ওসি মোয়াজ্জেম ‘উধাও’, কী বলছে পরিবার?

ঢাকা, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

ওসি মোয়াজ্জেম ‘উধাও’, কী বলছে পরিবার?

যশোর ব্যুরো ১:৪১ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৯

ওসি মোয়াজ্জেম ‘উধাও’, কী বলছে পরিবার?

সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নিরুদ্দেশ। তাকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। ওয়ারেন্ট জারির পর পরিবারের সঙ্গেও নেই যোগাযোগ। তাহলে কোথায় গেলেন তিনি। পরিবারের সদস্যরাও বিব্রত নানা জনের প্রশ্নবানে।

যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ি। পৈত্রিক দ্বিতল বাড়িটিতে ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বিবাহিত বোন বর্তমানে মায়ের সঙ্গে থাকছেন। মোয়াজ্জেমের স্ত্রী-সন্তানদের কেউ থাকেন না।

মঙ্গলবার সকালে পরিবর্তন ডটকমের যশোর ব্যুরো প্রধান ওসি মোয়াজ্জেমের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন।

স্বজনরা জানান, আদালতের ওয়ারেন্ট জারির পর থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। কোথায় আছেন, কেমন আছেন, সেটিও তাদের জানা নেই।

ওসি মোয়াজ্জেমের বাবার নাম খন্দকার আনসার আলী। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। তার এক ভাই সৌদি আরবে ও আরেক ভাই আমেরিকা প্রবাসী। তাদের আদি বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা গ্রামে। বাবার চাকরি সুবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে যশোর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ১৯৯৭ সালে উপ-পরিদর্শক পদে পুলিশে যোগদান করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। ২০১০ সালের দিকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। প্রায় দেড় বছর সোনাগাজি থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওসি মোয়াজ্জেমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার ছেলে জীবনে  কোনো অন্যায় কাজ করেনি। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমার ছেলে নিরাপদে ফিরে আসুক, এটাই আমার দাবি। নুসরাত হত্যার বিচার হোক। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আমার ছেলের জন্যই  নুসরাত হত্যাকারীদের ধরা পড়েছে।

ওসি মোয়াজ্জেমের ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, ওয়ারেন্ট জারির (২৬ মে) পরে আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নি ভাই। আগে নিয়মিত কথা হতো। এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানি না।

তিনি বলেন, নুসরাত হত্যার মূল মামলা বাদ দিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাইবার ক্রাইম মামলা নিয়ে বেশি তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মূল আসামিদের অনেকেই এখনও গ্রেফতার হয়নি।

ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার আরো বলেন, নুসরাতের যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, সেটি ভাই  প্রকাশ করেনি। অন্য একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েছে। এই অপরাধে সাইবার ক্রাইমের মামলা দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই ভিডিওটিই নুসরাতের দেওয়া বড় ডকুমেন্ট। যার ভিত্তিতে ভাই অধ্যক্ষ সিরাজউদ দৌলাহকে গ্রেফতার করেছিল। যার জন্য ভাইকে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল। সেটি না করে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এলাকার মানুষের কাছে খোঁজ নেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। কর্মজীবনেও কোনো অপরাধের তথ্য নেই। সাধারণ জীবনযাপন করেন। এই ঘটনার পর নানা রকম কথা শুনতে হচ্ছে।

ওসি মোয়াজ্জেমের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী উম্মে হানি দাবি করেন, নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনায় জড়িতদের আটক করা সহজ ছিল না। ভাই সেটি করতে পেরেছিলেন নুসরাতে বক্তব্যের ভিডিওর ভিত্তিতে। আমাদের ধারণা তিনি সেফটি ডকুমেন্ট হিসেবে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন নি। টেবিলের ওপর ফোন রেখে বাথরুমে গিয়েছিলেন। এই ফাঁকে তার মোবাইল থেকে ভিডিওটি হস্তান্তর হয়েছিল।

ওসির ধারণকৃত নুসরাতের ভিডিও যেভাবে ভাইরাল:

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোয়াজ্জেম হোসেন ওসি হিসেবে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তিনটি ধারায় (২৬, ২৯ ও ৩১) ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভিকটিম নুসরাতকে ওসির কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার দুই বান্ধবী নাসরিন সুলতানা, নিশাত সুলতানা এবং সোনাগাজি পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ভিকটিমের পরিবারের সদস্যরা পাশে কক্ষে বসা ছিলেন। ভিকটিমের দুই বান্ধবীর বক্তব্য অনুযায়ী ভিডিও ধারণ করার পূর্বে ওসি মোয়াজ্জেম মুখের নেকাব খুলতে নুসরাতকে বাধ্য এবং দফায় দফায় বিব্রতকর প্রশ্ন করেন। আপত্তি জানালে ওসি তাকে আশ্বাস্ত করে বলেন, এই ভিডিওটি সম্পর্কে কেউ জানবে না। যৌন নিপীড়নের শিকার একজন ভিকটিমের সঙ্গে ওসির এ রকম অমানবিক আচরণ অপেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে। ওসির এ  পেশাগত অদক্ষ আচরণের ফলে নুসরাতকে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম জানান,  মোবাইলটি অফিসের টেবিলে রেখে অজু করতে যান। এসময় তার অজ্ঞাতে একটি বেসরকারি টিভির ফেনী প্রতিনিধি (সাংবাদিক) শেয়ার ইট অ্যাপসের মাধ্যমে নিজের মোবাইলে নিয়ে নেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ওসির এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। ওসি নিজেই  স্বেচ্ছায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল হতে ওই ভিডিও ক্লিপটি তার মোবাইলে পাঠায়। এছাড়া ওসির  হোয়াটসঅ্যাপ আইডি থেকে অন্য একটি আইডিতেও ভিডিওটি প্রেরণ করা হয়।

যেকারণে নিরুদ্দেশ ওসি মোয়াজ্জেম:

নুসরাত যখন চিকিৎসাধীন ছিলেন তখনও আসামিদের  গ্রেফতার না করে মামলা দায়ের বিলম্বিত করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে। ৮ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর পর  প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় কোনো আসামি ছাড় পাবে না ঘোষণা দিলে ওসি মোয়াজ্জেমের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ সামনে চলে আসে।

এরপর গত ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা দায়ের করেন।

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। এক পর্যায়ে ফেনীর  সোনাগাজী থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং রংপুর রেঞ্জে তাকে সংযুক্ত করা হয়। রংপুর রেঞ্জে যোগ দিলেও ঈদের পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।

গত ২৬ মে ঢাকার সাইবার ট্রাইবুন্যালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ১৭ জুন পরোয়ানা তামিল সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইআর/এএসটি

 

সমগ্রবাংলা: আরও পড়ুন

আরও