প্রিয় নবীজির (সা.) পুণ্যবতী সহধর্মিণীদের গল্প (প্রথম পর্ব) 

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫

প্রিয় নবীজির (সা.) পুণ্যবতী সহধর্মিণীদের গল্প (প্রথম পর্ব) 

পরিবর্তন ডেস্ক ৫:৫৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৮, ২০১৮

প্রিয় নবীজির (সা.) পুণ্যবতী সহধর্মিণীদের গল্প (প্রথম পর্ব) 

উম্মুল মুমিনীন বা উম্মাহাতুল মুমিনীন কথাটি প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সা. এর পূণ্যবতী স্ত্রীদের জন্য ব্যবহৃত একটি পরিভাষা। যার অর্থ- বিশ্বাসীদের  মাতাগন। প্রকৃতপক্ষেই তারা আল্লাহর সকল বিশ্বাসী বান্দা তথা মুমিনদের মাতা। রাসূলুল্লাহ সা. এর সুখে দুখে সর্বদাই তারা তাঁর সাহচর্যে ছিলেন। তাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু জেনে নেওয়া যাক।

১. খাদিজা বিনতে খুয়ালিদ রা. (৫৫৬-৬১৯ ঈসায়ী)

“মরিয়ম বিনতে ইমরান ছিলেন তার সময়ের সর্বোত্তম নারী এবং খাদিজা হলো তার সময়ের সর্বোত্তম নারী।” (সহীহ বুখারী)

রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রথম স্ত্রী হযরত খাদিজা রা. ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। রাসূলুল্লাহ সা. এর সাথে তার বিবাহের পূর্বে তিনি বিধবা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করছিলেন। তিনি রাসূল সা. কে শুরুতে তার ব্যবসায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দান করেছিলেন। পরবর্তীতে রাসূল সা. এর চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে তিনি রাসূল সা. কে বিবাহের প্রস্তাব দেন। 

ইতিহাসের অধিকাংশ সূত্রানুযায়ী, তাদের বিবাহের সময় খাদিজা রা. এর বয়স ছিলো ৪০ বছর এবং রাসূলুল্লাহ সা. এর ছিলো ২৫ বছর। 

খাদিজা রা. থেকেই রাসূল সা. এর সাত সন্তানের ছয় জনের জন্ম হয়। দুই পুত্র কাসিম ও আবদুল্লাহ শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ সা. এর উপর যখন প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়, তখন সর্বপ্রথম ঈমা্ন আনার গৌরব অর্জন করেন হযরত খাদিজা রা.। মক্কাবাসী যখন রাসূলুল্লাহ সা. এর দ্বীনের বাণী প্রচারে প্রচন্ড বিরোধিতা করছিলো, তখন  খাদিজা রা. তার সর্বস্ব নিয়ে রাসূলুল্লাহ সা. এর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি। তার ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ সা. তার বাকি জীবনে সর্বদাই তাকে স্মরণ করতেন।

২. হযরত সাওদা বিনতে জাম’আ রা.  (-৬৭৪ ঈসায়ী)

হযরত খাদিজা রা. এর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ সা. খুব নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সা. দ্বীনের প্রচারকাজে বেশী সময় দিতে পারছিলেন না। তখন রাসূল সা. আবার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন এবং  সাওদাহ বিনতে জাম’আ রা. কে বিয়ে করেন।

হযরত সাওদাহ রা. এর পূর্বে বিবাহ হয়েছিলো। তিনি ও তার স্বামী রাসূলুল্লাহ সা. এর উপর ঈমান এনে আবিসিনিয়ায় হিযরত করেছিলেন। পরবর্তীতে আবিসিনিয়াতেই তার স্বামীর ইন্তেকাল হলে তিনি তার ছোট ছোট শিশু নিয়ে সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েন। 

রাসূলুল্লাহ সা. তাকে বিবাহের জন্য তার পিতা-মাতার কাছে প্রস্তাব নিয়ে গেলে তারা সাওদাহ রা. এর সম্মতিতে রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

বিয়ের পর রাসূলুল্লাহ সা. দ্বীন প্রচারের কাজে অধিক সময় দিতে সক্ষম হন। রাসূলুল্লাহ সা. পরবর্তী স্ত্রী গ্রহণের পূর্বে তারা তিন বছর একত্রে বসবাস করে আসছিলেন। 

সাওদাহ রা. ছিলেন দুইবার হিজরতকারী মর্যাদার অধিকারী নারী, একবার আবিসিনিয়ায় এবং পরবর্তীতে মদীনায়। দানশীলতায় হযরত সাওদাহ (রা.) এর খ্যাতি ছিলো। 

৩. হযরত আয়েশা বিনতে আবুবকর রা.  (৬১২-৬৭৮ ঈসায়ী)

হযরত আয়েশা রা. ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা এবং রাসূলুল্লাহ সা. এর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু হযরত আবুবকর রা. এর কন্যা। রাসূলুল্লাহ সা. এর সাথে খুব অল্পবয়সেই হযরত আয়েশা রা. এর এই বিবাহ আবুবকর রা. এর সাথে রাসূলুল্লাহ  সা. এর সম্পর্ককে দৃঢ়তা দান করে। তিনিই ছিলেন রাসূল সা. এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

বিয়ের পর তিনি রাসূলুল্লাহ সা. এর সান্নিধ্যে ওহীর জ্ঞানে সমৃদ্ধি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রিয়তমা স্ত্রী এবং তার সাথে থাকা অবস্থায়ও রাসূলুল্লাহ সা. এর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো।

