১০৩ টাকায় দিনাজপুরে পুলিশে চাকরি পেলেন ৮০জন

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

১০৩ টাকায় দিনাজপুরে পুলিশে চাকরি পেলেন ৮০জন

একরাম তালুকদার, দিনাজপুর ৩:৫৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০১৯

১০৩ টাকায় দিনাজপুরে পুলিশে চাকরি পেলেন ৮০জন

কোন প্রকার আর্থিক লেনদেন ও তদবির ছাড়া মাত্র ১০৩ টাকা খরচ করেই পুলিশের কনষ্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন দিনাজপুরের ৮০ জন নারী-পুরুষ।

নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রার্থীদের সামনে ঘোষণা করে তাদেরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি মিষ্টিমুখ করিয়েছে জেলা পুলিশ। অর্থ ও তদবির ছাড়া এমন নিয়োগে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন নিয়োগপ্রাপ্ত ও তাদের অভিভাবকরা।

দিনাজপুর পুলিশ লাইনস অডিটোরিয়ামে মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল টিআরসি পুরুষ-নারী পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। পুলিশ সুপার সৈয়দ আবু সায়েম চুড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করেন।

এসময় তিনি বলেন, ৮০ জন নারী-পুরুষ প্রার্থী পুলিশের কনষ্টেবল পদে চুড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৪জন পুরুষ। এদের মধ্যে ৫ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষকে চুড়ান্ত করা হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন, দিনাজপুর সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার, ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ জামান, পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন, দিনাজপুর কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বজলুর রশিদ প্রমুখ।

আর্থিক লেনদেন ও তদবির ছাড়াই নিজ যোগ্যতায় চাকরি পেয়ে অনেকেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরার পাশাপাশি অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মনোভাব প্রকাশের ভাষাও নেই কারও কারও। এবারে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই কৃষক, রাজমিস্ত্রি, ট্রাক চালকসহ গরীব ঘরের সন্তান। পুলিশে ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি সৎ ও যোগ্য হিসেবে দেশ সেবায় নিয়োজিত থাকার মনোভাব তাদের।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রথম রায়ের মেয়ে ইতি রায় নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন।

তিনি বলেন, আমার আশা ছিল পুলিশে নিয়োগ পাওয়ার। কিন্তু আমি নিয়োগে প্রথম স্থান অধিকার করেছি এজন্য অনেক ভাল লাগছে। আমার পরিবার ততোটা স্বচ্ছল না, পরিবার থেকে কেউ সরকারি চাকরি করে না। এবারে চাকরি পেয়েছি এবং বিনা পয়সায়। শুধু ব্যাংক ড্রাফট ও যাতায়াত খরচ হয়েছে।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার আজিমপুর গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে মুন্নী খাতুন বলেন, আমার বাবা একজন শ্রমিক। আমরা অনেক গরীব। পুলিশে চাকরি পেয়েছি কোন টাকা ছাড়াই। আমার স্বপ্ন পুরণ হয়েছে প্রতিদিন আমি স্বপ্ন দেখতাম পুলিশের চাকরি পাওয়ায়।

সদর উপজেলার সদরপুর এলাকার মিজানুর রহমানের মেয়ে নার্গিস আক্তার বলেন, আমরা খুব গরীব, আমরা তিন বোন এক ভাই। গ্রামের মেয়েরা বলতো মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে লাভ নেই, মেয়েদের কোন চাকরি হবে না। গরীব মানুষের কি চাকরি হয় ? আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে চাকরিটা পেয়েছি, আমি অনেক খুশি। এ সময় কেঁদে ফেলেন তিনি।

একই রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন হাকিমপুর এলাকার জহুরুল হকের মেয়ে জেবা ইসলাম শিলাসহ অন্যান্যরাও।

বীরগঞ্জ উপজেলার শিবরামপুর এলাকার হরিকৃষণ রায় বলেন, আমার পরিবার খুব গরীব। টাকা দেয়ার মতো সামর্থ নেই। কিন্তু টাকা ছাড়াই আমি চাকরি পেয়েছি। তাই আমিও সৎভাবে জঙ্গীবাদ দমন, সন্ত্রাস দমনে নিজেকে দেশের সেবায় নিয়োজিত করবো।

পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচন্ডী এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে সোহাগ আলী বলেন, আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল পুলিশে চাকরি করার। এবারে চাকরি পেয়েছি কোন টাকা ছাড়াই। আমার টাকা দিয়ে চাকরি নেয়ার কোন সামর্থও ছিল না, কারণ আমার বাবা কাঠ কাটার স’মিলে কাজ করেন।

অভিভাবকরাও জানিয়েছেন, এবারে নিয়োগে ১০৩ টাকার বেশি অর্থ ব্যয় হয়নি তাদের। যাতে করে খুশি অভিভাকরা।

অভিভাবক রহমত আলী বলেন, আমার বাড়ী ভবের বাজারে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত কোন টাকা ও তদবির ছাড়াই ছেলে চাকরি পাওয়ায় আমি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।

বিরল উপজেলার আজিমপুর এলাকার জহুরুল ইসলাম জানান, আমার ভাই পেশায় রাজমিস্ত্রি, নোয়াখালীতে কাজ করেন। তার মেয়ের চাকরি হয়েছে কোন টাকা ছাড়াই। আমি নিজেই তাকে নিয়ে যাওয়া-আসা করেছি। আমি টাকা দিয়ে চাকরি নিব এমন সহায়-সম্বলও নেই। একটা চা পর্যন্ত কাউকে খাওয়াইনি।  এভাবে চাকরি হবে তা ধারনার বাইরে।

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার সৈয়দ আবু সায়েম বলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পুলিশের নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে, কোন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। সততা ও স্বচ্ছতার ধারাবাহিকতায় আইজিপি মহোদয়ের নির্দেশক্রমেই এই নিয়োগ হয়েছে। নিরপেক্ষ, সুষ্টু, সুন্দর ও প্রভাবমুক্ত নিয়োগ হয়েছে।

তিনি বলেন, এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসদুপায় ও অনৈতিক কার্যক্রমে পুলিশের ২ সদস্যসহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এমএইচ

 

রংপুর: আরও পড়ুন

আরও