সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়ক প্রশস্তকরণ, জমি অধিগ্রহণে বাতেন-কাণ্ড

ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ | ৫ বৈশাখ ১৪২৬

সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়ক প্রশস্তকরণ, জমি অধিগ্রহণে বাতেন-কাণ্ড

নূর আলম, নীলফামারী ২:২০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়ক প্রশস্তকরণ, জমি অধিগ্রহণে বাতেন-কাণ্ড

জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নীলফামারী-সৈয়দপুর সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ কাজ।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দশ মাস হাতে থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করা জেলার গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে সড়ক বিভাগ ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান।

এদিকে, ভূমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ প্রদানের নামে সংশ্লিষ্ট মালিকদের জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে অর্থ। খোদ জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে আদায় করা হচ্ছে এসব অর্থ।

এ ঘটনায় জড়িত জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সার্ভেয়ার আব্দুল বাতেন। কেউ শর্তে রাজি না হলে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে চেক প্রদানের ক্ষেত্রে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, এলাকার জনগণ ও মালামাল নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সৈয়দপুর-নীলফামারী আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫৭০) প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ প্রকল্প অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে সড়ক বিভাগ। একই বছরের আগস্ট মাসে ঠিকাদারী দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ সম্পাদনে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।

গেল বছরের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ সম্পাদনের সময়সীমা থাকলেও কাজ শুরুর সাত মাসেও তেমন অগ্রগতি হয়নি সড়ক সম্প্রসারণে।

ঠিকাদার মিজানুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে জানান, নীলফামারী থেকে সৈয়দপুর সড়কের প্রথম অংশে সাড়ে সাত কিলোমিটারের কাজ করছি আমি। গ্লোরি সিরামিকস থেকে শহরের দিকে কালিতলা বাসটার্মিনাল পর্যন্ত সড়কের কাজ এগিয়ে চললেও কালিতলা থেকে শহরের প্রবেশ পথে কোনো জমি বুঝে দেয়া হয়নি আমাদের।

তিনি বলেন, এমনিতে অনেক লস দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে আমাদের, তার ওপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি কাজ শেষ করতে না পারি তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, এমনকি প্রকল্প থমকে যেতে পারে।

মিজানুর রহমান বলেন, আমরা চাই দ্রুতই জমি বুঝে দেয়া হোক, এক্ষেত্রে জমির মালিক ও অবকাঠামো মালিকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে সড়কের কাজে সহযোগিতা করা হোক।

একই অবস্থা গ্লোরিং সিরামিকস থেকে সৈয়দপুর অংশেও। সড়ক বিভাগ জানায়, সাড়ে পনের কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণে ২২ দশমিক ১১১ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে অধিগ্রহণ নিয়ে কাজ এগোয়নি তেমন।

ওই সড়কে জমি পড়া ইটাখোলা ইউনিয়নের হরিবল্লব এলাকার সাবেত আলী পরিবর্তন ডটকমকে জানান, আমরা সাত ভাই। আমাদের ১৪ শতকের মতো জমি পড়েছে রাস্তায়। এখনো মাপ-জোক করা হয়নি। আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।

সংগলশী ইউনিয়নের উত্তরা ইপিজেড এলাকার নুরনবী পরিবর্তন ডটকমকে জানান, নির্মিতব্য সড়কের ওপরে তাদের দোকান ঘর পড়েছে। দোকান ঘরের ক্ষতিপূরণ প্রদানের নামে হয়রানি করছেন ডিসি অফিসের সার্ভেয়ার আব্দুল বাতেন।

তিনি বলেন, ‘যে অবস্থায় রয়েছে, যে দাম পাব তার চেয়ে বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাতেন উৎকোচ গ্রহণ করেছে আমার কাছ থেকে।’

ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ জানান, আমার এক খণ্ড জমি পড়েছে রাস্তায়। শ্রেণি পরিবর্তন করে বেশি টাকা নিয়ে দেবার জন্য অতিরিক্ত টাকা দাবি করে আব্দুল বাতেন। এক্ষেত্রে ডিসি অফিসের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করছে সে। আমি দিতে চাইনি এ জন্য নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করেও লাভ হচ্ছে না।

একই অভিযোগ টুপামারী ইউনিয়নের বনবিভাগ এলাকার আব্দুল জলিলেরও। নীলফামারী-ডোমার সড়কের ওই এলাকায় স্থাপন করা হচ্ছে বাফার গুদাম। এ জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করছে সরকার।

ভূমির ক্ষতিপূরণের জন্য বর্তমান রেটের চেয়ে বেশি দেখিয়ে টাকা নিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন সার্ভেয়ার আব্দুল বাতেন।

এ নিয়ে ডিসি অফিসে অভিযোগ করা হলেও উল্টো তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সৈয়দপুর শহরের ওয়াপদা মোড় এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমার চারদিকে পাকা দোকান। আমারটা মধ্যখানে পাকা দোকান ঘর। অথচ সার্ভেয়ার আমারটি টিনশেড দেখিয়ে চার ভাগের এক ভাগ অর্থ প্রদান করছে।

চিকিৎসক আবুল হাসান বুলু পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এখানে অনেকে ভাড়া দোকান নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ সকল দোকানে তারা যে আসবাব দিয়ে সাজিয়েছিল তার দশ ভাগের এক ভাগ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। এটা গুরুতর অন্যায়।

তবে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ডিসি অফিসের এলএ শাখার সার্ভেয়ার আব্দুল বাতেন।

তিনি বলেন, আমি কোনো অনিয়ম করিনি। স্বচ্ছভাবে কাজ করেছি। অভিযোগ সব মিথ্যা।

সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হামিদুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে জানান, কার্যাদেশ প্রদানের সাত মাস অতিবাহিত হলেও কাজ সন্তোষজনকভাবে এগোয়নি।

ভূমি অধিগ্রহণ, গাছ কর্তন, বিদ্যুতের খুঁটি প্রতিস্থাপন কাজে ধীরগতির কারণে কাজও ধীরগতিতে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করতে না পারলে নানা সংশয়ে পড়তে হবে।

তিনি বলেন, সড়কটিতে আটটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ ছাড়াও সড়কটির নিরাপত্তার জন্য রক্ষাপ্রদ কাজ ও সাইন সিগন্যাল, গাইড পোস্ট, রোডমার্কিং করা হবে।

জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, জমি অধিগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী কাজ। আইন অনুযায়ী করতে হচ্ছে। তারপরও সবাই কাজ করছেন।

তিনি বলেন, প্রথম ফেইজের মালিকদের কাছে ক্ষতিপূরণের টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা তৎপর রয়েছি এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সড়ক বিভাগকে জমি বুঝিয়ে দেয়া হবে।

জমির শ্রেণি পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ফিল্ড বুকে যেভাবে রয়েছে সেভাবেই ক্ষতিপূরণ পাবেন, যদি কেউ অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, এর আগে এশিয়ান হাইওয়ে ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন সার্ভেয়ার আব্দুল বাতেন। পরে চাকরিতে পুনর্বহাল হলেও আবারো অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। নানা কারণে এশিয়ান হাইওয়ের কাজ বন্ধ হলেও আজও আলোর মুখ দেখেনি।

এনএ/আরপি