রাসূলুল্লাহ সা. এর যে তিনজন স্ত্রী সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেছিলেন, তাদের মধ্যে হযরত আয়েশা রা. ছিলেন অন্যতম। রাসূলুল্লাহ সা. থেকে তিনি দুইহাজারের অধিক হাদীস বর্ণনা করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. এর ইন্তেকালের পর তিনি দ্বীনের শিক্ষা প্রদানে আত্মনিয়োগ করেন।

৪. হযরত হাফসা বিনতে উমর রা. (৬০৫-৬৬৫ ঈসায়ী)

রাসূলুল্লাহ সা. এর চতুর্থ স্ত্রী হযরত হাফসা রা. ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. এর কন্যা। রাসূলুল্লাহ সা. এরসাথে বিবাহের পূর্বেও হাফসা রা. এর বিয়ে হয়েছিলো এবং তিনি আবিসিনিয়া ও মদীনা উভয়স্থানেই হিযরতের গৌরব অর্জন করেন। পরবর্তীতে মদীনায় তার স্বামী ইন্তেকাল করলে রাসূলুল্লাহ সা. হযরত হাফসা রা. বিবাহ করেন। এর মধ্য দিয়েই হযরত উমর রা. এর সাথে রাসূলুল্লাহ সা. এর সম্পর্ক আরো গভীর হয়।

হযরত আয়েশা রা. এর মতই হযরত হাফসা রা. ছিলেন একই রকম দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। উভয়েই রাসূলুল্লাহ সা. এর কনিষ্ঠতম স্ত্রী হওয়ায় এবং চরিত্রগত সাদৃশ্যের কারণে তারা পারস্পারিক গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন।  

হযরত আয়েশা রা. এর মত তিনিও সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেছিলেন। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণাতেই তার অধিকাংশ সময় কাটতো। 

হযরত আবুবকর রা. এর সময় সংকলিত প্রথম কুরআনে মুসহাফ হযরত উমর রা. এর শাহাদাতের পর হযরত হাফসা রা. এর কাছেই সংরক্ষিত ছিলো। পরবর্তীতে এই মুসহাফ থেকেই হযরত উসমান রা. আরো অনেকগুলো কুরআনের মাসহাফ তৈরি করে তৎকালীন ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্নস্থানে প্রেরণ করেছিলেন।

৫. হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা রা. (৫৯৫-৬২৪ ঈসায়ী)

হযরত যয়নব বিনতে খুজাইমা রা. ছিলেন কুরাইশ গোত্রের বাইরে বিয়ে করা রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রথম স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ সা. এর সাথে বিবাহের একবছরের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করায় তার সম্পর্কে খুব বেশী কিছু জানা যায়নি। দারিদ্র্যের প্রতি সহমর্মিতা ও দানশীলতার কারণে তাকে উম্মুল মাসাকিন বা দরিদ্রদের মাতা বলেও ডাকা হতো।  

তিনি ও তার স্বামী ইসলাম প্রচারের প্রারম্ভেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বদর যুদ্ধে তার স্বামী শাহাদাত বরণ করলে রাসূলুল্লাহ সা. তাকে বিয়ে করেন।

৬. হযরত উম্মে সালামাহ বিনতে আবু উমাইয়া রা. (৫৯৬-৬৮০ ঈসায়ী)

হযরত উম্মে সালামাহ রা. এর মূল নাম ছিলো হিন্দ। তার সন্তান সালামাহর নামানুসারে তাকে উম্মে সালামাহ বলে ডাকা হতো। তার প্রথম স্বামী আবু সালামাহ রা. ছিলেন রাসূল সা. এর ফুফাতো ভাই। ইসলাম প্রচারের শুরুতেই আবু সালামাহ ও উম্মে সালামাহ রা. উভয়েই একত্রে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা একত্রেই আবিসিনিয়াতে হিযরত করেছিলেন। পরবর্তীতে মক্কার সকলের ইসলাম গ্রহণের উড়ো খবর শুনে তারা মক্কায় ফিরে আসেন। মদীনায় হিযরতের  সময় আবু সালামাহ রা. কে তার পরিবার সহ হিযরত করতে তার গোত্র বাধা দেওয়ায় স্ত্রী ও সন্তানদের মক্কাতে রেখেই তাকে হিযরত করতে হয়। উম্মে সালামাহ রা. কে তার গোত্র আটকে রাখে এবং তাদের সন্তানকে আবু সালামাহ রা. এর গোত্র নিয়ে নেয়। উম্মে সালামাহ রা. কে এসময় ধৈর্যের এক চরম পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ একবছর তাকে স্বামী সন্তান বিহীন একাকী কাটাতে হয়। পরবর্তীতে তার গোত্রের দয়া হলে তারা তাকে তার সন্তানসহ মদীনায় হিযরত করার সুযোগ করে দেয়।

উহুদের যুদ্ধে হযরত আবু সালামাহ রা. শাহাদাত বরণ করলে হযরত উম্মে সালামাহ রা. দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ!   আমাকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দাও।’ 

তার দোয়ার ফলশ্রুতিতে আল্লাহর রাসূলের সাথে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়। রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছ থেকে তিনি তিনশত হাদীস বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সা. এর সকল স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষে ইন্তেকাল করেন।

চলবে...

এফএস/