ে বিকৃত উল্লাসী চিৎকার দিচ্ছিল হীন প্রকৃতির সেই লোকগুলো।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়লেন। এক সময় বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাহ রা. হুযুর সা. কে পিঠে তুলে নিয়ে তায়েফ জনপদের বাইরে উতবা ও শাইবার বাগানে নিয়ে এলেন। সেখানে বসে হুযুর সা. দু’আ করলেন- যে দু’আগুলো এখন ‘দুআয়ে মুস্তাদ’আফিন’ তথা দুর্বলদের দু’আ হিসেবে প্রসিদ্ধ।

সেই দু’আর এক-একটি অংশ থেকে গভীরভাবে অনুভব করা যায় তা যে কতটা আব্দিয়্যাত তথা আল্লাহর চূড়ান্ত গোলামিত্ব, বিনয় ও ভগ্ন হৃদয়ের ছাঁচে ঢালা, চরমাক্রান্ত, ব্যথিত ও মর্মস্পর্শী পবিত্র আবেদন! এ থেকে বোধগম্য হয় যে তায়েফের লোকেরা প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যে চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণ করেছে, তা থেকে তিনি কতটা মর্মাঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন ও তাঁর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কতটা গভীর ছিল।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান, “হে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ! আপনার কাছেই আমার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও লোকদের নিকট আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সমস্ত দয়াবানদেরও দয়াকারী আল্লাহ! আপনিই সমস্ত দুর্বলদের প্রতিপালক, আপনিই আমার প্রতিপালক। আপনি আমাকে কার হাওয়ালা করে দিচ্ছেন? এমন কোন অপরিচিতের- যে আমার সাথে অবহেলার আচরণ করবে? নাকি এমন কোন দুশমনের- যাকে আপনি আমার মুআমালার কর্তৃত্ব দিয়ে দিয়েছেন? যদি আমার উপর আপনার কোন ক্রোধ না থাকে তাহলে আমার কোন পরওয়া নেই; কিন্তু আমার জন্য আপনার কল্যাণ বেশি প্রশস্ত। আমি আপনার স্বত্বার সেই (বিশেষ) আলোয় আশ্রয় নিচ্ছি, যা দ্বারা সমস্ত অন্ধকার আলোকিত হয়ে যায়- এবং যা থেকে দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত মুআমালাত ঠিক হয়ে যায় যে আপনার ক্রোধ আমার উপর বর্ষিত হোক বা আপনার শাস্তি আমার উপর আপতিত হোক। আপনার সন্তুষ্টিই শুধু আমার কামনা যে কেবল আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। আপনি ছাড়া আর কোন শক্তি বা ক্ষমতা নেই।”

উতবা শাইবার ঐ বাগানে ‘আদ্দাস’ নামের এক ব্যক্তি হুযুর সা. এর হাতে ইসলাম কবুল করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে কিছু আঙ্গুর এনে রাখলেন। আল্লাহর রাসুল সা. বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে আঙ্গুর খেতে শুরু করলেন। তখন আদ্দাস নামের সে ব্যক্তি খুব আশ্চর্যের সাথে তাঁর চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। হুযুর সা. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় থাকো এবং তোমার ধর্ম কি? লোকটি বলল সে ঈসায়ী ধর্মের ও নিনাভের বাসিন্দা। রাসুল সা. বললেন, তুমি কি সেই পুণ্যাত্মা মানবের বসতির লোক- যার নাম ইউনুস ইবনে মাত্তা ছিল? আদ্দাস জানতে চাইলো, আপনি কিভাবে তাঁকে চিনেন? হুযুর সা. জবাব দিলেন, সে আমার ভাই। তিনিও একজন নবী ছিলেন, আর আমিও একজন নবী। আদ্দাস আল্লাহর রাসুলকে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহর রসুল বললেন- ‘মুহাম্মাদ’। তখনই আদ্দাস উচ্ছসিত ভেজা কণ্ঠে বললেন, আমি তো তাওরাতে আপনার মুবারক নাম দেখেছি! এবং আপনার বৈশিষ্ট্যও পড়েছি! এরপর সে বলল, আমি এক যুগ সময়কাল ধরে এখানেই আপনার অপেক্ষায় আছি, আমাকে ইসলামের দীক্ষা দিন! আল্লাহর রাসুল ইসলাম পেশ করলেন। আদ্দাস তখনই ইসলাম কবুল করে নিয়ে ঝুঁকে প্রিয় রাসুলের ললাট, হাত ও পায়ে চুম্বন করতে লাগলেন।

প্রিয় রাসুল সা. এর তায়েফের এই সফরে মুমিনদের জন্য ভাবার ও পূর্ণ অনুসরণের অনেক গভীর বার্তা রয়েছে।
প্রথম এই যে, রাসুল সা. মানুষের হিদায়াতের জন্য সব সময় চিন্তিত ও ব্যকুল থাকতেন। মক্কার মুশরিকেরা যখন দ্বীনে ইসলামকে কবুল করা থেকে অস্বীকার করলো, আল্লাহর রাসুল তখন তায়েফের লোকদেরকে বোঝানর জন্য সেখানে সফর করলেন। এ বিষয়টি একথার দলিল যে, রাসুল সা. উম্মতের প্রতিটি সদস্যকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করতে চাইতেন। আল্লাহর রাসুলের এই দরদ ও ব্যথাকেই পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তা’আলা এই ভাষায় বলেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি তো মক্কাবাসীদের ঈমান না আনার মর্মব্যথায় নিজের জীবনই খুইয়ে দিবেন!” (সূরা শু’আরা-৩)

তায়েফের সফর থেকে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয় যে, দুশমনদের সাথে হুযুর সা. এর ব্যবহার খুবই বিনম্র ছিল ও তাঁর আচরণ খুবই উঁচু মাপের ছিল। এই উঁচু আখলাকের সাথেই তিনি তায়েফের সর্দার ও লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ ও দুর্ব্যবহার সত্বেও উত্তম আচরণ পেশ করেন। উম্মতকেও এই শিক্ষা দেন যে, দ্বীনের দা’ওয়াত ও তাবলীগের জন্য দাঈর মাঝে সুউন্নত উত্তম আখলাক, ধৈর্য ও সহনশীলতা থাকতে হবে। নবী করীম সা. এর এই সমুন্নত চরিত্রকেই পবিত্র কুরআনে “খুলুকে আযিম” তথা “মহান চরিত্র” অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে।

এই সফরে একটি নসিহত এটাও যে, মানুষ সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে ফিরে থাকবে। সুখ বা দুঃখে, প্রফুল্লতা বা দুশ্চিন্তায়, সাফল্য বা বিপদ-বিপর্যয়-ব্যর্থতায় সব অবস্থায় আল্লাহর কাছে ফিরতে পারাই মানব জীবনের সফলতার দলিল। রাসুলুল্লাহ সা. তায়েফ সফরে তাই করেছেন। যখন তায়েফের লোকেরা রাসুলুল্লাহ সা. কে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে ফেললো, প্রিয় রাসুলের দেহ রক্তাক্ত হয়ে গেলো, সেই কঠিন সময়েও প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দিকেই ফিরলেন, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করলেন।

লেখকঃ তরুণ আলেম, সহকারী সম্পাদক, পরিবর্তন ডট কম

এমএফ /

 

নবী ও সাহাবা-চরিত: আরও পড়ুন

আরও