কুড়িগ্রামে ঐতিহ্যের দশহারার মেলা ও গঙ্গাস্নান

ঢাকা, ২৫ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

কুড়িগ্রামে ঐতিহ্যের দশহারার মেলা ও গঙ্গাস্নান

ইউনুছ আলী আনন্দ, কুড়িগ্রাম ৮:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৯

কুড়িগ্রামে ঐতিহ্যের দশহারার মেলা ও গঙ্গাস্নান

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের পূর্ব-ধনিরাম গ্রামে হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী একদিনের দশহারার মেলা।

দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে করা হচ্ছে এ মেলাটি। হিন্দু সম্প্রদায়ের পঞ্জিকার গণনা মতে চাঁদের দশমী তিথীতে প্রতিবছর দশহারার মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এখানে।

এবারও বুধবার দশমীতে আয়োজন করা হয় বড়ভিটা ইউনিয়নের পূর্ব-ধনিরাম গ্রামে ঐতিহ্যের এ দশহারার মেলা। পূর্ব-ধনিরাম গ্রাম দিয়ে প্রবাহমান ধরলা নদীর মোহনা জোলের পাড়ে অনুষ্ঠিত হয় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এ মেলাটি।

এ মেলা উপলক্ষে পূর্ব-ধনিরাম গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় সকাল ৭টায় পালন করে গঙ্গাপূজা। পূজা শেষে স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা শতশত হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ তাদের কর্মের পাপ মোচনে প্রবাহমান ধরলা নদীর মোহনা ফুলবাড়ী ছড়ায় গঙ্গাস্নান করেন।

দশহারার মেলার উদ্যোক্তা সদস্য গজেন্দ্র নাথ রায় (৭০) বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে পূর্ব-ধনিরাম গ্রামে দশহারার মেলাটি উদযাপন হয়ে আসছে। ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মালম্বী দশরত রাজার নাম অনুশারে এই দশহারার মেলাটির নামকরণ করা হয়েছে।

রাজা দশরত চাঁদের দশমী তিথীতে দশহারার মেলা উদযাপন করায় তার ভক্তরা তার এই মেলাকে ছড়িয়ে দিতে ভারত, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে দশহারার মেলা পালন করে আসছেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৩৫২ বঙ্গাব্দ থেকে দীর্ঘ প্রায় ৭৫ বছর ধরে ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের পূর্ব-ধনিরাম গ্রামে দশহারার মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

গজেন্দ্র নাথ রায় আরও জানান, মেলাটি উদযাপনে এখানকার মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতা করছেন। ফলে প্রতিবছর এখানে মেলাটি সফলভাবে উদযাপন হচ্ছে। এখানে ঐতিহ্যবাহী দশহারার মেলাটি যাতে যুগযুগ ধরে উদযাপন হয় এজন্য সরকারি ৩ বিঘা জমি দশহারার মেলার নামে বরাদ্দ রয়েছে।

স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ক্ষিতিশ চন্দ্র (৬৫) জানান, আমরা প্রতিবছর এই মেলা উপলক্ষে গঙ্গাপুজা ও গঙ্গাস্নান করে থাকি। আমার বাপ-দাদারা একইভাবে এই মেলা করেছে। আমরাও করছি। আমার প্রজন্মরাও করবে।

স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের যুবক মিঠু, সোহাগ, ঈদুল জানান, এখানকার দশহারার মেলাটি হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ে পালিত হচ্ছে। যার যার ধর্ম সে পালন করলেও দশহারার মেলাটি উদযাপনে হিন্দু-মুসলিমের সম্প্রীতি দেখা যায়। এ মেলা উপলক্ষে এখানকার মানুষরা আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করে। মেলার দিন পরিবারগুলোতে ভালো খাবার পরিবেশন করা হয়।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা জানান, পূর্ব-ধনিরাম গ্রামের দশহারার মেলাটি এখানকার ঐতিহ্য। এটি সরকারি ডাক মহলের মেলা। এ মেলা থেকে সরকারি রাজস্ব আদায় হয়। প্রতিবছর এখানে মেলাটি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পালন হচ্ছে।

তিনি বড়ভিটা ইউপি সদস্য থাকার সময় মেলাটি সফল করতে ইউনিয়ন অফিস থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এখনও মেলাটি সফল করতে যথাসাধ্য সহযোগিতা করছেন বলে জানান।

