কুড়িগ্রামে বন্যায় শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু

ঢাকা, ২১ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

কুড়িগ্রামে বন্যায় শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু

ইউনুছ আলী আনন্দ, কুড়িগ্রাম ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০১৯

কুড়িগ্রামে বন্যায় শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। বাড়ছে পানিবন্দি ও বন্যার পানিতে ডুবে নিহতের সংখ্যাও।

বন্যার পানিতে নৌকা ডুবির ঘটনায় ৪ শিশুসহ ৫ জন এবং বন্যার পানিতে ডুবে শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার এবং গত রোববার ও সোমবার বন্যার পানিতে ডুবে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

বন্যায় মৃতের ঘটনা

উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুর এলাকায় মঙ্গলবার বিকেলে নৌকাডুবির ঘটনায় ৪ শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরো ২জন।

উলিপুর উপজেলার নতুন অনন্তপুর গ্রামের কয়েকজন মহিলা ১৪ থেকে ১৫ জন শিশুকে নিয়ে একটি ডিঙ্গি নৌকায় করে বন্যার পানিতে ঘুরতে পাশের একটি বিলে যান। এসময় অতিরিক্ত ভারের কারণে বিলের পানিতে নৌকাটি ডুবে যায়। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে অবগত করে নৌকা নিয়ে তাদের উদ্ধার করতে যায়।

এ সময় তারা নিহত ২ শিশুসহ কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই দুজনের মৃত্যু হয়। আর এক শিশুর মা নিহত রুনা বেগম (৩৫) তার শিশু সন্তানকে বাঁচাতে নিজে পানিতে ডুবে দুই হাতে সন্তানকে পানির উপর ভাসিয়ে রাখেন। স্থানীয়রা তার শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও দীর্ঘক্ষণ পানিতে ডুবে থাকা মা রুনাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

নিহত ৪ শিশু হলো অনন্তপুর গ্রামের ব্যাপারীপাড়ার আয়নাল হকের ছেলে হাসিবুল (৭) একই গ্রামের মহসিন আলীর মেয়ে রুপা মনি (৮), মনছুর আলীর ছেলে মোরসালিন সুমন (১০) ও রাশেদের মেয়ে রুকু মনি (৭)।

নৌকাডুবিতে নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান।

রৌমারী ও নাগেশ্বরী উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই যুবক নিখোঁজ হয়েছে। এদের মধ্যে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরেকজনের লাশ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ স্থানীয় লোকজন পানির নিচে সম্ভাব্য স্থানগুলোতে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

যুবকেরা হলেন রৌমারী উপজেলার চাক্তাবাড়ী গ্রামের আব্দুস ছালামের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৩) এবং নাগেশ্বরী উপজেলার কালিগঞ্জ ইউনিয়নের মাদাইখাল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আ ন ম মুসার ছেলে আক্তারারুজ্জামান মামুন (৪০)।

নাগেশ্বরী উপজেলার মাদাইখাল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আ ন ম মুসা সোমবার নিজে বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার বড় ছেলে আল মামুন নাগেশ্বরী উপজেলা শহর থেকে তার বাবাকে নিতে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেন। পথে বন্যার পানি ভেঙে হেঁটে যাওয়ায় সময় বাড়ির পাশে মাদাইখাল এলাকায় খাদে পড়ে নিখোঁজ হন।

পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে মঙ্গলবার দুপুর নাগেশ্বরী ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা তার লাশ উদ্ধার করে।

নাগেশ্বরী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রওশন কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে রৌমারী উপজেলার চাক্তাবাড়ী এলাকায় বেরিবাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়ে।

বাঁধভাঙা বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার সকালে সাইফুর ইসলাম বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কলা গাছের ভেলায় উঠিয়ে উঁচু স্থানের দিকে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের তারের সাথে ধাক্কা লেগে পানিতে পড়ে যান।

এরপর স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের নিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

রৌমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু মো. দিলওয়ার হাসান ইনাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়াও রোববার ও সোমবার দুদিনে বন্যার পানিতে ডুবে চিলমারীতে দুজন এবং উলিপুরে একজন ও ফুলবাড়ীতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. এসএম আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১১৭ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তার পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

এতে করে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার ৯ উপজেলার ৫৬ ইউনিয়নের ৪০৭টি গ্রাম। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেয়ায় গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে বানভাসী মানুষ। 

চরাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের উঁচু বাঁধ ও পাকা সড়কসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের কথা বলা হলেও বন্যাদুর্গত বেশির ভাগ মানুষ ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেন।

কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলাসহ সোনাহাট স্থলবন্দরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে রৌমারী উপজেলার চাক্তাবাড়ী এলাকায় প্রায় শহররক্ষা বাঁধের প্রায় দেড়শ ফুট ধসে যাওয়ার যাদুর চর ইউনিয়নসহ পাশের ৩০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

বন্যার পানি উঠার কারণে ৩৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৪৫টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে ৯ হাজার ৯শ ৪২ হেক্টর জমির সবজি বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসল।

বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে জানান, কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলায় বন্যার্তদের জন্য এখন পর্যন্ত ৫০০ মেট্রিক টন চাল, দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং বিতরণ করা হচ্ছে।

নতুন করে এক হাজার মেট্রিক টন চাল, ২০ লাখ টাকা ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক।

এছাড়া বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ৮৫টি মেডিকেল টিম বন্যার্তদের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করে যাচ্ছে।

এইচআর

 

রংপুর: আরও পড়ুন

আরও