স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বে অসহায় ১০ দিনের নবজাতক!

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বে অসহায় ১০ দিনের নবজাতক!

মো. হারুন অর রশিদ, ঠাকুরগাঁও ৫:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৮

স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বে অসহায় ১০ দিনের নবজাতক!

স্বামীর কাছে ভরণ-পোষণের খরচ আদায় করার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ১০ দিনের নবজাতক শিশুকন্যাকে স্বামীর বাড়ির সামনে বাঁশঝাড়ে ফেলে রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে মায়ের বিরুদ্ধে। শিশুটির বাবা গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম। মা ছাড়া ১০ দিন বয়সী এই নবজাতককে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তার বাবা।   

রোববার সকাল ১০টায় উপজেলার ভানোর ইউনিয়নের বাঙ্গাটুলি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন (গতকাল) রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শিশুটি ওই গ্রাম পুলিশের বাড়িতেই রয়েছে বলে মুঠোফোনে জানান নবজাতকের মা রেহেনা বেগম (২৩)। তিনি নিজেকে ভানোর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলমের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টি অস্বীকার করে বলছেন— রেহেনা নিজেই গত জুন মাসে তাকে তালাক দিয়েছেন। 

বিয়ে ও তালাকের বিষয় নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হলে তা নিরসনের জন্য রেহেনা বেগম বাদী হয়ে গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের লোকজনকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও বিজ্ঞ  নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে একটি এবং নির্বাহী আদালতে ১০৭ ধারায় একটি মামলা করেছেন। যা বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে ওই এলাকার মৃত খলিপউদ্দীনের মেয়ে রেহেনা বেগমের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও নোটারী পাবলিক এফিডেভিট মূলে বিয়ে করে। বিয়ের পর তিন মাস স্বামীর বাড়িতে এবং তিন মাস রেহেনা তার বাবার বাড়িতে জাহাঙ্গীরের দেয়া ভরণ-পোষণে সংসার করেছেন।

আসমা জানান, গত ২ মাস ধরে ভরণ-পোষণ দেয়া বন্ধ করে দেন জাহাঙ্গীর। গত ১০ আগস্ট বাচ্চা প্রসবের পর কোনো খোঁজ খবর নেয়নি রেহেনার স্বামী জাহাঙ্গীর। তাই স্বামীর বাড়ি থেকে নবজাতকের ভরণ-পোষণ আদায়ের জন্যই এ পরিকল্পনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেহেনা তার ১০ দিনের কন্যা সন্তানকে স্বামীর বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে আসেন।

রেহেনা বেগম জানান, দীর্ঘ এক বছর জাহাঙ্গীরের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক। প্রেমের কারণে দীর্ঘদিন আমার সাথে রাত কাটায় জাহাঙ্গীর। আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তার প্রথম স্ত্রীসহ আমাকে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে জাহাঙ্গীর। এরপর সুখেই ছিলাম আমি। কিন্তু গত ২ মাস ধরে আমার ভরণ-পোষণের খরচ এমনকি আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সে। গত ১০ দিন আগে আমার বাচ্চা প্রসবের পর আমি একবারে অসহায় হয়ে পড়ি। এতে বাধ্য হয়ে আমি বাচ্চাকে নিয়ে আমার স্বামীর বাড়িতে থাকার চেষ্টা করলে আমাকে মারপিট করে তাড়িয়ে দেয় আমার স্বামী এবং তার প্রথম স্ত্রী। এ সময় শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে বাচ্চা ফেলে চলে আসি।

রেহেনা বেগম আরও বলেন, আমি বালিয়াডাঙ্গী থানায় এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট গিয়েছিলাম। তারা বিষয়টি সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

রেহেনা বেগমের প্রতিবেশী খাদেমুল ইসলাম জানান, গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন রেহেনার সাথে রাত যাপন করেছেন। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি নিষেধ করলে জাহাঙ্গীর রেহেনাকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সে সময় বিয়ে না দিলে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবেন বলে হুমকিও দিয়েছিল জাহাঙ্গীর।

গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম বিয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, বিয়ের পর স্বামীর কথা মানতেন না রেহেনা বেগম। এমনকি গত ১৫ মে আমাকে এফিডেভিট মূলে সে নিজে তালাক দিয়েছে। ডাকযোগে তালাকের কাগজপত্র পাওয়ার পর ভরণ-পোষণের খরচ বন্ধ করে দেই আমি।

তিনি আরও বলেন, আজকে (রবিবার) স্থানীয় কিছু লোকের বুদ্ধিতে আমার বাড়ির পার্শ্বে বাঁশঝাড়ে তার ১০ দিনের শিশু রেখে যায় রেহেনা।

ভানোর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব সরকার বলেন, বাচ্চা ফেলে যাওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে  আগে স্বামী-স্ত্রীর সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা করেছেন তিনি।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল মান্নান বলেন, বাচ্চাটি নিয়ে গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আমার দফতরে এসেছিল। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার মাধ্যমে বর্তমানে নবজাতকটির একটি সু-ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই সাথে বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা করার চেষ্টাও চলছে।

এমএইচএআর/এএল/