এ মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, ধরলা নদীর মোহনা জোলের পাড়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শতশত হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধরা পানিতে নেমে গঙ্গাস্নান করছেন। কেউ কেউ গঙ্গাপূজা করছেন। ব্রাহ্মণ ঢাক-ঢোলের সাথে সাথে মন্ত্র পড়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাপ মোচনের ধর্মীয় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।

গঙ্গাস্নান করতে আসা নাগেশ্বরী উপজেলার সুখাতী এলাকার পরেম চন্দ্র বর্মণ জানান, আমি প্রতি বছরের দশমীর তিথীতে পূর্ব-ধনিরাম গ্রামে দশহারার মেলায় গঙ্গাস্নান করতে আসি। এবারও প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নিজের পাপ মোচনে এখানে এসেছি। এখানে এসে ভালো লেগেছে।

বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়া থেকে আসা দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ জানান, তিনি জীবনের প্রথম বারের মতো দশহারার মেলায় গঙ্গাস্নান করতে এসেছেন। গঙ্গাস্নান করে নিজের পাপ মোচন করার আশা করছেন তিনি।

এদিকে মেলা উপলক্ষে দেখা যায়, নানা রকম দোকানপাটের সমারোহ। ঐতিহ্যের মেলাটিতে দেখতে আসা হাজার হাজার মানুষের চাহিদা পূরণে শতশত দোকানে দোকান মালিকরা বিভিন্ন ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন।

রয়েছে শিশুদের খেলনা সামগ্রী, নারীদের কসমেটিক্স প্রসাধনীসহ সাংসারিক কাজে ব্যবহৃত সকল প্রকারের পণ্য। হরেক রকম মিষ্টি, বড়বড় মাছসহ বিভিন্ন প্রকার দোকানে ভরে দেয়া হয়েছে মেলা প্রাঙ্গণ। মেলায় আসা দর্শনার্থীরাও ঐতিহ্যের মেলাটি থেকে খালি হাতে ফিরে যাননি। তারা দোকানগুলোতে সাধ্যমতো কিনেছেন তাদের চাহিদার পণ্য। এতে লাভের মুখ দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

মেলার দর্শনার্থী রাবাইতারী গ্রামের লুৎফর রহমান জানান, মেলা প্রাঙ্গণে তার শ্বশুরালয়। তিনি বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে এসেই শ্যালকের সাথে নিয়ে দশরার মেলা ঘুরতে এসেছেন। গ্রামের নিভৃত এলাকায় অনুষ্ঠিত এই ঐতিহ্যের মেলাটি তার বেশ ভালো লেগেছে বলে জানান তিনি।

সুদূর রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা থেকে মেলায় আসা ব্যবসায়ী রঞ্জিত চন্দ্র রায় জানান, মেলায় তারা সকাল থেকে বিক্রি করছেন। বিকেল নাগাদ মানুষের উপস্থিতি বেশি হলে বিক্রি আরও বাড়বে এমন আশা পোষণ করেন তিনি। এতে তিনি লাভের আশাও করছেন।

দশরার মেলা ও গঙ্গা পূজা উদযাপন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অনিল চন্দ্র রায় বলেন, উপজেলা প্রশাসেনের নির্দেশনায় পূর্ব-ধনিরাম গ্রাম দিয়ে প্রবাহমান ধরলা নদীর মোহনা জোলের পাড়ে দশহারার মেলা ও গঙ্গাস্নান উৎসব পালন করছি।

এখানে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলাসহ বিভিন্ন স্থানের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গঙ্গাস্নান, পূজা ও মেলা করতে আসেন। আমরা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে মনিটরিং করে সুশৃঙ্খলভাবে দশহারার মেলাটি উদযাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

তিনি এ সময় সামনের দিনে ব্যাপকভাবে দশহারার মেলাটি উদযাপনে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

এ ব্যাপারে ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানী পরিবর্তন ডটকমকে জানান, বড়ভিটা ইউনিয়নের পূর্ব-ধনিরাম গ্রামের জোলের পাড়ে ও ফুলবাড়ী সেতুপাড়ে দশহারার মেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রহরা জোরদার করা হয়েছে।

কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে দশহারার মেলা সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এইচআর

 

রংপুর: আরও পড়ুন

আরও